ব্যবসায়ীদের তীব্র ক্ষোভ-অসন্তোষের মুখে কাস্টমস কমিশনার বদলি
মোংলা কাস্টমসে অচলাবস্থা নিরসন; বন্দরে প্রাণচাঞ্চল্য
মোংলা কাস্টমস হাউসে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের জটিলতা ও অচলাবস্থা নিরসন হওয়ার পর বন্দরটিতে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ প্রাণচাঞ্চল্য ও গতিশীলতা ফিরে এসেছে
অবশেষে নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বন্দর অংশীজনদের ধারাবাহিক আপত্তি, ব্যবসায়ীদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে মোংলা কাস্টমস হাউসের কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহম্মেদকে অন্যত্র বদলি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিনিয়র সহকারী সচিব এবং কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন-১ শাখার দ্বিতীয় সচিব মোহাম্মদ আবুল মনসুর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ঢাকা কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটে বদলি করা হয়। একই আদেশে ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মিয়া মোঃ আবু ওবায়দাকে মোংলা কাস্টমস হাউসের নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদায়ী কাস্টমস কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহম্মেদের বিরুদ্ধে মোংলা বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবসায়ীদের অনর্থক হয়রানি ও জটিলতা সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। এর ফলে বন্দরে এক ধরনের বাণিজ্যিক স্থবিরতা তৈরি হয়।
অযথা হয়রানি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা: ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছিল, মোংলা কাস্টমস হাউসে ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদ যোগদানের পর পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও ধীরগতির হয়ে পড়ে।
অনর্থক ফাইল আটকে রাখা: কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আমদানিকৃত পণ্যের ফাইল ও ছাড়পত্র ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন আটকে রাখা হতো বলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা অভিযোগ করেন।
শুল্কায়নে বৈষম্য: অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ
প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক (কাস্টমস ডিউটি) আরোপ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদের বিরুদ্ধে।
এই অতিরিক্ত শুল্কায়নের ফলে মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের খরচ অন্যান্য বন্দরের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়, যা তাদের লোকসানের মুখে ফেলে।
মোংলা বন্দর ধ্বংসকারী
কাস্টমস কমিশনারের বৈরী ও বিতর্কিত নীতিমালার কারণে নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিকারকরা মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছিলেন। তারা পণ্য খালাসের জন্য বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর বা স্থলবন্দরগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন।
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ করেন যে, ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদের বিতর্কিত ও বৈরি সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবসায়ীরা মোংলা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছিলেন
স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, তার এমন কর্মকাণ্ড চলমান থাকলে মোংলা বন্দরটি স্থবির হয়ে পড়বে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।
আইনের বয়ানের আড়ালে চোরাচালানে সহযোগী
মোংলা কাস্টমস হাউজের সদ্যবিদায়ী কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদ বন্দরের সাধারণ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে অযথা হয়রানি করলেও অসাধু ব্যবসায়ী ও চোরাচালান চক্রের সাথে গভীর সখ্যতা বজায় রেখেছিলেন। এজন্যই মোংলা বন্দর দিয়ে অবাধে মিথ্যা ঘোষণায় কনটেইনার ও পণ্য ছাড় হতো। বিপরীতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করা হতো।
সম্প্রতি কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদের বদলির দাবিতে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন জোরালো হলে বন্দরে কাস্টমস গোয়েন্দাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। অনেকটা নীরবেই তাদের নজরদারিতে পড়ে যান চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্য এবং মোংলা কাস্টমস হাউজের একাধিক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।
সম্প্রতি, মোংলা বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ ঘোষণা দিয়ে তিন থেকে চারটি বড় খণ্ডে কেটে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।
কাস্টমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাড়ির খণ্ডগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ সংযুক্ত রয়েছে। এসব অংশ পুনরায় সংযোজন করলে গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব।
চালানটিতে শনাক্ত চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি। অথচ পুরো চালানটি ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা এবং শুল্ক-করসহ পরিশোধযোগ্য অর্থ ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানায়, চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪। আমদানিকারক ঢাকার গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট খুলনার এসটি ইন্টারন্যাশনাল। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে চালানটি আনা হয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মোংলা সার্কেল মিথ্যা ঘোষণায় চাঞ্চল্যকর এই গাড়ী চোরাচালান রুখে দেয়। এই অবৈধ কার্যক্রমের সাথে মোংলা কাস্টমস হাউজের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত বলে সন্দেহ করছেন শুল্ক গোয়েন্দারা।
কাস্টমসে 'দুর্বৃত্তায়ন' ও অনিয়ম
মোংলা কাস্টমস হাউসের এই অব্যবস্থাপনা কেবল ব্যবসায়ীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গত ১৭ আগস্ট মোংলা বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সরকারের সড়ক পরিবহন, সেতু, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম কাস্টমস হাউসে "দুর্বৃত্তায়ন" চলছে বলে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘কাস্টমস কর্মকর্তারা যেখানেই যান সেখানেই তারা রাজত্ব বানিয়ে নেন। কাস্টমস আইনের নামে হয়রানি, নিজেরটা হলে সব ঠিক - এগুলো আর চলবে না।
তিনি আরও বলেন, কাস্টমস নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই বলেন কাস্টমসে দুর্বৃত্তায়ন চলে। নেপালে বাজেটের ১৫ শতাংশ আয় হয় কাস্টমস থেকে। আর আমাদের ৯ শতাংশ। মানুষ এখন ট্যাক্স দিতেও ভয় পায়।
সদ্যবিদায়ী কাস্টমস কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদের নাম উল্লেখ না করেই নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, 'মোংলায় কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দুর্বৃত্তায়ন চলবে না।’
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল।
বন্দরে অচলাবস্থা
বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন ও বন্দর সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এমনকি তাকে অপসারণের জন্য বন্দর ব্যবহারকারীরা এক সপ্তাহের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন।
ব্যবসায়ীদের লাগাতার প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং বন্দর সচল রাখার স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদকে মোংলা থেকে সরিয়ে ঢাকা কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটে বদলি করতে বাধ্য হয়।
বিতর্ক ও হয়রানির পরিসমাপ্তি
ড. আবু নূর রাশেদ আহমেদকে বদলি করার সিদ্ধান্তকে মোংলা বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, পণ্য খালাস এবং ছাড়করণের ক্ষেত্রে কাস্টমসের অনর্থক ফাইল আটকে রাখার দীর্ঘসূত্রতা দূর হবে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বৈরী মনোভাব দূর হয়ে মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক খরচ ও হয়রানি কমবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আহসান হাবিব দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকেই পরিবর্তনের হিমশীতল হাওয়া বইছে রাজস্ব ভবনে। এর আগে, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)-র মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান শুরু থেকেই কর ফাঁকি, অর্থ পাচার, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কড়াকড়ি ও অনুসন্ধান আরও জোরদার করেছেন। ফলে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ বড় একটি অংশের কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের একাংশের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ঘুষ-দুর্নীতির মায়াজালে আটকে গেছেন। শুধু শীর্ষ কর্মকর্তারাই নন, কাস্টমসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও প্রতিদিনই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এবং গণমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়ছে।
মোংলা কাস্টমস হাউজেও এর প্রভাব পড়ছে। সদ্য বদলি হওয়া কাস্টমস কমিশনারসহ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফাইল ছাড়ানো এবং শুল্কায়নের জন্য লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, এনবিআরের ন্যায় দুর্নীতি দমন কমিশনেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগতেই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে শীর্ষ পদগুলোতে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। গা ঝাড়া দিয়েই জমে থাকা অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
এদিকে, এনবিআর ও দুদকের কার্যক্রমে গতি ফিরে আসায় এই দুই সংস্থার সাথে ছন্দ মিলিয়ে এগিয়ে চলছে দেশের বহুল আলোচিত অনুসন্ধানী গনমাধ্যম 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'। মূলত এনবিআর ও দুদকের চেয়ারম্যানদ্বয় এবং মহাপরিচালকের পালস বুঝতে পারায় এফটি'রও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কার্যক্রমে গতি এসেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ৫ আগষ্ট পরবর্তী মোংলা কাস্টমস হাউজকে ঘিরে উত্থাপিত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগসমূহ আমলে নিয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র দুটি চৌকস টীম মোংলা বন্দরে নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করেছে। এনিয়ে বিস্তারিত আগামী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
নতুন কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ—কাস্টমস কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনা, ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনঃস্থাপন এবং একই সঙ্গে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।
মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, একটি বন্দরের সক্ষমতা শুধু অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত কাস্টমস সেবাও এর বাণিজ্যিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত।
Shamiur Rahman
