‘‘ঝুঁকিতে দেশের কর্মসংস্থান’’

জ্বালানি সংকটে শিল্প, কৃষি ও রপ্তানি: চীন-ভারত নির্ভরতার ফাঁদও কি গভীর হচ্ছে?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৯ এএম

এমন পরিস্থিতিতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বহুমুখী এলএনজি উৎস, শিল্প অবকাঠামোর সংস্কার, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য এবং নতুন রপ্তানি বাজার

আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র; অর্থনীতির কারিগরি বিশ্লেষণ আমার কর্মক্ষেত্র নয়। তবেু একজন নাগরিক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে জ্বালানি সংকটের অভিঘাতে দেশের শিল্প, কৃষি ও রপ্তানি খাতে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বড় বিপদের সংকেতটি উপেক্ষা করার মতো মনে হচ্ছে না।

আমার উদ্বেগটা তাই কেবল আজকের গ্যাস সংকট নিয়ে নয়; প্রশ্ন হচ্ছে—এই সংকট আমাদের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য আগামী দিনে কী বার্তা বয়ে আনছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলোর একটি যে জ্বালানি খাতের ভঙ্গুরতা, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেটিই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ কমছে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কারখানা বন্ধ, কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি-এর মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় সংকটটি এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর অভিঘাত পড়ছে শিল্প, কৃষি, রপ্তানি, স্বাস্থ্যব্যয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—কর্মসংস্থানের ওপর।

৩১ আগস্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে গড়ে দৈনিক ২,২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে—আগস্ট মাসের হিসাবে এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ সরকারি হিসাবে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বিপজ্জনকভাবে বড়। এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিল্প।

নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমে যাওয়ার খবর এসেছে। নরসিংদীতে শতাধিক টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোনো কোনো কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ শিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, কিন্তু তার মূল্যও দিতে হচ্ছে—উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। আশুলিয়াতেও কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার খবর এসেছে। গাজীপুরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় যন্ত্রনির্ভর কাজের কিছু অংশ হাতে করতে হচ্ছে। ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যয়ও বাড়ছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—একটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হলেই শুধু কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয় না। উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেলেও শ্রমিকের ওভারটাইম কমে, আয় কমে এবং চাকরির নিরাপত্তা দুর্বল হয়। এই নীরব ক্ষতিটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

একজন শ্রমিকের আয় কমে গেলে তার প্রভাব শুধু ওই শ্রমিকের ওপর পড়ে না। তার সন্তানের শিক্ষা, বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, ঋণের কিস্তি—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে। লাখ লাখ শ্রমিকের আয় একসঙ্গে কমতে থাকলে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ে। ছোট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভোগ কমে যায়, অর্থনীতির চাকা আরও ধীর হয়ে আসে। অর্থাৎ শিল্পের গ্যাস সংকট শেষ পর্যন্ত একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

গার্মেন্টস খাতকে শুধু ‘বন্ধ’ বা ‘চালু’ দিয়ে মাপা যাবে না

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য এসেছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর অতিরঞ্জিত; অনেক কারখানা এখনো উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও কোথাও সক্ষমতার ৬০–৭০ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে বিটিএমএ প্রায় ৬০০ টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার দাবি করেছে। এই দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু তাতে মূল সমস্যাটি অদৃশ্য হয়ে যায় না। কারণ গার্মেন্টস শুধু পোশাক সেলাইয়ের কারখানা নয়। এর পেছনে রয়েছে স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং, অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিং, পরিবহনসহ বিশাল একটি সরবরাহব্যবস্থা। এই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর।

ফলে একটি জায়গায় গ্যাসের চাপ কমলে তার অভিঘাত পুরো পোশাকশিল্পে পৌঁছে যায়। আর আন্তর্জাতিক পোশাক ব্যবসায় সময়ের মূল্য অনেক বেশি। কারখানা সময়মতো উৎপাদন করতে না পারলে রপ্তানি চালান বিলম্বিত হয়। ক্রেতাকে ছাড় দিতে হয়, কখনো অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়, কখনো অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি অর্ডার হারানো সহজ; সেই ক্রেতাকে আবার ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এখন শুধু শিল্পমালিকের স্বার্থ নয়; এটি জাতীয় রপ্তানি স্বার্থ।

ওষুধ শিল্পেও সংকটের ছায়া

জ্বালানি সংকটের অভিঘাত ওষুধ শিল্পেও পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদনে গত কয়েক দশকে যে সক্ষমতা তৈরি করেছে, তা দেশের অন্যতম বড় শিল্পসাফল্য। দেশের চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি ওষুধের উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু এপিআই বা ওষুধের সক্রিয় কাঁচামাল উৎপাদন যদি গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে স্থানীয় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতাও বাড়তে পারে।

এখানে ঝুঁকিটা দ্বিমুখী। একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হলে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। স্বাস্থ্য খাতে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি ব্যয়—বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জেনারেটর ব্যবহার। জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বাড়ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। ফলে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। অর্থাৎ একজন মানুষ একদিকে চাকরি বা আয় হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়বে।

কৃষিও নিরাপদ নয়

গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় অভিঘাত কৃষিতে। ইউরিয়া সার কারখানাগুলো গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের ঘাটতিতে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে সার ও জ্বালানির দাম বাড়লে তার বোঝা পড়বে কৃষকের ওপর। সার ও জ্বালানির ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। উৎপাদন খরচ বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় বহন করবেন সাধারণ ভোক্তাই। তাই গ্যাস সংকটের একটি প্রান্ত শিল্পকারখানা, অন্য প্রান্ত কৃষকের মাঠ—আর মাঝখানে সাধারণ মানুষ।

এই কারণেই জ্বালানি সংকটকে কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা একটি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরের সঙ্গে যুক্ত।

এলএনজি-নির্ভরতার ঝুঁকি এখন স্পষ্ট

বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান গ্যাস ঘাটতি পূরণ করছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাসের সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ কাতার থেকে এসেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে—বিদেশি জ্বালানি সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: একটি দেশের শিল্প যদি কয়েকটি বিদেশি সরবরাহকারী এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই শিল্পের ভবিষ্যৎ আসলে কতটা নিরাপদ? সরকারকে তাই জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি-এর উৎস বহুমুখী করতে হবে। স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনে সাময়িক সংকট মোকাবিলা করা যেতে পারে; কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি হতে পারে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। নতুন কূপ খনন দ্রুত করতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এলএনজি সরবরাহের উৎস ও চুক্তি বহুমুখী করতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কারণ আগামী দশকের শিল্পনীতি আজকের গ্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা যাবে না।

চীন ও ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা—আরেকটি নীরব ঝুঁকি

জ্বালানির মতো বাণিজ্যেও বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা হলো অতিরিক্ত নির্ভরতা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ১৮.৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৯৪.৪৯ মিলিয়ন ডলার। ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭.৮৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে আমদানি ছিল প্রায় ৯.৬২ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ১.৭৬ বিলিয়ন ডলার—ঘাটতি প্রায় ৭.৮৬ বিলিয়ন ডলার। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

সমস্যা বাণিজ্যে নয়; সমস্যা নির্ভরতার ভারসাম্যে। চীন বাংলাদেশের শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স, শিল্প-উপকরণসহ বিপুল পণ্যের উৎস। ভারতের ক্ষেত্রেও তুলা, সুতা, কাঁচামাল, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যে বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে। এতে সস্তা পণ্য পাওয়া যেতে পারে, শিল্পের উৎপাদনও সচল থাকতে পারে। কিন্তু যদি একটি দেশ আমাদের শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের বড় উৎস হয়ে ওঠে, অথচ আমাদের পণ্য সেই দেশের বাজারে সমানভাবে প্রবেশ করতে না পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমরা একটি একপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়ব। বাংলাদেশ কোনো দেশের বাজারে পরিণত হতে পারে না। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত—সব দেশের সঙ্গে বাজার তৈরি করা।

চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আসিয়ান ও আফ্রিকার বাজারেও প্রবেশ বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, পাটজাত পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে হবে। ভারতের ক্ষেত্রেও একইভাবে রপ্তানির বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। বাণিজ্য বৈচিত্র্য এখন কেবল বাণিজ্যনীতি নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

সরকারের প্রথম কাজ—কর্মসংস্থান রক্ষা

বর্তমান বাস্তবতায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন। তাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিদ্যমান কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা এবং উৎপাদনশীল কারখানাগুলোকে সচল রাখা। রপ্তানিমুখী ও কর্মসংস্থাননির্ভর শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাস সরবরাহে স্বচ্ছ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহনকে আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত শিল্প-সরবরাহব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ভর্তুকির পাশাপাশি উৎপাদন দক্ষতা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও শিল্প অবকাঠামোর সংস্কার করতে হবে। অর্থনৈতিক দুর্যোগের আঘাত যেন নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর গিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। ওএমএসের আওতা বাড়ানো, টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং যেসব শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও আয় কমছে সেখানে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা দরকার। কারণ কর্মহীন হয়ে যাওয়ার পর সহায়তা দেওয়ার চেয়ে কর্মসংস্থানটি টিকিয়ে রাখা অনেক বেশি মানবিক এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর।

বাংলাদেশ এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবার সংকট এলে শুধু এলএনজি কিনে, ভর্তুকি বাড়িয়ে এবং সাময়িক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। দরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বহুমুখী এলএনজি উৎস, শিল্প অবকাঠামোর সংস্কার, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য এবং নতুন রপ্তানি বাজার।

সবচেয়ে বড় কথা, অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে কর্মসংস্থানকে বসাতে হবে। কারণ একটি কারখানা বন্ধ হওয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়। তার সঙ্গে একটি শ্রমিক পরিবারের আয় বন্ধ হয়, স্থানীয় বাজার দুর্বল হয়, সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। আজকের গ্যাস সংকট তাই কেবল গ্যাসের সংকট নয়। এটি আমাদের শিল্পনীতির দুর্বলতার পরীক্ষা, আমাদের বাণিজ্যনীতির সীমাবদ্ধতার সতর্কবার্তা এবং সর্বোপরি—দেশের কর্মসংস্থানের জন্য একটি আগাম বিপদের সংকেত।

সংকেতটি উপেক্ষা করার অর্থ শুধু কয়েকটি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া নয়; এর অর্থ হবে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিতকেই ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত