বাংলাদেশের বাজার সংকুচিত হলেও চীন-ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি
ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ শুধু ইউরোপীয় ক্রেতাদের চাহিদা কমার কারণে রপ্তানি কমেনি; একইসঙ্গে বাংলাদেশ যে অর্ডার পাচ্ছে, সেগুলোর গড় মূল্যও কমেছে
☞ জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ : $১৯৯৯ মিলিয়ন
☞ জানুয়ারি-জুলাই ২০২৬ : $১৭২৬ মিলিয়ন
☞ পোশাকের গড় মূল্য ৮.৪৭ শতাংশ কমে ১৩.৮০ ইউরো
☞ সংকুচিত বাজারে রপ্তানি কমেছে ১৩.৬৫%
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ।
অর্থাৎ ইউরোপের পোশাকের বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে সেই বাজার সংকোচনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি হারে। বিপরীতে একই সময়ে চীন ও ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং বাজার ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সাত মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১.৬৪ বিলিয়ন ইউরো
ইউরোস্টেটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউ বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২.০১ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পোশাক আমদানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ১০.৩৭ বিলিয়ন ইউরোতে—এক বছরে কমেছে প্রায় ১.৬৪ বিলিয়ন ইউরো।
এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৭৯৬.৯৮ মিলিয়ন কেজি পোশাক রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৭৫১.৯১ মিলিয়ন কেজিতে। অর্থাৎ পরিমাণের দিক থেকে পতন হয়েছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ শুধু ইউরোপীয় ক্রেতাদের চাহিদা কমার কারণে রপ্তানি কমেনি; একইসঙ্গে বাংলাদেশ যে অর্ডার পাচ্ছে, সেগুলোর গড় মূল্যও কমেছে।
বাংলাদেশের পোশাকের দাম কমেছে, প্রতিযোগীদের বেড়েছে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো গড় ইউনিট রপ্তানি মূল্য। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য কেজিপ্রতি ১৩.৮০ ইউরো, যা এক বছর আগে ছিল ১৫.০৭ ইউরো। অর্থাৎ গড় মূল্য কমেছে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ইইউতে পোশাক আমদানির সামগ্রিক গড় মূল্য ছিল প্রায় ১৯.৮৪ ইউরো প্রতি কেজি। অর্থাৎ বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্য ইইউর সামগ্রিক আমদানি মূল্যের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ একই সময়ে তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রি করেছে। ভিয়েতনামের গড় ইউনিট মূল্য বেড়ে হয়েছে ২৯ ইউরো, যা বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। কম্বোডিয়ার গড় মূল্য বেড়ে হয়েছে ১৮.৬৭ ইউরো। চীনের গড় মূল্য ছিল ২০.২০ ইউরো। পাকিস্তানের গড় মূল্য অবশ্য বাংলাদেশের চেয়েও কম—১০.৭৭ ইউরো।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে রপ্তানি পরিমাণ কমছে এবং ইউনিট মূল্যও কমছে—যেখানে কিছু প্রতিযোগী দেশ তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখছে বা বাড়াচ্ছে।
সংকুচিত বাজারেও চীন-ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি
ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ৫৪.৩৯ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ৫১.৬১ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। আমদানির পরিমাণও কমেছে ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের পোশাকের বাজারে সামগ্রিকভাবে চাহিদা ও আমদানি দুটোই দুর্বল হয়েছে।
কিন্তু এই সংকুচিত বাজারে সব সরবরাহকারী সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ১৬.৪২ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ২.৫৫ বিলিয়ন ইউরোতে। ভিয়েতনাম এই সময়ে কম্বোডিয়াকে পেছনে ফেলে ইইউর পঞ্চম বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পাশাপাশি তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াও পতনের মুখে পড়েছে। তবে বড় সরবরাহকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের পতন সবচেয়ে বেশি। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৩.৩২ শতাংশ, ভারতের ১২.২৪ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১.৮১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৬.৬৯ শতাংশ।
চীনের সঙ্গেও ব্যবধান বাড়ছে
বাংলাদেশ এখনো ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী, তবে চীনের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে চীন ইইউতে ৮১৬.২৬ মিলিয়ন কেজি পোশাক পাঠিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.১৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ পাঠিয়েছে ৭৫১.৯১ মিলিয়ন কেজি, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৬৬ শতাংশ কম।
অর্থাৎ পরিমাণের দিক থেকেও চীন এখন বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এটি বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাও তুলে ধরছে—বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করলেও তার বড় অংশ এখনো তুলনামূলক কমমূল্যের পণ্য।
কম দামের পণ্যে আটকে থাকার ঝুঁকি
বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে পণ্যের বহুমুখীকরণ ও উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। সাম্প্রতিক ইউরোপীয় বাজারের পরিসংখ্যান সেই প্রয়োজনীয়তাকেই আরও স্পষ্ট করছে।
বাংলাদেশের গড় ইউনিট মূল্য যেখানে ১৩.৮০ ইউরো, সেখানে ভিয়েতনামের ২৯ ইউরো। ফলে একই পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেও প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক বেশি রপ্তানি আয় করতে পারছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষ্যমতে, ভিয়েতনাম ইইউতে তুলনামূলক বেশি উচ্চমূল্যের পোশাক পাঠাচ্ছে, আর বাংলাদেশ এখনো কমমূল্যের পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তিনি অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে মূল্য প্রতিযোগিতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
জুন-জুলাইয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
টানা কয়েক মাসের বড় পতনের পর সাম্প্রতিক দুই মাসে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছিল ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। কিন্তু জুলাই শেষে সাত মাসের হিসাবে পতন নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে।
জুনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ০.৮৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১.৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়। জুলাইয়েও বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে জানুয়ারি-মে সময়ের বড় পতনের পর জুন ও জুলাইয়ে বাজারে অর্ডার ও চালানের কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, মাত্র দুই মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারের লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আপাতত পতনের গতি কমার সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সামনে এলডিসি উত্তরণ, বাড়ছে প্রতিযোগিতার চাপ
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে। ইউরোপীয় বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর একটি। ফলে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা আগামী দিনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, ক্রেতাদের অর্ডার পুনর্বিন্যাস, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপের কথা তুলে ধরেছেন। বিজিএমইএ-র তথ্য ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলের পরিবর্তন এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা। ফলে শুধু কম দামে বেশি পরিমাণ পোশাক উৎপাদন করে ইউরোপের বাজারে অবস্থান ধরে রাখা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হতে পারে।
‘বাজার সংকোচন’ নাকি ‘বাজার হারানো’?
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল সাম্প্রতিক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে—এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, চীন ও ভিয়েতনাম একই বাজারে তাদের রপ্তানি বাড়াতে পেরেছে এবং বাংলাদেশের পতন ছিল সবচেয়ে বেশি।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে—ইউরোপের বাজার কি শুধু সংকুচিত হচ্ছে, নাকি সংকুচিত বাজারের মধ্যেও বাংলাদেশ তার অংশ প্রতিযোগীদের হাতে তুলে দিচ্ছে?
জানুয়ারি-জুলাইয়ের তথ্য দ্বিতীয় আশঙ্কাটিকেই জোরালো করছে। কারণ ইইউর সামগ্রিক আমদানি যেখানে ৫.১০ শতাংশ কমেছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১৩.৬৫ শতাংশ। একই সময়ে চীন ও ভিয়েতনাম প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
মূল চ্যালেঞ্জ—মূল্য সংযোজন
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে—বাজার ধরে রাখা, পণ্যের মূল্য সংযোজন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতায় টিকে থাকা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চমূল্যের পোশাক, ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমফ), টেকনিক্যাল ও ফাংশনাল পোশাক, ডিজাইন ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন আর কেবল দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নয়; ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার জন্য এগুলো ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে।
কারণ বর্তমান পরিসংখ্যান একটি স্পষ্ট চিত্র দিচ্ছে—বাংলাদেশ কম পরিমাণে পোশাক রপ্তানি করছে, আবার সেই পোশাকের গড় মূল্যও কমছে। বিপরীতে কিছু প্রতিযোগী দেশ কমে যাওয়া বাজারেও বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
সাম্প্রতিক জুন-জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধি তাই কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও সামনে বাংলাদেশের জন্য আসল পরীক্ষা হবে—এই প্রবণতা কতটা টেকসই করা যায় এবং ইউরোপের বাজারে কমমূল্যের বৃহৎ সরবরাহকারী থেকে উচ্চমূল্যের, বৈচিত্র্যময় ও অধিক মূল্য সংযোজিত পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে কত দ্রুত রূপান্তর ঘটানো যায়।
Shamiur Rahman
