নন-বন্ডেড কারখানায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলো এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬ ০২:৪৪ পিএম

ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ, বাড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সক্ষমতা

বন্ড লাইসেন্স না থাকা আংশিক রপ্তানিমুখী ও ক্ষুদ্র শিল্প কারখানাগুলোকেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এই সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আমদানিসংশ্লিষ্ট শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক গ্যারান্টি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে।

এনবিআরের এই সিদ্ধান্তকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বন্ড লাইসেন্সের জটিলতা ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বাজারে নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।

ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে

নতুন ব্যবস্থায় নন-বন্ডেড কারখানাগুলো সরাসরি শুল্ক ও কর পরিশোধ না করে নির্ধারিত ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক গ্যারান্টি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। ফলে সরকার একদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব সুরক্ষায় ব্যাংক গ্যারান্টিকে নিরাপত্তা হিসেবে রাখছে।

৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন বাধ্যতামূলক

এই সুবিধার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন থাকতে হবে।

অর্থাৎ শুধু কাঁচামাল আমদানি করে পুনরায় রপ্তানি করলেই এ সুবিধা পাওয়া যাবে না। আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশে উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।

৯ মাসের মধ্যে রপ্তানি

আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য সাধারণত ৯ মাসের মধ্যে রপ্তানি করতে হবে। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভ্যাট কমিশনারেটের অনুমোদন নিয়ে এই সময়সীমা আরও ৩ মাস বাড়ানো যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি সম্পন্ন করার শর্তটি সুবিধাটির অপব্যবহার ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ কাঁচামাল আমদানির পর উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি করা হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বন্ড লাইসেন্সের জটিলতা কমবে

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো বন্ড সুবিধা পেতে লাইসেন্স, কাগজপত্র ও বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বন্ড ব্যবস্থার আওতায় আসা অনেক সময় ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।

নতুন সুবিধার ফলে বন্ড লাইসেন্স না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।

বাড়তে পারে রপ্তানি সক্ষমতা

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সুবিধা শুধু বিদ্যমান রপ্তানিকারকদের জন্য নয়, নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে। পর্যাপ্ত কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য তৈরির সুযোগও তৈরি হবে।

এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিধি সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রাজস্ব সুরক্ষায় নজরদারি জরুরি

তবে শুল্কমুক্ত সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আমদানিকৃত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি, ভুয়া রপ্তানি দেখানো, অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানি কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য রপ্তানি না করার মতো অনিয়ম হলে সরকারের রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাই ব্যাংক গ্যারান্টি, মূল্য সংযোজনের হিসাব এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি—এই তিনটি শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাস্টমস ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্তসাপেক্ষে নন-বন্ডেড কারখানাকে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সুবিধাটি যেন প্রকৃত রপ্তানিমুখী ও উৎপাদনশীল শিল্পের কাজে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত