মেডিক্যাল ট্যুরিজমে চমক সিওক হেলথকেয়ারের

বিটিএম ফেয়ারে চীনা চিকিৎসায় আগ্রহী দর্শনার্থীদের ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৩১ এএম

রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই মেলায় প্রতিষ্ঠানটির স্টলে উন্নত চীনা চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ ট্রাভেল মার্ট-২০২৬। বরাবরই এই মেলাটি দেশ ও বিদেশের পর্যটন খাতের বিকাশে আয়োজিত হয়ে থাকে। তবে এবারই প্রথম বিটিএম ফেয়ারে "মেডিকেল ট্যুরিজম" বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

ঢাকায় আয়োজিত এবারের ট্রাভেল মার্টে কো-স্পন্সর হিসেবে অংশ নিয়েছে চিকিৎসা পর্যটন খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান সিওক হেলথকেয়ার। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই মেলায় প্রতিষ্ঠানটির স্টলে উন্নত চীনা চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

ক্যানসারসহ জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসা, দ্বিতীয় মতামত ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী রোগী ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে চীনের উন্নত ক্যানসার চিকিৎসা, প্রিসিশন অনকোলজি, আধুনিক রেডিওথেরাপি ও প্রোটন থেরাপি নিয়েও দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ।

এই মেলায় চীন থেকে আসা একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ডা. ঝু ওয়েনঝোন, স্টেলা চ্যান, বিল জু, মুশদাক হাসতিসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতিনিধিরা। তারা ফোশান ফসুন চ্যানচ্যাং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি সম্পর্কে দর্শনার্থীদের অবহিত করেন।

সিওক হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান এমএম মাসুমুজ্জামান বলেন, ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত একটি পরিবারকে শুধু রোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয় না, সঠিক চিকিৎসা কোথায় এবং কোন পদ্ধতিতে নেওয়া উচিত—সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়।

তিনি বলেন, রোগ নির্ণয় সঠিক হয়েছে কি না, দ্বিতীয় মতামতের প্রয়োজন আছে কি না, কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, চিকিৎসায় সম্ভাব্য খরচ কত এবং বিদেশে গেলে কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া নিরাপদ—এসব প্রশ্ন রোগী ও স্বজনদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রিপোর্ট পর্যালোচনা থেকে চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ

সিওক হেলথকেয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের কাজ শুধু রোগীকে বিদেশের কোনো হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমে রোগীর মেডিকেল রিপোর্ট, প্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, পিইটি-সিটি, আগের চিকিৎসার ইতিহাসসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়।

প্রয়োজনে ভার্চুয়াল মেডিকেল কনসালটেশন ও দ্বিতীয় মতামতের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর রোগীর জন্য সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, চিকিৎসার সময়কাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে সমন্বয় করা হয়।

বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হলে ভিসা, যাতায়াত, আবাসন, ভাষাগত সহায়তা, হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চিকিৎসা সমন্বয় এবং দেশে ফেরার পর ফলোআপের ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

চীনে ক্যানসার চিকিৎসায় বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার

ফোশান ফসুন চ্যানচ্যাং হাসপাতাল ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও আধুনিক রেডিওথেরাপির পাশাপাশি মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়। হাসপাতালের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের অনকোলজি সেবায় রোবোটিক সার্জারি, প্রিসিশন রেডিওথেরাপি, মিনিমালি ইনভেসিভ চিকিৎসা, CAR-T সেল থেরাপি ও PET/CT-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

হাসপাতালটি ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। ফসুন হেলথের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত শয্যা ১ হাজার ৭৫০টি এবং ২ হাজার ৮০০-এর বেশি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মী বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছেন। বছরে হাসপাতালটিতে প্রায় ৩১ লাখের বেশি বহির্বিভাগের রোগী সেবা নেন।

ফসুন হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর প্রতিষ্ঠানটি চীনের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর একটি শীর্ষ তালিকায় প্রথম অবস্থানে ছিল।

প্রোটন থেরাপিতে বিশেষ আগ্রহ

মেলায় দর্শনার্থীদের অন্যতম আগ্রহের বিষয় ছিল প্রোটন থেরাপি। ফোশান ফসুন চ্যানচ্যাং হাসপাতালের ক্যানসার চিকিৎসা অবকাঠামোয় আধুনিক রেডিওথেরাপির পাশাপাশি প্রোটন থেরাপির ব্যবস্থাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটন থেরাপি বা অন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। রোগীর ক্যানসারের ধরন, অবস্থান, পর্যায়, পূর্ববর্তী চিকিৎসা, বয়স ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

হাসপাতালটির ক্যানসার সেন্টার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রিসিশন অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি নিয়ে কাজ করছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ফোশান ফসুন চ্যানচ্যাং হাসপাতালের চিকিৎসকদের অংশগ্রহণে পুনরাবৃত্ত ওভারিয়ান ক্যানসারের একটি কেসে SCART-ভিত্তিক রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা

চীনে বিদেশি রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করতে ফোশান ফসুন চ্যানচ্যাং হাসপাতাল ২০২৬ সালের মার্চে একটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল সেন্টার চালু করেছে। চায়না ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটিতে ১০০টি শয্যা রয়েছে এবং চিকিৎসা পরামর্শ, পরীক্ষা, ভর্তি, পুনর্বাসন, মেডিকেল ভিসা সহায়তা, বহুভাষিক সেবা, বিমা সমন্বয় ও চিকিৎসা-পরবর্তী দূরবর্তী ফলোআপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ফসুন হেলথের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হাসপাতাল মিলিয়ে বছরে ৬০ হাজারের বেশি অনকোলজি রোগীর ভর্তি হয়েছিল। তাদের নেটওয়ার্কে একাধিক হাসপাতালে প্রিসিশন রেডিওথেরাপি, রোবোটিক সার্জারি ও অন্যান্য আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা প্রযুক্তি রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসার চাহিদার বিষয়টি সামনে রেখে এ ধরনের আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-সহায়তার গুরুত্বও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা IARC-এর GLOBOCAN 2022-এর হিসাবে, বাংলাদেশে ওই বছরে আনুমানিক ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬টি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত এবং ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ বছরে ক্যানসারে আক্রান্ত বা চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যানসার, ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসার এবং ফুসফুসের ক্যানসার উল্লেখযোগ্য; নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ খাদ্যনালির ক্যানসারও বড় অংশজুড়ে রয়েছে। 

চিকিৎসার ব্যয়ও বড় চ্যালেঞ্জ

ক্যানসারের চিকিৎসা শুধু শারীরিক নয়, অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপও তৈরি করে। ২০২৫ সালে International Journal for Equity in Health-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার চিকিৎসায় একজন রোগীর গড় বার্ষিক নিজস্ব ব্যয় ছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০৪ মার্কিন ডলার। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার ক্যানসারের কারণে কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছিল।

একই গবেষণায় বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের গড় বার্ষিক ব্যয় দেশে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে। ফলে বিদেশে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য চিকিৎসা-সুফল, ঝুঁকি, সময় ও মোট ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ-চীন স্বাস্থ্য সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

সিওক হেলথকেয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৬ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বাংলাদেশি দল চীনের গুয়াংজু পরিদর্শন করে। সেখানে প্রিসিশন অনকোলজি, আন্তর্জাতিক রোগী ব্যবস্থাপনা, রেফারেল ব্যবস্থা ও বিমা সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মেডিকেল যন্ত্রপাতি প্রদর্শনীতেও চীনা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রোটন থেরাপি ও প্রিসিশন অনকোলজি সেবা তুলে ধরা হয়।

সিওক হেলথকেয়ারের দাবি, গত তিন বছরে তারা ৪ হাজারের বেশি রোগীকে সেবা দিয়েছে। বিশ্বের ৭৫টির বেশি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সংযুক্তি রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের ১ হাজারের বেশি চিকিৎসক তাদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞের মতামত, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি এবং মোট ব্যয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা। শুধু উন্নত প্রযুক্তির নাম শুনে চিকিৎসা নেওয়ার পরিবর্তে রোগীর জন্য সেটি আদৌ প্রয়োজনীয় ও উপযোগী কি না, তা চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা উচিত।

সিওক হেলথকেয়ার ও চীনের ফোশান ফসুন চ্যানচ্যাং হাসপাতাল এবং গুয়াংজু-ভিত্তিক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-পরামর্শ ও রেফারেল ব্যবস্থায় নতুন একটি পথ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে রোগী নির্বাচন, চিকিৎসার স্বচ্ছতা, ব্যয়ের স্পষ্ট হিসাব এবং দেশে ফিরে চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়—তার ওপর।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত