ক্ষমতার পালাবদলে রং বদল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ; নামে-বেনামে শতকোটি টাকার সম্পদ
ক্যাবের ‘আলাদিনের চেরাগ’ প্রকৌশলী শাহিনুর
অভিযোগ রয়েছে যে, ক্যাবের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া হোসেনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভয় দেখিয়ে এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে তিনি সরকারি প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব)-এর বিভিন্ন পর্যায়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। এবার সেই অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে সংস্থাটির সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহিনুর আলমের নাম। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজের অবস্থান বদল, বিমানবন্দরের বিভিন্ন উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণকাজে প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘিরে তাকে নিয়ে ক্যাব-এর অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে শাহিনুর আলম শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি অংশে নিজের প্রভাব বলয় তৈরি করেছিলেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ‘নিজস্ব বলয়’
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রজীবন থেকেই শাহিনুর আলম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনে প্রবেশের পর রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ।
ক্যাব-এর কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, দায়িত্ব পালনের সময় তার আচরণে এমন এক ধরনের প্রভাব ও ক্ষমতার প্রদর্শন দেখা যেত, যা সহকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করত।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগের কারণে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে অনাগ্রহী ছিলেন।
পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন
শাহিনুর আলমের কর্মজীবনের পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভাগীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর তাকে প্রায় তিন বছর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে যে, ক্যাবের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া হোসেনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভয় দেখিয়ে এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে তিনি সরকারি প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি আদায় করেন।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী জাকারিয়ার বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। পদোন্নতির প্রক্রিয়াটি বিধি অনুযায়ী হয়েছিল কি না, সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই প্রয়োজন।
টেন্ডার ও সরবরাহকাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
২০২৩-২৪ অর্থবছরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে ক্যাব-এর ই/এম ডিভিশন-১ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহিনুর আলম।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ওই সময় টার্মিনালের বিভিন্ন উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক লাউঞ্জসহ টার্মিনালের বিভিন্ন অংশে প্যানেল লাইট, কনভেয়ার বেল্ট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পানির মোটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি কাজ পাইয়ে দেওয়া বা বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চাপ দেওয়া হতো। এমনকি পবিত্র ওমরাহ পালনের সময় সৌদি আরবে অবস্থান করেও ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
ঠিকাদারদের ক্ষোভ
শাহিনুর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তাদের একজনের ভাষায়, ক্যাবের বিভিন্ন পর্যায়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা থাকলেও শাহিনুর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন ও পরিমাণ আলাদা।
আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য?
শাহিনুর আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ তার কথিত বিপুল সম্পদ নিয়ে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রাজধানী ঢাকা ও টাঙ্গাইলে তার নামে, পরিবারের সদস্যদের নামে কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে সম্পদ থাকার দাবি করেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় তার মূল্যবান জমি, উত্তরা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে।
টাঙ্গাইলে রয়েছে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, মাছের খামার এবং ডেইরি ফার্ম—এমন দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, একজন সরকারি প্রকৌশলীর বৈধ আয় ও চাকরিজীবনের সঙ্গে এসব সম্পদের পরিমাণের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, বাজারমূল্য, ক্রয়ের সময় এবং অর্থের উৎস যাচাই করতে ভূমি রেকর্ড, দলিল, কর নথি, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।
যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহিনুর আলমের ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। খুদেবার্তাও পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
প্রতিবেদকের নম্বর ব্লক করে দেওয়া হয়েছে বলেও দেখা যায়। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য বা কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি পরবর্তীতে বক্তব্য দিলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
অনুসন্ধান অব্যাহত
শাহিনুর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, পদায়ন ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ক্যাবের প্রশাসনিক নথি, টেন্ডার ডকুমেন্ট, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী শাহিনুর আলমের নামে ও বেনামে থাকা কথিত সম্পদের উৎস, সম্পত্তির অবস্থান, সংশ্লিষ্ট দলিল-নথি এবং উক্ত সম্পদ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব বিষয় নিয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র নিবিড় অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত এই প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে প্রকাশিত হবে।
Shamiur Rahman
