হুতি হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি, বিমানবন্দর-তেল স্থাপনা চুরমার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৫৯ পিএম

হুতিদের হামলার আতঙ্কে খোদ সৌদি যুবরাজ জনসম্মুখে আসা বন্ধ করেছেন। নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাকে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে নেয়া হচ্ছে। তৈরি রাখা হয়েছে রাজপ্রাসাদের বাঙ্কারযুক্ত ঘরগুলোও

সৌদি আরবের শান্ত রাতের আকাশ কেঁপে উঠলো বিকট বিস্ফোরণের শব্দে! ইয়েমেন থেকে উড়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভয়াবহ আঘাতে থমকে গেল মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষমতাধর দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। রাজকীয় আভিজাত্য আর আধুনিকতার প্রতীক রিয়াদ ও ধাহরানে তাই ক্ষণে ক্ষণে বেজে উঠছে সাইরেন। কখনো কখনো কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকাচ্ছে আকাশে। ক্ষমতার লড়াই আর হিংস্র প্রতিশোধের এই দাবানলে পুরো অঞ্চলজুড়ে নেমে এসেছে এক অজানা আতঙ্কের কালো ছায়া।

সাম্প্রতিক ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল মঙ্গলবার গভীর রাতে, যখন হঠাৎ করেই পাল্টে যায় পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানের চিরচেনা দৃশ্যপট। বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তরের একটি প্রশাসনিক ভবনে হঠাৎ করেই একঝাঁক বিধ্বংসী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। মুহূর্তের মধ্যেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো আরামকো প্রাঙ্গণ আর দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে বহুতল ভবনটির একাংশ। আগুনের লেলিহান শিখা ধাহরানের নৈশাকাশকে রক্তাক্ত লাল রঙে রঞ্জিত করলেও সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

তবে ধাহরানের এই ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বিপদের মূল অভিঘাত ধেয়ে আসে সৌদি রাজধানী রিয়াদের দিকে। আকাশে দুটি বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র স্পষ্ট হয়ে উঠতেই সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত তৎপরতার সাথে সেগুলোকে মধ্য আকাশেই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু বিপদ তাতেও পুরোপুরি কাটেনি!

আকাশেই ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র দুটির বিশালাকার ধ্বংসাবশেষ সোজা এসে পড়ে রিয়াদের জনবহুল আবাসিক এলাকার ওপর। মুহূর্তে তছনছ হয়ে যায় চারপাশ, বিকট শব্দে ধসে পড়ে অন্তত কয়েক বসতবাড়ি। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় আশপাশের যানবাহন। এই আকস্মিক ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত অনেক সাধারণ নাগরিক।

কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত চার দফায় হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের হামলায় এরই মধ্যে বিমানবন্দরটিতে ১৩ জন মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন চার শতাধিক বেসামরিক নাগরিক। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরে প্লেন চলাচলও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। অনেক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সও তাদের ফ্লাইট লম্বা সময়ের জন্য বন্ধ রেখেছে।

এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হুতিদের হামলার আতঙ্কে খোদ সৌদি যুবরাজ জনসম্মুখে আসা বন্ধ করেছেন। নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাকে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে নেয়া হচ্ছে। তৈরি রাখা হয়েছে রাজপ্রাসাদের বাঙ্কারযুক্ত ঘরগুলোও।

সংঘাতের নেপথ্যে প্রতিশোধ

এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আকস্মিকভাবে ঘটেনি বরং এর নেপথ্যে কাজ করছে প্রতিশোধের এক তীব্র রাজনৈতিক সমীকরণ। এই হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি জোটের বিমানবাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত আল-সাবাহ তেল স্থাপনায় একটি ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলার পরপরই বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতির মুখপাত্র পূর্ণ সামরিক পোশাকে ক্যামেরার সামনে এসে অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছিলেন, সানায় ফেলা প্রতিটি বোমার হিসাব নেওয়া হবে এবং সৌদি আরবের হৃৎপিণ্ডে চালানো হবে যন্ত্রণাদায়ক পাল্টা আঘাত।

নিজেদের অবস্থানের সাফাই গেয়ে বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা এখন থেকে সৌদির তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং রাজকীয় পরিকাঠামোকে তাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে। 

হামলার পূর্বে সতর্কবার্তা 

এদিকে, সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার আগেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী দেশটির সাধারণ মানুষ এবং তেল শোধনাগারের কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্কতা জারি করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার ও কঠোর। সৌদি জোট যতক্ষণ না ইয়েমেনের ওপর বিমান হামলা ও অবরোধ বন্ধ করছে, ততক্ষণ রিয়াদ থেকে ধাহরান; কোথাও কোনো শান্তি কিংবা নিরাপত্তা থাকবে না।

পরিস্থিতি এভাবে প্রতি মুহূর্তে জটিল থেকে জটিলতর হতে দেখে সৌদি রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরেও এখন তৈরি হয়েছে চরম অস্বস্তি ও থমথমে পরিবেশ। সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান জনসমক্ষে না এসে আপাতত প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত গোপনে ও সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন। রিয়াদ এখন অভূতপূর্ব এক কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে; যেখানে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের জোগান অক্ষুণ্ন রাখা আর অন্যদিকে নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর নেমে আসা এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের তাণ্ডব বন্ধ করাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রিয়াদের পাল্টা হুমকি 

তবে ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের এই দুঃসাহসিক হামলার জবাবে সৌদি সামরিক বাহিনীর প্রধান মুখপাত্র পাল্টা গর্জে উঠে জানিয়েছেন, বিদ্রোহীরা এই জ্বালানি ডিপো এবং প্রশাসনিক ভবনগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গোপন গোলাঘর হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। নিরীহ বেসামরিক মানুষদের ওপর হামলা চালিয়ে তারা চরম অপরাধ করছে এবং সৌদি জোট এর কোনো ছাড় দেবে না।

একই সাথে রিয়াদের পক্ষ থেকে তীব্র হুমকি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সানার আল-সাবাহ থেকে শুরু করে হোদেইদাহ ও রাস ইসা বন্দর পর্যন্ত হুতিদের প্রতিটি গোপন আস্তানা অচিরেই সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেবে রাজকীয় সামরিক জোট।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত