ঋণ ও রিজার্ভ বিনিয়োগ থেকে বড় আয় ✪ কর্মকর্তারা পাচ্ছেন ৬ মাসের বোনাস
অর্থনৈতিক চাপ সত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা ২৬ হাজার কোটি টাকা
রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত আর্থিক বিবরণী অনুমোদন করা হয়
দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপ, ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির মধ্যেও সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা/সরকারকে হস্তান্তরযোগ্য অর্থ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই অঙ্ক বেড়েছে ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা বা প্রায় ১৫ শতাংশ।
রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত আর্থিক বিবরণী অনুমোদন করা হয়। একই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ছয় গুণের সমপরিমাণ ‘পারফরম্যান্স বোনাস’ বা প্রণোদনা বোনাস অনুমোদন করা হয়েছে। অর্থাৎ কর্মীরা ছয় মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বোনাস পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ নিট মুনাফা ছিল ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যাংকগুলোর ঋণেই বড় আয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ব্যাংক খাতে তারল্যের চাপ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেশি ঋণ নেওয়া। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলেও দুর্বল ও তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকগুলো দৈনন্দিন দায় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণসুবিধার ওপর বেশি নির্ভর করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ আয় বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উপাত্তও অর্থনীতিতে তারল্য ও সরকারি ঋণের চাপের চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণ ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা এবং তফসিলি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা।
রাজস্ব ঘাটতি বাড়িয়েছে ব্যাংকনির্ভরতা
সরকারের রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই ঋণ সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। একই সময়ে আগের অর্থবছরে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৩ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয়ে। সরকার ও বাণিজ্যিক ব্যাংক—উভয় পক্ষের ঋণ চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমও সক্রিয় ছিল। ফলে একদিকে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, অন্যদিকে সরকারের বাড়তি ঋণ—দুই পরিস্থিতিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
রিজার্ভ বিনিয়োগেও ভালো আয়
মুনাফা বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ বিভিন্ন দেশে ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের হার থাকায় এসব বিনিয়োগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো রিটার্ন পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে রিজার্ভ বিনিয়োগের আয়কে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল—দেশের ব্যাংক ও সরকারের ঋণ থেকে পাওয়া সুদ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয়।
মুনাফা বাড়লেও এটি অর্থনীতির জন্য কতটা স্বস্তির?
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বাড়াকে সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা সর্বাধিক করা নয়; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংক খাতের তদারকি এবং অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় তারল্য নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ মুনাফা করা নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংক খাতের তদারকি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এর মূল দায়িত্ব।
তার মতে, অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে অস্থিরতার কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা এতটা বেড়েছে। ফলে মুনাফা বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন তার মূল লক্ষ্য—মুদ্রাবাজার ও আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা—থেকে বিচ্যুত না হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতেও বিষয়টি দ্বিমুখী। অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবে চাঙা থাকলে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভরতা কমে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয়ও কমতে পারে। বিপরীতে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও সরকারি ঋণ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে উচ্চ মুনাফা সবসময় অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়।
সরকারি কোষাগারে যাবে বড় অঙ্কের অর্থ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফার একটি বড় অংশ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য অর্থ পাবে, যা রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেটের অর্থায়নে কিছুটা সহায়তা করতে পারে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে সরকার পেয়েছে এবং বাকি ১৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা সরকারি হিসাবে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ অর্থ সরকারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা যদি প্রধানত ব্যাংক খাতের সংকট, সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ কিংবা দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বাড়ে, তাহলে সেটিকে অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানের প্রতিফলন বলা কঠিন।
বোনাস নিয়ে প্রশ্নও উঠছে
একদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্যসংকট, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে; অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ছয় মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ প্রণোদনা বোনাস অনুমোদন হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীরা আগের অর্থবছরেও একই ধরনের ছয় মাসের বোনাস পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ফলে এটি নতুন কোনো সুবিধা নয়, বরং বিদ্যমান প্রণোদনা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা।
তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফার উৎস ও কর্মীদের বোনাস—দুটি বিষয়ই বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
মুনাফার চেয়ে বড় প্রশ্ন স্থিতিশীলতা
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার মুনাফা নিঃসন্দেহে বড় একটি আর্থিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের পেছনে যে বাস্তবতা কাজ করেছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট, সরকারের বাড়তি ব্যাংকঋণ, রাজস্ব ঘাটতি এবং দুর্বল বেসরকারি ঋণপ্রবাহ—এসব পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক রিজার্ভের বিনিয়োগ থেকেও এসেছে ভালো রিটার্ন।
তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ কেবল মুনাফা ধরে রাখা নয়; বরং এমন একটি আর্থিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি ঋণের ওপর কম নির্ভর করবে, বেসরকারি খাতে উৎপাদনশীল ঋণ বাড়বে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সরকারের রাজস্ব ঘাটতি কমবে।
কারণ একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সাফল্য শেষ পর্যন্ত তার মুনাফার অঙ্কে নয়—স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি ও সুস্থ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।
Shamiur Rahman
