মাদ্রাসা, ক্যাডেট, বাংলা, ইংলিশ—কেমন বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে?

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৯ পিএম

একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কি তার পরিবারের আয় ঠিক করবে, নাকি তার মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্নের জন্য রাষ্ট্র সমান দরজা খুলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে—আমরা কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছি

একই দেশের দুই শিশু। একজন শহরের নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। সকালে গাড়ি এসে তাকে নিয়ে যায়; শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার, ভাষা শেখার আলাদা পরিবেশ, নানা ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রম। অন্য শিশুটি হয়তো প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে পড়ে। সেখানে ভালো শিক্ষক পাওয়া কঠিন, ক্লাসের বাইরে তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়, বইয়ের পাশাপাশি গাইডই হয়ে ওঠে ভরসা।

দুইজনের বয়স কাছাকাছি। দুজনই বাংলাদেশের নাগরিক। অথচ তাদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে দুই রকম পৃথিবী।

আরেক শিশু মাদ্রাসায় পড়ছে। কারও সন্তান ক্যাডেট কলেজে। কেউ বাংলা মাধ্যমে, কেউ ইংরেজি মাধ্যমে। শিক্ষার এই বহুমাত্রিকতা একটি আধুনিক সমাজে স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হতে পারত। কিন্তু যখন শিক্ষার ধরন নির্ধারিত হয় পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা সুযোগের অসমতার ভিত্তিতে, তখন শিক্ষা আর কেবল জ্ঞান অর্জনের পথ থাকে না; তা হয়ে ওঠে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি।

তখন প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশে শিক্ষা কি সত্যিই সবার মৌলিক অধিকার, নাকি পরিবারের সামর্থ্যই একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রথম পাঠ্যপুস্তক?

বিদ্যালয়ের বাইরে আরেকটি শিক্ষা ব্যবস্থা

দেশের গ্রামগঞ্জে অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানের পড়াশোনা এখন শুধু স্কুলের বেতন বা বই-খাতার খরচ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাইভেট পড়া, কোচিং, গাইড বই, যাতায়াতসহ নানা ব্যয়।

একজন শিক্ষক একটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়ান, অন্য শিক্ষক আরেকটি বিষয়ে। অনেক পরিবারকে একাধিক শিক্ষকের কাছে সন্তানকে পড়াতে হয়। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

Education Watch 2023-এর হিসাবে, ২০২২ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ছিল ২ হাজার ২৭৮ টাকা। ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৫২ টাকায়—এক বছরে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধির চিত্র উঠে আসে গবেষণায়।

এই বাড়তি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। যাদের আয় সীমিত, তাদের কাছে সন্তানের শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত খরচই একটি নতুন হিসাব।

একজন অভিভাবক যদি সন্তানের পড়াশোনার জন্য স্কুলের পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ে আলাদা শিক্ষক রাখার সামর্থ্য না রাখেন, তাহলে সেই শিশুটি কি একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে?

প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত সামর্থ্যের নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতারও।

বই আছে, শিক্ষা কতটা আছে?

শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট পাঠ্যবই ও মূল্যায়ন পদ্ধতি। একটি শিশুর শেখার কথা ছিল—কেন, কীভাবে, কোথায়, যদি এমন হয় তাহলে কী হবে? তাকে প্রশ্ন করতে শেখানোর কথা ছিল। নিজের ভাষায় ভাবতে, যুক্তি দিতে, ভুল করতে এবং সেই ভুল থেকে শিখতে শেখানোর কথা ছিল।

কিন্তু পরীক্ষার নম্বর যখন শিক্ষার প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন শিশুর সামনে জ্ঞানের বদলে হাজির হয় উত্তর মুখস্থ করার চাপ।

ফলে শিক্ষার্থী অনেক সময় উত্তর জানে, কিন্তু বিষয়টি বোঝে না। সংজ্ঞা বলতে পারে, কিন্তু বাস্তব উদাহরণ দিতে পারে না। পরীক্ষার খাতায় ভালো লিখতে পারে, কিন্তু নতুন কোনো সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে থেমে যায়।

মুখস্থবিদ্যার এই চাপ শুধু সৃজনশীলতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; নকলের প্রবণতাও বাড়াতে পারে। কারণ যখন শিক্ষা হয়ে ওঠে ‘সঠিক উত্তরটি মনে রাখার’ প্রতিযোগিতা, তখন শেখার চেয়ে উত্তর পাওয়ার পথটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আমরা যদি শিশুদের শুধু পরীক্ষার্থী বানাই, তাহলে তাদের শিক্ষার্থী বানানোর কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কেন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ছে?

বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসংখ্যার প্রবণতায়।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯২ লাখ ৩ হাজার ৪২৭ থেকে কমে ৮১ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৮ হয়েছে। অর্থাৎ কমেছে ১০ লাখের বেশি।

অন্যদিকে একই সময়ে দাখিল ও আলিম পর্যায়ের মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৪ লাখ ৯১ হাজার ২৬৮ থেকে বেড়ে ২৭ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৪ হয়েছে—বৃদ্ধি প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার।

এই পরিসংখ্যানকে শুধু ‘মানুষের পছন্দ বদলে গেছে’ বলে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি অংশ বাদ পড়ে যায়।

কোনো পরিবার কেন একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেয়—তার পেছনে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ যেমন কাজ করতে পারে, তেমনি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের কাছে তুলনামূলক কম ব্যয়ে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে কোনো কোনো পরিবারের কাছে মাদ্রাসা একটি বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষাবিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই প্রবণতার সব কারণকে অর্থনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীসংখ্যা কমা-বাড়ার সঙ্গে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, করোনা মহামারীসহ আরও নানা বিষয় জড়িত থাকতে পারে। অর্থাৎ আমাদের প্রয়োজন স্লোগান নয়—প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ।

ইংরেজি মাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব

অন্যদিকে শহরের ইংরেজি মাধ্যম ও উচ্চ ব্যয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্তানকে পড়ানোর সামর্থ্য সবার নেই।

এখানে শুধু ভাষার পার্থক্য নয়; অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, সহশিক্ষা কার্যক্রম, যোগাযোগের দক্ষতা এবং সামাজিক নেটওয়ার্কেও পার্থক্য তৈরি হয়।

একজন শিশু ছোটবেলা থেকেই ইংরেজিতে যোগাযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও নানা ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে আরেক শিশুর বিদ্যালয়ে হয়তো পর্যাপ্ত শিক্ষকই নেই।

এই দুই শিশুকে পরে যখন একই জাতীয় প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো হয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—তাদের প্রস্তুতি কি সত্যিই সমান ছিল?

ক্যাডেট কলেজের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়

ক্যাডেট কলেজসহ বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি আলাদা ধরনের শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে। আবাসিক ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা, শিক্ষা, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা। কার্যক্রমের সমন্বিত কাঠামো সেখানে রয়েছে।

এই ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকা নিয়ে প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো—একটি রাষ্ট্রে উৎকৃষ্ট শিক্ষার সুযোগ কি কেবল কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

যদি একটি ভালো শিক্ষার পরিবেশের জন্য অভিভাবককে সন্তানকে বিশেষ প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হয়, তাহলে সাধারণ বিদ্যালয়গুলো কেন একই মানের শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারবে না?

রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ভালো করা নয়; বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ন্যূনতম মানকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে গ্রামের একটি শিশুও ভালো শিক্ষক, ভালো বই, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির সুযোগ পায়।

চার শিক্ষাধারা, কিন্তু ভবিষ্যৎ এক

বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা কিংবা ক্যাডেট—শিক্ষার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। মতাদর্শ, ভাষা, পরিবেশ ও কাঠামোতেও পার্থক্য থাকতে পারে।
কিন্তু দিন শেষে সবাই একই রাষ্ট্রের নাগরিক।

কেউ বাংলা মাধ্যমে পড়ে, কেউ ইংরেজি মাধ্যমে; কেউ মাদ্রাসায়, কেউ ক্যাডেট কলেজে। কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশের সময় তাদের প্রত্যেককেই দক্ষতা, যোগ্যতা, সৃজনশীলতা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

শিক্ষা যদি কর্মদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সার্টিফিকেট বাড়বে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সংকট থেকেই যাবে।

তাই শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারে, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

আমরা আসলে কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছি?
আজকের শিশু আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাই আজ আমরা তাদের কীভাবে শিক্ষা দিচ্ছি, তার ওপর আগামী বাংলাদেশের চরিত্র অনেকটাই নির্ভর করবে।

আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করছি, যেখানে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে বাবা-মায়ের আয় বেশি নির্ধারণ করবে?

আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে ভালো শিক্ষার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান খুঁজতে হবে, ভালো শিক্ষকের জন্য প্রাইভেট পড়তে হবে, ভালো ইংরেজির জন্য আলাদা মাধ্যম বেছে নিতে হবে এবং ভালো সুযোগের জন্য শহরে যেতে হবে? নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে চাই, যেখানে গ্রামের সাধারণ পরিবারের শিশুটিও জানবে—তার জন্মপরিবার দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু তার স্বপ্ন দরিদ্র নয়?

শিক্ষা কোনো পরিবারের সম্পদ প্রদর্শনের মাধ্যম হতে পারে না। শিক্ষা হওয়া উচিত সামাজিক বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি নিজেই অর্থ, শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে আমরা শুধু ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছি না; আমরা একই দেশের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি।

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন মাদ্রাসা থাকবে কি না, ইংরেজি মাধ্যম থাকবে কি না, ক্যাডেট কলেজ থাকবে কি না—তা নয়। মূল প্রশ্ন আরও গভীরে।

একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কি তার পরিবারের আয় ঠিক করবে, নাকি তার মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্নের জন্য রাষ্ট্র সমান দরজা খুলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে—আমরা কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত