উৎপাদন ব্যাহত ⊕ বন্ধ শত শত কারখানা ⊕ ঝুঁকিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পখাত; বিপদে ব্যবসায়ীরা

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৩৪ এএম

শিল্প খাতকে রক্ষায় দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন উদ্যোক্তারা

গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে দেশের শিল্পখাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় ছোট-বড় বহু শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে কারখানার চাকা।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী এই জ্বালানি সংকট শুধু বর্তমান উৎপাদনকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং শিল্পের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে হিমশিম খেতে পারে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ফলে দেশের অর্ধেকেরও বেশি টেক্সটাইল ও সুতা উৎপাদনকারী মিল বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি জানান, বিটিএমএর ১ হাজার ৮০০-এর বেশি সদস্যের মধ্যে ৯০০-এরও বেশি টেক্সটাইল মিল বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ। চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অর্ধেকেরও কম হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেক বা তারও কম উৎপাদন করছে।

রাসেল বলেন, গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের সংকটও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

জ্বালানি সংকটে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

শিল্পোদ্যোক্তাদের ভাষ্য, কারখানা সচল রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি কিংবা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি কিনে উৎপাদন চালাতে গিয়ে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।

বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য তৈরি ও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে অর্ডার ধরে রাখা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেলেও শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের কিস্তি, শ্রমিকদের বেতন এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় আয় না থাকলেও ব্যয় অব্যাহত থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।

‘গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য, প্রতিদিন ক্ষতি ২ কোটি টাকা’

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি শীর্ষস্থানীয় স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অথচ সরকার শিল্পকারখানার জন্য ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিল।

তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকায় কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তাঁরা।

ওই উদ্যোক্তার ভাষায়, ‘আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়তো শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি বিক্রি করতে হবে।’

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে অধিকাংশ কারখানা মালিকের পক্ষেই জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল এবং শ্রমিকদের বেতন সময়মতো পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

‘ডেডলাইন পার হয়েছে, এখন কোনো আশ্বাসও নেই’

ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ হক বলেন, গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে সরকার আগে একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু একের পর এক সময়সীমা পার হলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এর আগে সরকার আমাদের বেশ কয়েকবার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক দফা ডেডলাইন পার হওয়ার পর এখন তারা আমাদের আর কোনো আশার কথা শোনাতে পারছে না। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছি।’

শিল্পাঞ্চলে সংকট, কোথাও সামান্য উন্নতি হলেও ফের অবনতি

নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও পরে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কোনো কোনো এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনিয়মিত ও নিম্নচাপের গ্যাস সরবরাহের কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা করা যাচ্ছে না। একদিকে শ্রমিক ও কারখানার স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন না থাকায় আয় কমে যাচ্ছে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।

মাধবদীতে শ্রমিক বিক্ষোভের খবর

এদিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতশিল্পের কেন্দ্র নরসিংদীর মাধবদীতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে তাঁত শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কারখানা বন্ধ থাকায় নরসিংদীর তাঁত মিলগুলোর শ্রমিকদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে তাঁরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নেমেছিলেন।

তিনি বলেন, তাঁতশিল্পের অধিকাংশ শ্রমিক উৎপাদনভিত্তিক মজুরি পান। ফলে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে তাঁদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।

তবে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন এই ধরনের কোনো বিক্ষোভের তথ্য অস্বীকার করেছেন। এই বিষয়ে শিবপুর থানার ওসি মো. কোহিনুর মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৬ আগস্টের আশ্বাস, বাস্তবে কাটেনি সংকট

গত ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। কিন্তু ২১ আগস্ট পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্প মালিকদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন বাড়ানো, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান—সবই ঝুঁকিতে

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এখন আর কেবল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের আয় কমবে, উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমবে এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহও বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্প সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

এই অবস্থায় শিল্প খাতকে রক্ষায় দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

কারণ, জ্বালানি সংকটে কারখানার চাকা থেমে গেলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এর সঙ্গে থেমে যায় শ্রমিকের আয়, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের গতিও।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত