সুদ পরিশোধেই বছরে গুনতে হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪১.১ ট্রিলিয়ন ডলার; প্রতিদিন বাড়ছে ৭.৮ বিলিয়ন করে
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা পেটের জি. পেটারসন ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী, টেইলর সুইফটের বিয়ে ও ফুটবল বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে এবারের গ্রীষ্মে দেশটির মানুষ অর্থনীতির দিকে কিছুটা কম মনোযোগ দিলে তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না।
কিন্তু দেশটির অর্থনীতিতে সমস্যার লক্ষণগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল। চলতি সপ্তাহে তা বড় শিরোনাম হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার (৪০ লাখ কোটি ডলার) ছাড়িয়ে যায়। দেশটির জাতীয় ঋণ এখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার করে বাড়ছে।
এতে দেশটির অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঋণের আকার বোঝাতে বলা যায়, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার মানে ৪০ হাজার বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ১ ট্রিলিয়ন ডলারকে এক হাজার ভাগ করলে তার ৪০ হাজার গুণ। আর এই বিপুল ঋণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মোট বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় সমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
এক দশকে দ্বিগুণ ঋণ
পিটারসন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ২০১০-এর দশকের তুলনায় এখন অনেক দ্রুত বাড়ছে। ২০২০-এর দশকে দেশটি গড়ে প্রতি পাঁচ মাসে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার করে ঋণ যোগ করছে। ২০০০-এর দশকে একই পরিমাণ ঋণ যোগ হতে সময় লাগত গড়ে ২৪ মাস; ২০১০-এর দশকে লাগত প্রায় ১১ মাস।
অর্থাৎ একসময় যে পরিমাণ ঋণ যোগ হতে প্রায় দুই বছর লাগত, এখন তা যোগ হচ্ছে মাত্র কয়েক মাসে। এ কারণেই অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণ বৃদ্ধির গতি নিয়েও উদ্বিগ্ন।
প্রতিদিন বাড়ছে কয়েক বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধির গতি এতটাই বেশি যে প্রতিদিনই কয়েক বিলিয়ন ডলার করে নতুন ঋণ যোগ হচ্ছে। পিটারসন ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দেশটি বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত গতিতে ঋণ বাড়াচ্ছে।
এই ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি। অর্থাৎ সরকার যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম। ফলে ঘাটতি পূরণে সরকারকে ধার করতে হচ্ছে। সেই ধার আবার ভবিষ্যতে সুদসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে—ফলে তৈরি হচ্ছে ঋণ ও সুদের একটি চক্র।
সুদেই যাচ্ছে ট্রিলিয়ন ডলার
ঋণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো এর সুদ পরিশোধের ব্যয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) বলছে, ২০২৬ অর্থবছরে সরকারের নিট সুদ ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। ২০২৫ সালে এই ব্যয় ছিল প্রায় ৯৭০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে শুধু পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই প্রতিবছর এমন অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা দিয়ে বিশাল আকারের বহু সরকারি কর্মসূচি পরিচালনা করা সম্ভব।
পিটারসন ফাউন্ডেশনের মতে, ঋণের সুদ এখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদের বোঝাও বাড়বে এবং তা শিক্ষা, অবকাঠামো, গবেষণা ও অন্যান্য সরকারি খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে।
ঋণ বনাম অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশাল হলেও ঋণের গতি এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস (বিইএ)-এর সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির বাস্তব জিডিপি বার্ষিক হিসাবে ১.৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। একই সময়ে বর্তমান দামের হিসাবে অর্থনীতির আকার প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ মোট জাতীয় ঋণ এখন দেশটির এক বছরের অর্থনৈতিক উৎপাদনের সমপর্যায়ের চেয়েও বেশি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মোট জাতীয় ঋণ ও ‘ঋণ-টু-জিডিপি’ অনুপাত একই বিষয় নয়। মোট জাতীয় ঋণের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন হিসাবের ভেতরের ঋণও থাকে। অর্থনীতির ওপর চাপ বোঝার ক্ষেত্রে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) সাধারণত 'জনগণের হাতে থাকা সরকারি ঋণ'কে বেশি গুরুত্ব দেয়।
সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সাল নাগাদ দেশটির ঋণ বেড়ে প্রায় ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সিবিও-এর ২০২৬ সালের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, জনগণের হাতে থাকা ফেডারেল ঋণ ২০২৬ সালে জিডিপির প্রায় ১০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৬ সালে ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি ২০২৬ সালের ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৬ সালে ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে।
আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাবে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। সিবিও-এর পূর্বাভাসে বর্তমান আইন ও নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০৫৬ সালে জনগণের হাতে থাকা ফেডারেল ঋণ জিডিপির ১৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন শুধু বর্তমান ঋণ সামলালেই হবে না; ভবিষ্যতে ঋণ বৃদ্ধির হার কমানোও বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবশ্য অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া এবং মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হওয়ায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশি সময় ধরে আর্থিক শৃঙ্খলার বাইরে থাকার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান বলেন, ‘আমরা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছি, যেখানে হলুদ সতর্কসংকেত জ্বলছে। তবে এখনো লাল সতর্কসংকেত জ্বলছে না।’
কেন এত ঋণ?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বাজেট ঘাটতি। বছরের পর বছর সরকারি ব্যয় রাজস্বের চেয়ে বেশি থাকায় ঘাটতি পূরণে ঋণ নিতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড-এর মতো কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। সিবিও'র হিসাবে ২০২৬-২০৩৬ সময়ে এসব খাতে ব্যয় আরও বাড়বে।
তৃতীয়ত, ঋণের সুদ। ঋণ যত বাড়ছে, সুদও তত বাড়ছে। আবার সেই সুদ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হলে নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। ফলে ঋণ-সুদের একটি স্বয়ংক্রিয় চাপ তৈরি হচ্ছে।
ডলার কি ঝুঁকিমুক্ত রাখবে যুক্তরাষ্ট্রকে?
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সুবিধা হলো, বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের বিশেষ অবস্থান। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ধারণ করে। ফলে অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ঋণের কোনো সীমা নেই। ঋণ যত বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, সুদের হার এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর তত বেশি গুরুত্ব পড়বে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেডিট রেটিং নিয়ে একাধিকবার সতর্কতা এসেছে। পিটারসন ফাউন্ডেশন বলছে, তিনটি বড় ক্রেডিট রেটিং অবনমন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কারণ।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
অতিরিক্ত সরকারি ঋণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো সুদের হার ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ। সরকার বড় অঙ্কে ধার করলে অর্থবাজারে ঋণের চাহিদা বাড়ে। এর ফলে সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার চাপ তৈরি হতে পারে এবং বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এরিক সোয়ানসন বলেন, এক দশক আগের তুলনায় এখনকার পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো সুদের হারের মাত্রা।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর একটি কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ায় বন্ড বাজারে এখন বেশি মুনাফা বা রিটার্ন দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের জন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ পেতে সরকার ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়াটন স্কুলের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান বলেন, সুদের হার বেড়ে গেলে সরকারের বাজেট–ঘাটতি মেটাতে ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়।
এল-ইরিয়ানের তথ্যমতে, সরকারের ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের ব্যয় এখন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। তিনি বলেন, এই সুদ পরিশোধে সরকারের কর থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। এই ব্যয় এখন প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বন্ড কিনে দেশটিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে আসছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ এরিক সোয়ানসন। তিনি বলেন, এতে একটি ‘দুষ্টচক্র’ তৈরি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ কিনতে আগ্রহী রাখতে সরকারকে ক্রমেই বেশি সুদ বা রিটার্ন দিতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে এর প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়া অনিবার্য। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের খরচ বাড়লে বিশ্বজুড়ে ঋণের খরচও বাড়তে থাকে বলে মন্তব্য করেন এরিক সোয়ানসন।
মার্কিন জনগণের ওপর প্রভাব কীভাবে পড়বে
পিটারসন ফাউন্ডেশন সতর্ক করেছে, উচ্চ ঋণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর করতে পারে এবং বাড়িঘরের ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের মতো ব্যক্তিগত ঋণের খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির কারণে পরিবারগুলোকে গৃহঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডে আরও বেশি সুদ গুনতে হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান। এতে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন।
এর পাশাপাশি ভোক্তাদের ওপর আরও একটি পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।
কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ‘কোনো না কোনোভাবে এই ঋণের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের পকেটে গিয়ে পড়ে।’
কীভাবে এখানে এসে পৌঁছাল যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিল।
১৯৮১ সালে ওই মাইলফলক অতিক্রম করাকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হয়েছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘একটি জাতি হিসেবে আমাদের যদি কোনো সতর্কবার্তার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে এটাই হোক সেই সতর্কবার্তা।’
মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বছরে এসে দেশটি এখন শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই সেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করছে।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে—এটি প্রত্যাশিতই ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনের সময় সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে ঋণের এই নতুন মাইলফলক পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু কর কমানোর কারণে সরকারের রাজস্ব সেই হারে বাড়েনি। ফলে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের জন্যও বিপুল পরিমাণ ঋণ করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি এর সাথেথে যোগ করলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলেই মনে হয়।
এরপর কী?
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশটির অর্থনীতির গতি কিছুটা কমেছে। তবে অর্থনীতি এখনো সন্তোজনক গতিতেই বাড়ছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে সরকারের রাজস্বও বাড়ে। সেই বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় কিংবা ঋণের সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হয়। পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলে ঋণের সমস্যা অনেকটাই লাঘব করা যায় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান।
অবশ্য প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত না হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য কিছু পদক্ষেপের কথা ভাবতে হতে পারে। এর মধ্যে করব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয়ে সংস্কার আনা, এমনকি কৃচ্ছ্রসাধনের পথেও হাঁটা থাকতে পারে। ঋণ পুনর্গঠনও আরেকটি বিকল্প।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশল নিয়েছে, তাকে একধরনের আর্থিক প্রকৌশল (ফাইন্যান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং) বলা যায়। এর অংশ হিসেবে বুধবার দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় বাজার থেকে সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের উদ্যোগ নেয়। এতে বন্ডের চাহিদা বাড়ে এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ কমে। তবে এর প্রভাব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পরদিনই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হার আবার বেড়ে যায়।
এদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে হোয়াইট হাউস চাইবে অর্থনীতিতে নিজেদের সাফল্য দেখাতে। ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্য-সেবার ক্রয়ক্ষমতা। তবে বিকল্প পদক্ষেপগুলোর কোনোটিই খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। আর সরকার সেসব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়েও সন্দিহান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাজেট–ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন কিছু আমি দেখতে পাচ্ছি না। রাজনৈতিক আলোচনার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মূলত কর কমানোর কথাই বলা হচ্ছে।’
কীভাবে থামবে ঋণের গতি?
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক মূলত একটি প্রতীকী সংখ্যা হলেও এর পেছনের প্রবণতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর একটি। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের ব্যয়, বাজেট ঘাটতি ও সুদ পরিশোধের ব্যয় যে গতিতে বাড়ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও)-র হিসাবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫.৮ শতাংশ হতে পারে, যা গত ৫০ বছরের গড় ৩.৮ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। ২০৩৬ সালে এই ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৬.৭ শতাংশে উঠতে পারে।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ কত?’—তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, এই ঋণ কোন গতিতে বাড়ছে এবং সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ বাজেটের কতটা অংশ আটকে যাবে।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ তাই কেবল একটি বিশাল সংখ্যা নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির সামনে থাকা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভারসাম্যের বড় সতর্কসংকেত।
Shamiur Rahman
