কেমন আছেন বাদ্যযন্ত্রীরা?
আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক চর্চা কমে আসায় সংকটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রনির্ভর পেশা। বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেকেরই সারা বছরের আয় এখন অনিশ্চিত
কেমন আছেন বাদ্যযন্ত্রীরা?
শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। সারা দেশের মতো রাজবাড়ীতেও বেড়েছে ঢাকিদের কদর। পূজামণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য আর ছন্দে মুখর হয়ে উঠছে উৎসবের পরিবেশ। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দের আড়ালে কেমন কাটছে ঢাকি, বাদ্যযন্ত্রের কারিগর ও লোকশিল্পীদের জীবন? সারা বছর তাঁদের জীবিকা চলে কীভাবে? উৎসবের মৌসুমে কদর বাড়লেও বছরের বাকি সময়টা কি কাটে অনিশ্চয়তায়?
রাজবাড়ীতে কয়েকজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক চর্চা কমে আসায় সংকটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রনির্ভর পেশা। বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেকেরই সারা বছরের আয় এখন অনিশ্চিত।
‘আমাদের খবর আর কে রাখে ভাই’
রাজবাড়ীর হরিসভা মন্দিরের পাশে কথা হয় বাদ্যযন্ত্রশিল্পী কার্তিক ডুলির সঙ্গে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “আমাদের খবর আর কে রাখে ভাই! সারা বছর কাজকাম নেই। হঠাৎ কোথাও ডাক পড়লে যাই, কিন্তু তেমন পারিশ্রমিক দিতে চায় না। বাধ্য হয়ে সন্তানদের অন্য কাজে পাঠাচ্ছি।”
কার্তিক ডুলির কথায় উঠে আসে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষের বাস্তবতা। পূজার কয়েকটি দিন তাঁদের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও বছরের অন্য সময় পর্যাপ্ত কাজ থাকে না। ফলে ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
কোনো কোনো শহরে ব্যান্ড পার্টি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা পেশাভিত্তিক সংগঠন থাকলেও রাজবাড়ীতে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। ফলে অনেকে পেশাটিকে পূর্ণকালীন জীবিকা হিসেবে নিতে পারছেন না; কেউ কেউ খণ্ডকালীন কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন।
উৎসবে কদর, সারা বছর অনিশ্চয়তা
দুর্গাপূজার সময় ঢাকিদের চাহিদা বাড়লেও এই কয়েক দিনের আয় দিয়ে সারা বছরের সংসার চালানো কঠিন। পূজার মৌসুম তাঁদের কাছে বাড়তি উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু উৎসব শেষ হলে কাজের সুযোগও কমে আসে। তখন অনেককেই বিকল্প পেশার ওপর নির্ভর করতে হয়।
ঢাক, ঢোল, তবলা, একতারা ও দোতারার মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও চর্চা কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে বাদকদের পাশাপাশি নির্মাতাদের ওপরও। নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরির অর্ডার কমে গেলে কারিগরদের আয় কমে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত দক্ষতা তখন আর সংসার চালানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
কাঁচামালের দাম বাড়ায় বাড়ছে উৎপাদন খরচ দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে কাঠ, চামড়া, তারসহ বিভিন্ন উপকরণ প্রয়োজন হয়। এসব কাঁচামালের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। কিন্তু সেই অনুপাতে বাদ্যযন্ত্রের বিক্রয়মূল্য কিংবা শিল্পীদের পারিশ্রমিক না বাড়লে পেশাটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বিশেষ দক্ষতা ও ধৈর্য। একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরির পেছনে যে শ্রম ও জ্ঞান কাজ করে, তার যথাযথ মূল্য না পেলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশা আকর্ষণ হারায়। এভাবে একদিকে কমে আসে কারিগরের সংখ্যা, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের বিশেষ কৌশল।
প্রযুক্তির সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য
বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্র, রেকর্ড করা সংগীত এবং আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে অনেক অনুষ্ঠানে সরাসরি বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ঢাকি, বাদক ও বাদ্যযন্ত্র নির্মাতাদের জীবিকায়।
প্রযুক্তির ব্যবহার আধুনিক আয়োজনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর পাশাপাশি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চর্চা ও ব্যবহার ধরে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ একটি বাদ্যযন্ত্র কেবল সংগীত পরিবেশনের উপকরণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাপনের স্মৃতি।
এই চর্চা হারিয়ে গেলে শুধু কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কমবে না, হারিয়ে যেতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা কারিগরি জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও।
পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে
বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় অনেকে বিকল্প জীবিকার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ অন্য শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
জীবিকার প্রয়োজনে পেশা বদলানো তাঁদের বাস্তবতা। কিন্তু এর ফলে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বাজানোর অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম যদি এই পেশায় আগ্রহ হারায় এবং প্রবীণ কারিগরদের কাছ থেকে শেখার ধারাটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ঐতিহ্য বাঁচাতে প্রয়োজন উদ্যোগ
বাদ্যযন্ত্রশিল্পী ও কারিগরদের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লোকজ সংগীতচর্চার সুযোগ সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীদের সম্পৃক্ত করা এবং ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের কাজের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের তালিকা তৈরি, তাঁদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাদ্যযন্ত্রভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে শিল্পীরা যেমন কাজের সুযোগ পাবেন, তেমনি নতুন প্রজন্মও এই ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার ও শেখার সুযোগ পাবে।
দুর্গাপূজায় ঢাকের শব্দ আমাদের আনন্দিত করে, উৎসবকে পূর্ণতা দেয়। কিন্তু সেই ঢাকের শব্দের পেছনে থাকা মানুষগুলোর জীবন যদি অনিশ্চয়তায় ডুবে থাকে, তাহলে উৎসবের আনন্দও থেকে যায় অসম্পূর্ণ। প্রশ্ন তাই শুধু বাদ্যযন্ত্রীরা কেমন আছেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁদের শ্রমের মূল্য কতটুকু, তাঁদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?
উৎসবের আলো নিভে গেলে যখন পূজামণ্ডপ নীরব হয়ে আসে, তখন ঢাকিরাও ফিরে যান নিজেদের জীবনের হিসাব-নিকাশে। সেই জীবনে যদি কাজ না থাকে, ন্যায্য পারিশ্রমিক না থাকে, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে ঐতিহ্য বাঁচবে কীভাবে?
ঢাকের শব্দে উৎসব জাগে, কিন্তু সেই ঢাকির জীবনেও আলো জ্বলুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
Shamiur Rahman
