ভুল আদেশ সংশোধন হলো—দায়ের মূল্য কে দেবে?
সরকারি কর্মকর্তার একটি ভুল সিদ্ধান্ত যখন একজন নাগরিকের স্বাধীনতা, জীবিকা কিংবা জীবনের কয়েকটি বছর কেড়ে নেয়!
একজন নাগরিক ভুল করলে রাষ্ট্র খুব দ্রুত তার মূল্য নির্ধারণ করে ফেলে । কর দিতে দেরি হলে জরিমানা, লাইসেন্সের শর্ত ভাঙলে শাস্তি, নির্ধারিত কাগজপত্রে ভুল হলে আবেদন বাতিল, আইন না জানার অজুহাত কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়—রাষ্ট্রের এই নীতির সঙ্গে নাগরিকের পরিচয় বহু পুরোনো।
কিন্তু প্রশ্নটা যদি উল্টো করে করেন তাহলে কি দাড়ায়? আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ভুল করেন, সেই ভুলের মূল্য কে দেন?
প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক শুদ্ধতার জন্য নয়, কখনো এটি একজন মানুষের স্বাধীনতা, জীবিকা, সম্পদ—এমনকি জীবনের কয়েকটি বছর পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার প্রশ্ন।
আপনাদের কি জাহালমের কথা মনে আছে ? তিনি কোনো দুর্নীতির মূল চরিত্র ছিলেন না। তবু ভুল শনাক্তকরণের কারণে তাঁকে একাধিক দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয় এবং প্রায় তিন বছর কারাগারে থাকতে হয়। পরে দুদকের নিজস্ব তদন্তেও উঠে আসে যে তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুল শনাক্তকরণ এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল; তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কেউই তাঁর বাড়িতে গিয়ে যথাযথভাবে যাচাই করেননি। অথচ একজন মানুষের জীবন থেকে তিন বছর চলে গেলো। এই তিন বছর কি একটি নতুন সরকারি আদেশ দিয়ে ফেরত দেওয়া সম্ভব?
আরমানের ঘটনাও কম ভয়াবহ নয়। মূল আসামির বদলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রায় পাঁচ বছর কারাগারে রাখা হয়েছিল। হাইকোর্ট তাঁর গ্রেপ্তার ও আটককে অবৈধ এবং মৌলিক ও মানবাধিকারের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছিল; পরে সেই ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত আদেশ আপিল বিভাগে স্থগিতও হয়েছিল।
আরেকটি ঘটনা আরও নির্মম। জোবেদ আলী বিষ প্রয়োগের মামলায় প্রথমে যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছিলেন। পরে উচ্চ আদালত তাঁকে খালাস দেন। কিন্তু সেই খালাসের আদেশ যথাযথভাবে কারাগারে পৌঁছায়নি। ফলে খালাস পাওয়ার পরও তিনি ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন বলে হাইকোর্টের নথিতে উঠে আসে।
এখানে ‘ভুল’ শব্দটি খুবই ছোট। কিন্তু ভুলের ফল? তিন বছর। পাঁচ বছর। তেরো বছর। একটি সরকারি ফাইলে হয়তো এগুলো কয়েকটি নোটিং, একটি ভুল শনাক্তকরণ, একটি ভুল রিপোর্ট, অথবা সময়মতো পৌঁছায়নি এমন একটি আদেশ। কিন্তু ভুক্তভোগীর জীবনে এগুলো শুধু সময় নয়—জীবনের হারানো অধ্যায়। এখানেই সরকারি কর্মকর্তার ভুল এবং সাধারণ নাগরিকের ভুলের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়।
নাগরিকের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকে না। একজন সাধারণ মানুষ ভুল করলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, জরিমানা হতে পারে, লাইসেন্স বাতিল হতে পারে, সম্পদ জব্দ হতে পারে, এমনকি স্বাধীনতাও সীমিত হতে পারে। কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন রাষ্ট্রের হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর একটি ভুলের পেছনে থাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তাই তাঁর ভুলের দায়ও শুধু ‘মানবিক ভুল’ বলে ফাইলের মধ্যে চাপা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
অবশ্যই প্রতিটি ভুল অপরাধ নয়। একজন কর্মকর্তা জটিল আইনের একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা সৎ বিশ্বাসে গ্রহণ করতে পারেন। পরে উচ্চতর কর্তৃপক্ষ বা আদালত সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এমন প্রতিটি সিদ্ধান্তকে শাস্তিযোগ্য করলে প্রশাসন সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন যখন দেখা যায়—নথি যাচাই করা হয়নি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হয়নি, প্রযোজ্য আইন পড়া হয়নি, স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করা হয়েছে, ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করা হয়েছে, অথবা একই ধরনের ভুল বারবার ঘটেছে। আর যদি কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক বা অন্য কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করেন—তাহলে সেটিকে ‘ভুল’ শব্দের আড়ালে লুকিয়ে রাখা আরও বিপজ্জনক। সেখানে প্রশ্নটি শুধু দক্ষতার নয়। প্রশ্নটি ক্ষমতার অপব্যবহারের।
তবে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রেও প্রমাণ, তদন্ত এবং ন্যায্য প্রক্রিয়া জরুরি। কারণ জবাবদিহির নামে আরেকটি অন্যায় তৈরি করা যায় না। তাহলে সমাধান কোথায়?
আমাদের প্রশাসনে অর্থের অডিট আছে। প্রকল্পের অডিট আছে। কেনাকাটার অডিট আছে। সরকারি হিসাবের আর্থিক নিরীক্ষা আছে। কমপ্লায়েন্স নিরীক্ষা আছে। পারফরম্যান্স নিরীক্ষা-ও আছে। কিন্তু এমন একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যার কারণে একজন মানুষ বছরের পর বছর মামলা লড়লেন, কারাগারে গেলেন, ব্যবসা হারালেন অথবা বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন—সেই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ভুলের অডিট হবে না কেন?
এখানেই একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন— প্রশাসনিক ভুলের নিরীক্ষা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনঃ বিবেচনা। কোনো সরকারি কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত পরে আদালত, আপিল কর্তৃপক্ষ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাতিল বা গুরুতরভাবে সংশোধিত হলে সব ক্ষেত্রে শাস্তির প্রশ্ন না তুলে অন্তত একটি নিরপেক্ষ রিভিউ হওয়া উচিত।
সেখানে অন্তত পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার। এক. কর্মকর্তা কোন তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? দুই. সিদ্ধান্তে কোথায় ভুল হয়েছিল? তিন. ভুলের কারণে নাগরিক বা রাষ্ট্রের কী ক্ষতি হয়েছে? চার. ভুলটি অনিচ্ছাকৃত, নাকি দায়িত্বে অবহেলার ফল? পাঁচ. একই ভুল যাতে পুনরায় না ঘটে, তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে—সব ভুলকে একসঙ্গে ‘অপরাধ’ বলা হবে না। বরং ভুলের একটি যুক্তিসংগত শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হবে। একদিকে থাকবে সদিচ্ছাপ্রসূত ভুল—সৎ বিশ্বাসে নেওয়া সিদ্ধান্ত, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে থাকবে অবহেলাজনিত ভুল—যেখানে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়নি। আরও গুরুতর পর্যায়ে থাকবে ক্ষমতার অপব্যবহার—যেখানে সরকারি ক্ষমতা আইনসঙ্গত দায়িত্বের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই তিনটি একইভাবে দেখা যাবে না। কারণ প্রশাসনে জবাবদিহি মানে কর্মকর্তাকে ভুল করলেই শাস্তি দেওয়া নয়। জবাবদিহি মানে হলো—কে কী সিদ্ধান্ত নিলেন, কেন নিলেন, কী তথ্যের ভিত্তিতে নিলেন এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল কী হলো—তার একটি যাচাইযোগ্য হিসাব থাকা। জাহালমের প্রায় তিন বছর, আরমানের প্রায় পাঁচ বছর, জোবেদ আলীর ১৩ বছর—এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়।
কারাগার থেকে একজন নিরপরাধ মানুষকে বের করে দেওয়া ন্যায়বিচারের শেষ ধাপ নয়। প্রশ্ন হলো—তাঁকে সেখানে পাঠানোর মতো ভুল কীভাবে ঘটল? কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে কী হলো? কেউ যাচাই না করলে তার ফল কী হলো? কেউ ভুল তথ্য দিলে তা যাচাই করার দায়িত্ব যার ছিল, তিনি কী করলেন? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— এই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্র কী শিখল? কারণ শুধু একজন নিরপরাধ মানুষকে মুক্ত করে দিলেই প্রশাসনিক ভুলের হিসাব শেষ হয় না।
হারানো বছর ফেরানো যায় না। হারানো ব্যবসা সবসময় ফেরানো যায় না। হারানো চাকরি সবসময় ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। ভেঙে যাওয়া পরিবার আগের অবস্থায় ফিরে নাও আসতে পারে। আর মানুষের রাষ্ট্রের ওপর হারানো আস্থা কোনো সরকারি চিঠিতে পুরোপুরি পুনর্গঠন করা যায় না। তাই সরকারি কর্মকর্তার ভুলকে শুধু ‘ফাইলের ভুল’ হিসেবে দেখার দিন শেষ হওয়া উচিত। যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করেন, তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়ও যুক্ত থাকে। নাগরিকের ভুলের যদি মূল্য থাকে, সরকারি কর্মকর্তার দায়যোগ্য ভুলেরও মূল্য থাকা উচিত। তবে সেই মূল্য প্রতিশোধের নয়—জবাবদিহির। শাস্তির নয়—প্রথমে সত্য উদঘাটনের। আর ভুলকে ঢেকে ফেলার নয়—ভুল থেকে প্রতিষ্ঠানকে শেখানোর। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ক্ষমতা নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—ক্ষমতা প্রয়োগের পর নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর সক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল: একজন সরকারি কর্মকর্তার ভুলে যদি একজন নিরপরাধ মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে থাকেন, তাহলে শুধু ভুল আদেশ সংশোধন করাই কি যথেষ্ট—নাকি সেই ভুলের দায়ের মূল্যও দায়ী ব্যক্তিকে নিতে হবে ।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী।
Shamiur Rahman
