২২ কর কমিশনারের দপ্তর বদল, ১২ অতিরিক্ত কমিশনারকে পদোন্নতি

রাজস্ব গোয়েন্দা সেলে প্রথম নারী প্রধান সেলিনা সুলতানা

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬ ০৫:১৬ এএম

এনবিআরের এই বিশেষায়িত গোয়েন্দা ইউনিটের শীর্ষ পদে এবারই প্রথম কোনো নারী কর্মকর্তাকে শীর্ষপদে নিয়োগ পেলেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের পুরুষ-প্রধান রাজস্ব প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ইউনিটের নেতৃত্বে নতুন নজির তৈরি হলো

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। সংস্থার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী কর্মকর্তাকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন এই দায়িত্ব পেয়েছেন কর অঞ্চল-৪, ঢাকার কমিশনার সেলিনা সুলতানা।

২০ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) পৃথক প্রজ্ঞাপনে একযোগে ২২ জন কর কমিশনারের দপ্তর ও দায়িত্বে পরিবর্তন আনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। একইদিনে আরও ১২ জন অতিরিক্ত কর কমিশনারকে কর কমিশনার পদে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি দিয়ে তাঁদের কর্মস্থলও নির্ধারণ করা হয়।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর প্রশাসন-১ শাখার প্রথম সচিব (কর প্রশাসন) ওয়াকিল আহমদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই বদলি-পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কর আদায়কারী সংস্থাটিতে এটি সবচেয়ে বড় রদবদল।

গোয়েন্দা ইউনিটে ঐতিহাসিক পরিবর্তন

সেলিনা সুলতানার সিআইসির মহাপরিচালক পদে নিয়োগকে এই রদবদলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এনবিআরের এই বিশেষায়িত গোয়েন্দা ইউনিটের শীর্ষ পদে এবারই প্রথম কোনো নারী কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের পুরুষ-প্রধান রাজস্ব প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ইউনিটের নেতৃত্বে নতুন নজির তৈরি হলো।

সিআইসি এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কাঠামোর একটি অংশ। রাজস্ব ফাঁকি, আয়কর-সংক্রান্ত অনিয়ম ও কর অপরাধ শনাক্তকরণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং তদন্তের ক্ষেত্রে এই বিশেষায়িত ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সিআইসিকে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের তদন্তে সম্পৃক্ত বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সেলিনা সুলতানার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

সেলিনা সুলতানা জাতীয় রাজস্ব ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ১৯৭৪ সালের ২৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী সেলিনা সুলতানা ২০০১ সালের ৩১ মে সহকারী কর কমিশনার হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কর প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি সিআইসির মতো গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ইউনিটের নেতৃত্বে এলেন। দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কর কমিশনার হিসেবে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তাঁর নতুন দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

২২ কর্মকর্তার দপ্তর বদল

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কর অঞ্চল-১৩, ১১, ২৪, ৪, ৮, ১৮সহ ঢাকার বিভিন্ন কর অঞ্চল থেকে কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেশের বিভিন্ন কর অঞ্চল, কর আপীল অঞ্চল এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বদলি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কর কমিশনার মো. হাফিজ আল আসাদকে ঢাকাস্থ কর পরিদর্শন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব প্রদানের ঘটনাকে। অন্যদিকে, কর পরিদর্শন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মহিদুল হাসানকে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হাফিজ আল আসাদ কর অঞ্চল-দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কর অঞ্চল-রংপুরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের পুরষ্কার হিসেবে তাকে ঢাকায় পদায়ন করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর পরিদর্শন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মহিদুল হাসানকে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয়েছে।

এনবিআরের প্রজ্ঞাপন  অনুযায়ী, সিআইসির বর্তমান মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে কর অঞ্চল-৮-এর কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

একইসঙ্গে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. লুৎফুন্নাহার বেগমকে কর অঞ্চল-১১ তে বদলি করা হয়েছে। কর পরিদর্শন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মহিদুল হাসানকে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয়েছে।

এছাড়া, মো. মিজানুর রহমানকে কর অঞ্চল-নোয়াখালীতে এবং মো. নাসিরুর রসুলকে কর অঞ্চল-দিনাজপুরে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, কবির উদ্দিন মোল্লাকে কর অঞ্চল-৪, শহিদুল ইসলামকে কর আপিল অঞ্চল-৩ এবং নাজমা পারভীনকে কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চলে পদায়ন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ২২ জন কর কমিশনারের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলে এই রদবদলকে আয়কর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১২ কর্মকর্তার পদোন্নতি

একই দিনে ১২ জন অতিরিক্ত কর কমিশনারকে কর কমিশনার পদে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন—ড. নুরুল আমিন, মাহবুবুল মোর্শেদ, মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ নাঈমুর রসুল, এজেডএম নূরুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান, আশরাফুল ইসলাম, সালেহীন সিরাজ, মোহাম্মদ শাহ আলম, মোসাদ্দেক হুসেন, মির্জা মোহাম্মদ মামুন সাদাত এবং দুলাল চন্দ্র পান্ডে।

পৃথক আদেশে এসব কর্মকর্তার কর্মস্থলও নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একই দিনে একদিকে ২২ জন কর কমিশনারের দপ্তর পুনর্বিন্যাস, অন্যদিকে ১২ কর্মকর্তাকে কর কমিশনারের চলতি দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে আয়কর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হলো।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রদবদল

এনবিআরের জন্য কর প্রশাসনের দক্ষতা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংস্থার নিজস্ব প্রশাসনিক নথিতেও জনবলস্বল্পতা, প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি এবং আধুনিকায়ন ও অটোমেশন জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলার হালনাগাদ ডেটাবেস, ই-ফাইলিং, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই অবস্থায় গোয়েন্দা ইউনিটের নেতৃত্বে পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক বদলি হিসেবে নয়, রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তকরণ ও কর-অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর সক্ষমতা তৈরির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর ফাঁকি, গোপন আয়, সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন এবং জটিল আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করতে তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতার গুরুত্ব বাড়ছে।

এনবিআরের প্রকাশিত তথ্যেও সংস্থার আধুনিকায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে সিআইসির নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গোয়েন্দা তথ্যকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং তদন্ত কার্যক্রমকে দৃশ্যমান ফলাফলে নিয়ে আসা।

নারী নেতৃত্বে নতুন দৃষ্টান্ত

সেলিনা সুলতানার নিয়োগের আরেকটি তাৎপর্য হলো—এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ একটি গোয়েন্দা ইউনিটের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো নারী কর্মকর্তার অভিষেক। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা দায়িত্ব পালন করলেও সিআইসির মহাপরিচালকের মতো সংবেদনশীল ও ক্ষমতাসম্পন্ন পদে এই নিয়োগ নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

তবে এই নিয়োগের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা, তদন্তের নিরপেক্ষতা, কর ফাঁকি শনাক্তকরণ, আন্তঃদপ্তর সমন্বয় এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করার ওপর। শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন নয়, গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি বাড়াতে পারলেই এই রদবদল কার্যকর ফল বয়ে আনবে।

সার্বিকভাবে, ২২ কর কমিশনারের বদলি এবং ১২ কর্মকর্তার পদোন্নতির মাধ্যমে এনবিআরের আয়কর প্রশাসনে যে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সেলিনা সুলতানা। ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে সিআইসির নেতৃত্ব পাওয়া এই কর্মকর্তার সামনে এখন বড় দায়িত্ব—রাজস্ব গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে আরও তথ্যনির্ভর, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত