২ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা, বিদেশী অস্ত্র-গুলিসহ আটক ৩

নাফ নদীতে কাঠের ‘ডুবন্ত সাবমেরিনে' ইয়াবা পাচার!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:২০ পিএম

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম এই তথ্য জানান

ইয়াবা পাচারে নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। ড্রোনে নজরদারির পর এবার সামনে এসেছে নাফ নদীর পানির নিচ দিয়ে মাদক পরিবহণের কৌশল। কাঠের তৈরি সাবমেরিনসদৃশ বিশেষ কনটেইনারে করে নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইয়াবা আনা হতো বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

বিজিবির দাবি, ইলেকট্রিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকলের সাহায্যে পরিচালিত এই ধরনের একটি কনটেইনারে এক চালানে প্রায় ৩০ লাখ ইয়াবা পরিবহণ করা সম্ভব। উখিয়ায় অভিযানে এমন একটি কনটেইনারসহ ২ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা এবং পাচারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। এ সময় বিজিবির ক্যাপ্টেন মাহরাফ জামান উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে, ১২ অক্টোবর (সোমবার) রাতে উখিয়া ব্যাটালিয়ন ৬৪ বিজিবির আওতাধীন পালংখালী ও বালুখালী বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় পৃথক অভিযান চালানো হয়। এসময় তিনজনকে আটক করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম

সংবাদ সম্মেলনে ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানান, সোমবার রাতে পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়ায় মনিরের ঘেরে একটি মাচাংঘরের পাশে কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি নজরে আসে টহল দলের। তাদের চ্যালেঞ্জ করলে পালানোর চেষ্টা করেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা। এসময় দুইজনকে আটক করা হয়।

পরে, আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঘের ও মাচাংঘরে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত বিশেষ ডুবন্ত ক্যারিয়ার উদ্ধার করা হয়। একই রাতে বালুখালীতে পৃথক অভিযান চালিয়ে আরও একজনকে আটক করে বিজিবি।

অভিযানে উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১টি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১১ রাউন্ড গুলি, কাঠের তৈরি একটি বিশেষ ডুবন্ত ক্যারিয়ার, প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ স্টিলের তার, নয়টি কপিকল, একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি ও একটি বৈদ্যুতিক মোটর। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা।

এক কনটেইনারে আনা যায় ৩০ লাখ ইয়াবা!

বিজিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কাঠের তৈরি বিশেষ এই ক্যারিয়ারটি বৈদ্যুতিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকলের সাহায্যে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হতো। নদী থেকে পালংখালীর ফাইস্যা খাল হয়ে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার ভেতরে ক্যারিয়ারটি টেনে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। খালের আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করতে স্টিলের তার ও কপিকলের বিশেষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করত চোরাকারবারিরা।

৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানান, এই ধরনের একটি কনটেইনারে একসঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ ইয়াবা পরিবহণ করা সম্ভব। তবে উখিয়ায় অভিযানে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিমাণ ২ লাখ ২০ হাজার।

কনটেইনারটি কোথায় তৈরি হয়েছে, পাচারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আটককৃতদের সঙ্গে মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে বিজিবি।

উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে মাদক কারবারিদের নিত্যনতুন কৌশল ব্যবহারের তথ্য অতীতেও সামনে এসেছিলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবির নজরদারি জোরদার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় মাদক পাচারে প্রচলিত পদ্ধতি বদলে নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে চোরাকারবারি চক্র।

একাধিক সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের জুনে উখিয়ার পালংখালী সীমান্তে ড্রোনের মাধ্যমে বিজিবি ও স্থানীয়দের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের তথ্য প্রকাশিত হয়। তবে সেই সময় ডেলিভারি ড্রোনের সাহায্যে সরাসরি ইয়াবা পরিবহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি বিজিবি।

এর আগে, গত ৯ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় নৌকার সঙ্গে রশি দিয়ে পানিতে ভাসিয়ে রাখা বস্তা থেকে ১৪ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছিল বিজিবি। এবার ডুবন্ত কনটেইনার উদ্ধারের ঘটনা সীমান্তে মাদক পরিবহণের কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

১০ মাসে উদ্ধার ১ কোটি ৬৬ লাখ ইয়াবা

বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উখিয়া ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মাদক চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, কনটেইনারটি কোথায় তৈরি করা হয়েছে, এসব সরঞ্জাম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতেও কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, “চোরাকারবারিরা যতই নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও কৌশল অবলম্বন করুক না কেন, সীমান্তে মাদক পাচার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে বিজিবির কড়া নজরদারি ও কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত