ইউরোপে ১০ সপ্তাহ'র অন্তর্ধান রহস্যের পরিসমাপ্তি

নিখোঁজের আড়াই মাস পর দেশে ফিরলেন ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬ ০৩:৩৩ এএম

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে ভাড়া করা একটি বিমানে রাজধানী ইয়াউন্ডের এনসিমালেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান পল বিয়া।

দীর্ঘ ১০ সপ্তাহের বেশি সময় দেশের বাইরে থাকার পর ক্যামেরুনে ফিরেছেন বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ রাষ্ট্রপ্রধান পল বিয়া। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য ও দেশ পরিচালনার সক্ষমতা বিষয়ে চলা জল্পনার মধ্যেই দেশে ফেরেন ৯৩ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট।

চার দশকেরও বেশি সময় আগে ক্ষমতায় আসার পর বিদেশে এটিই তার সবচেয়ে দীর্ঘ সফর বলে জানা গেছে। গত ৭ জুন ক্যামেরুন ত্যাগ করেছিলেন তিনি। সে সময় দেশটির বেসামরিক মন্ত্রিসভা জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ‘ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ইউরোপে সংক্ষিপ্ত সফরে’ যাচ্ছেন।

ফার্স্ট লেডি চান্তাল বিয়াকে সঙ্গে নিয়ে  প্রেসিডেন্ট পল বিয়া বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে ভাড়া করা একটি বিমান স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্ডের এনসিমালেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

ফার্স্ট লেডি চান্তাল বিয়াকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। পরে গাড়িবহরে করে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ইউনিটি প্যালেসের উদ্দেশে রওনা হন।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তাকে স্বাগত জানাতে শাসক দল ক্যামেরুন পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের শত শত সমর্থক জড়ো হন। গাড়ির আধখোলা জানালা দিয়ে হাত নেড়ে উপস্থিত জনতাকে অভিবাদন জানান পল বিয়া। এসময় সমর্থকদের হাতে দলীয় পতাকা ও প্রেসিডেন্টের প্রশংসাসূচক ব্যানার দেখা যায়।

পল বিয়ার দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। যদিও কর্তৃপক্ষ বারবার জানিয়ে আসছিল, তিনি শিগগিরই দেশে ফিরবেন।

চলতি বছরের জুনে দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী রেনে ইমানুয়েল সাদি পল বিয়া জেনেভার কোনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন, এমন খবর অস্বীকার করেন। পরে প্রেসিডেন্টের সিভিল ক্যাবিনেটের পরিচালক স্যামুয়েল মভোন্দো আয়োলোও বলেন, তিনি হাসপাতালে ভর্তি নন এবং জেনেভায় হোটেল থেকেই নিয়মিত কাজ করছেন।

এদিকে তার অনুপস্থিতি ক্যামেরুনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দেশটিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখনো ব্যাপকভাবে প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বিরোধী নেতারা তার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সাময়িকভাবে অন্য কারও কাছে দেওয়া উচিত কি না, তা খতিয়ে দেখতে সাংবিধানিক পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়ে পরিষদ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ক্যামেরুনের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের মৃত্যু, পদত্যাগ বা স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার কারণে পদ শূন্য হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট না থাকলে সিনেটের প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে পল বিয়ার অনুপস্থিতির মধ্যেই ক্ষমতাসীন ক্যামেরুন পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (সিপিডিএম) শীর্ষ নেতারা জুলাইয়ে একটি বিরল বৈঠকে বসেন। দলটির মহাসচিব জ্যঁ নকুতে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসভা হিসেবে উল্লেখ করলেও বৈঠকটি প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা স্পষ্ট করেননি।

পল বিয়ার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের আরেকটি কারণ হলো দেশটিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি। গত এপ্রিলে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ পুনর্বহাল করা হলেও পল বিয়া এখনো এই পদে কাউকে নিয়োগ দেননি। ফলে সমালোচকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়লে স্পষ্ট উত্তরাধিকার কাঠামোর অভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এরই মধ্যে পল বিয়ার অনুপস্থিতির ৫৮তম দিনে ক্যামেরুনের সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আনা হয়। ৪ আগস্ট জারি করা তিনটি প্রেসিডেন্টের ডিক্রিতে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর প্রধানকে কর্নেল থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি দেশের পাঁচটি যৌথ সামরিক অঞ্চলের মধ্যে চারটির কমান্ডার পরিবর্তন করা হয়। এসব পরিবর্তনের কোনো সরকারি কারণ জানানো হয়নি।

এই সামরিক রদবদলও পল বিয়ার অনুপস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা আরও বাড়িয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এ পরিবর্তনকে তার অনুপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সরকার বরাবরই বলে আসছে, বিদেশে থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা পল বিয়ার রয়েছে।

ক্যামেরুনে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ২০২৪ সালেও পল বিয়া প্রায় ৪২ দিন জনসমক্ষে অনুপস্থিত ছিলেন এবং তখনও তার স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক জল্পনা ছড়িয়েছিল। পরে তিনি সুইজারল্যান্ড থেকে দেশে ফেরেন। ওই ঘটনার পর ক্যামেরুন সরকার প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা নিষিদ্ধ করেছিল এবং বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

পল বিয়ার রাজনৈতিক জীবনও দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতার প্রতীক। ক্যামেরুনের প্রথম প্রেসিডেন্ট আহমাদু আহিদজোর পদত্যাগের পর ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় আসেন তিনি। ২০০৮ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সীমা তুলে দেওয়া হয়। ফলে ২০২৫ সালের নির্বাচনে অষ্টমবারের মতো জয়ী হয়ে আবারও ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পান পল বিয়া। তবে, বিরোধীরা ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ করে। নির্বাচনের পর দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়।

তার দীর্ঘ শাসনামলে দেশটি নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে বোকো হারামের হামলা এবং পশ্চিমাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থবিরতাও তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার দেশ ক্যামেরুনে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অথচ তাদের জীবনের বড় অংশজুড়েই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তারা দেখে আসছেন একই ব্যক্তিকে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত