বেবিচক প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবকে ঘিরে পুরোনো দুর্নীতির নথি, ৮১২ কোটি টাকার মামলা ও ‘মামলা নেই’ সনদ
দুদকের মামলার আসামি - তবুও পদোন্নতি; নেপথ্যে রহস্যময় দায়মুক্তি!
চলমান দুদক মামলার তথ্য কীভাবে সরকারি পদোন্নতির জন্য দেওয়া অনাপত্তিপত্র থেকে ‘উধাও’ হয়ে গেল? আর একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দুর্নীতির মামলায় আসামি এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান, তখন তাঁর পদোন্নতির জন্য কীভাবে মামলাহীনতার সনদ এলো? আরও বড় প্রশ্ন—এই প্রক্রিয়ায় দায় কার?
একজন সরকারি প্রকৌশলী। বিমানবন্দরের ন্যায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামোর উন্নয়নে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। কয়েক বছর আগে তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের তদন্তে গুরুতর অনিয়ম, দায়িত্বে গাফিলতি ও সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে, বহাল তবিয়তে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্বে ফেরেন।
পরবর্তীতে বিমানবন্দর উন্নয়নের একাধিক প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় তাঁর নাম আসে। কিন্তু মামলার তথ্য থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ সালে তাঁর বিষয়ে দুদক থেকে দেওয়া হয় ‘কোনো মামলা নেই’ মর্মে অনাপত্তিপত্র। সেই অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পরই তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে বেবিচক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। পরে দুদক নিজেই ওই অনাপত্তিপত্রকে ভুল হিসেবে স্বীকার করে সংশোধিত চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব। তাঁকে ঘিরে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে, তা শুধু তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত (সাময়িক বরখাস্ত) একজন কর্মকর্তা, দুদকের মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকলেন এবং শেষ পর্যন্ত পদোন্নতি পেলেন?
আরও গুরুতর প্রশ্ন—চলমান দুদক মামলার তথ্য কীভাবে সরকারি পদোন্নতির জন্য দেওয়া অনাপত্তিপত্র থেকে ‘উধাও’ হয়ে গেল? আর একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দুর্নীতির মামলায় আসামি এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান, তখন তাঁর পদোন্নতির জন্য কীভাবে মামলাহীনতার সনদ এলো? আরও বড় প্রশ্ন—এই প্রক্রিয়ায় দায় কার?
২০১৯: তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ, সাময়িক বরখাস্ত
আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের প্রথম বড় সরকারি নথিভিত্তিক ঘটনা কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। ২০১৯ সালের নভেম্বরে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গনমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অদক্ষতা, দুর্নীতিপরায়ণতা ও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল। বেবিচকের চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তের অন্যতম গুরুতর বিষয় ছিল ভূমি অধিগ্রহণ।
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ৬৯ কোটি ২৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দেওয়া হয়নি। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ মামলা বাতিল হয়ে যায় এবং পরবর্তী আইনের আওতায় জমির ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আমিনুল হাসিবের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও গাফিলতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
৩৭ কোটি টাকার সীমানাপ্রাচীরেও অনিয়ম
কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।২০১৯ সালের তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমানাপ্রাচীরটি দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আমিনুল হাসিবের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রকাশিত হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ বা দায়ের কথা থাকা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তবে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি তদন্তে এমন গুরুতর পর্যবেক্ষণ থাকলে তাঁর পরবর্তী পদায়ন ও পদোন্নতির সময় বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সেটি জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বরখাস্তের পর কীভাবে আবার বড় প্রকল্পের দায়িত্ব?
এখানেই আমিনুল হাসিবের চাকরিজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। ২০১৯ সালে সাময়িক বরখাস্ত এবং বিভাগীয় মামলার পর তাঁর বিরুদ্ধে ওই মামলার চূড়ান্ত ফল কী হয়েছিল—এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ্যে নেই। তিনি কীভাবে পুনর্বহাল হলেন? কোন কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুনর্বহাল করল? বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি কীভাবে হলো? অভিযোগ থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছিলেন কি না? যদি পেয়ে থাকেন, সেই আদেশের ভিত্তি কী ছিল? আর যদি বিভাগীয় অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী পদায়ন ও পদোন্নতির সময় সেই নথি যাচাই করা হয়েছিল কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া তাঁর প্রশাসনিক ক্যারিয়ারকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা কঠিন। কারণ এরপরই তাঁকে আবার বিমানবন্দর উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর দায়িত্বে দেখা যায়।
শত শত কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্ব
বেবিচকের সরকারি প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্যেও আমিনুল হাসিবের নাম একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে রয়েছে। যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহী বিমানবন্দরের রানওয়ে সারফেসে অ্যাসফল্ট কংক্রিট ওভারলেকরণ প্রকল্পে তাঁকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে দেখানো হয়েছে। ওই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৯ হাজার টাকা।
এছাড়া চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরামর্শক সেবা এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও তাঁর দায়িত্বের তথ্য বেবিচকের সরকারি নথিতে রয়েছে।
অর্থাৎ, তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত ছিল বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের তদারকি ও বিল পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে দরপত্র ও কমিশন-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
৮১২ কোটি টাকার দুদক মামলা
২০১৯ সালের অভিযোগের কয়েক বছর পর বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে আবারও তাঁর নাম সামনে আসে—এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায়।২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিমানবন্দর উন্নয়নের চারটি প্রকল্পে মোট ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চারটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোতে মোট ১৯ জনকে আসামি করা হয়।
প্রকাশিত মামলার তথ্য অনুযায়ী অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—
➤ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি টাকা
➤ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা;
➤ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রায় ২১২ কোটি টাকা;
➤ কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ও রানওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা
কক্সবাজার বিমানবন্দর-সংক্রান্ত মামলায় আমিনুল হাসিবের নাম আসামি হিসেবে রয়েছে। প্রকাশিত এজাহার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তাঁকে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে আবারও আইনি অবস্থাটি পরিষ্কার করা জরুরি—দুদকের মামলায় আসামি হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগগুলোর বিচার ও তদন্তের ফলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।
কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় তাঁর প্রশাসনিক পদোন্নতি হলে সেই পদোন্নতির সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দুদকের অনাপত্তিপত্রে গায়েব মামলার তথ্য
এখন পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে গুরুতর এবং নথিভিত্তিক প্রশ্নটি এখানেই। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় দুদকের কাছে জানতে চায়—বেবিচকের প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মইদুর রহমান মওদুদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন আছে কি না। দুদক থেকে দেওয়া অনাপত্তিপত্রে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুজনের বিরুদ্ধেই দুদকের মামলা ছিল।
এরপর বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে দুদক নড়েচড়ে বসে।দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খান জানান, আগের অনাপত্তিপত্রটি ভুল ছিল এবং মামলার তথ্য উল্লেখ করে নতুন চিঠি দেওয়া হচ্ছে।
এখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন—একটি চলমান দুদক মামলা কীভাবে দুদকেরই দেওয়া অনাপত্তিপত্রে অনুপস্থিত থাকল? মামলার তথ্য সংশ্লিষ্ট শাখায় ছিল না? তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়নি?নাকি যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ব্যর্থতা ছিল?আর যদি এটি নিছক প্রশাসনিক ভুল হয়, তাহলে সেই ভুলের জন্য দায়ী কে?
ভুল অনাপত্তিপত্রের পরই পদোন্নতি
ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সময়ের মিল।প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেবিচক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, দুদকের ওই অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান।
অর্থাৎ—দুদক থেকে ‘মামলা নেই’ সনদ → পদোন্নতির প্রক্রিয়া → তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীতকরণ।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো পদোন্নতি ফাইল।পদোন্নতির ফাইলে দুদকের অনাপত্তিপত্র কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ কি জানত যে আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা রয়েছে? সংশোধিত অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর পদোন্নতির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
‘ম্যানেজ’ করে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার অভিযোগ
ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করেছে দুদক-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের অভিযোগ। দুদকের একটি সূত্র দাবি করেছে, মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে দুই প্রকৌশলী অনাপত্তিপত্র নিয়েছেন। তবে এটি দুদকের আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত তথ্য নয়; সূত্রের অভিযোগ।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুদকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি এটি শুধু প্রশাসনিক ভুল হয়, দায় এক রকম। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা-তথ্য গোপন করে অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার অভিযোগ।
৫ কোটি বিনিময়ে পদোন্নতি!
আমিনুল হাসিবের সাম্প্রতিক পদোন্নতি ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
৫ শতাংশ কমিশন বানিজ্য!
আরেকটি প্রতিবেদনে আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজের বিনিময়ে প্রায় ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এই অভিযোগও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নথিতে প্রমাণিত নয়।কিন্তু সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার নথি পরীক্ষা করলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
তাঁর দায়িত্বকালে যেসব প্রকল্পে তিনি প্রকল্প পরিচালক বা দায়িত্বশীল প্রকৌশলী ছিলেন, সেগুলোর—প্রাক্কলিত মূল্য → দরপত্র আহ্বান → দরদাতাদের তালিকা → মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত → কার্যাদেশ → কাজের পরিমাণ → অতিরিক্ত কাজ/ভেরিয়েশন → বিল → চূড়ান্ত পরিশোধ
এই পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে একই ঠিকাদার বারবার কাজ পেয়েছে কি না, দরপত্রে প্রতিযোগিতা কতটা ছিল, প্রাক্কলিত মূল্যের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিমূল্যের পার্থক্য কত, কাজের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনায় সম্পদের পাহাড়
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিনুল হাসিবের রাজধানীর উত্তরায় জসীমউদ্দীন এভিনিউতে রয়েছে বিলাসবহুল কোটি টাকা ফ্ল্যাট। এফটি টীমের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমিনুল হাসিবের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা হলেও তিনি খুলনার দৌলতপুরে শ্যালক জাহাঙ্গীরের সাথে মিলে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়।

এই বিষয়ে খোঁজ নিতে সরেজমিনে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র একটি চৌকস টীমের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, খুলনায় তার বিপুল পরিমান অর্থ সম্পদ, প্লট ও বাড়ি রয়েছে। অতি সম্প্রতি জাহাঙ্গীর লাইব্রেরির কর্ণধার জাহাঙ্গীর খুলনা বিভাগীয় প্রকাশনা শিল্পের নেতা নির্বাচিত হওয়ায় বর্তমানে খুলনা বিভাগে প্রকাশনা ব্যবসায়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে এই জাহাঙ্গীর লাইব্রেরী। আর এর নেপথ্যে রয়েছে দুলাভাই প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ।
জাহাঙ্গীর লাইব্রেরির বিপরীতে একটি তিনতলা বাড়ি রয়েছে যার ৫০% এর অংশীদার জাহাঙ্গীর এবং বাকি ৫০% এর অংশীদার আমিনুল হাসিব। এছাড়া খুলনার দৌলতপুরে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের একটি প্লট রয়েছে যার বাজারমূল্য ন্যূনতম ৪ কোটি টাকা। খালিশপুরে প্রচুর জমি প্লট বাড়ি। সেখানে তার একাধিক প্লট ও বাড়ির সন্ধান মিলেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি দৌলতপুরের উপকন্ঠে আরেকটি প্লট রয়েছে যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ কোটি টাকা। উক্ত প্লটটি উত্তরা ব্যাংকের নিকট দায়বদ্ধ। এছাড়াও খালিশপুর রুকাইয়া অয়েল মিলের আশেপাশে আরো একটি প্লট রয়েছে।
দরপত্রে অনিয়ম: নথিই দিতে পারে আসল উত্তর
আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে দরপত্রে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্তু এসব অভিযোগকে সত্য বা মিথ্যা বলার আগে প্রকল্পের মূল নথি দেখা জরুরি।
সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে যে নথিগুলো গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে রয়েছে—প্রাক্কলন, টেন্ডার মূল্যায়ন প্রতিবেদন, বিওক, নোয়া, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, দরপত্রে পরিবর্তনের ক্রম, চলমান বিল, চূড়ান্ত বিল এবং সমাপ্তি সনদ।
এই নথিগুলো পাশাপাশি রাখলে বোঝা যাবে কোথায় প্রকৃত অনিয়ম হয়েছে কি না। এখানেই অনুসন্ধানের একটি বড় সুযোগ রয়েছে। কারণ ব্যক্তিগত অভিযোগের চেয়ে দরপত্রের কাগজই বেশি শক্তিশালী প্রমাণ।
‘বড় প্রকল্পে দায়িত্ব, বারবার অভিযোগ’—প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন
আমিনুল হাসিবকে ঘিরে পুরো ঘটনাপ্রবাহকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়—
২০১৯ — কক্সবাজার প্রকল্পে তদন্ত ও সাময়িক বরখাস্ত↓পরবর্তী সময়ে — পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব↓বিভিন্ন বড় বিমানবন্দর প্রকল্পে দায়িত্ব↓২০২৫ — ৮১২ কোটি টাকার অভিযোগে দুদকের চার মামলা↓২০২৬ — দুদকের অনাপত্তিপত্রে ‘মামলা নেই’ উল্লেখ↓এরপর — তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি↓পরে — দুদকের পক্ষ থেকে আগের অনাপত্তিপত্র ভুল স্বীকার ও সংশোধন
এই ধারাবাহিকতাই এখন সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানের বিষয়।
প্রশ্ন শুধু আমিনুল হাসিবকে নিয়ে নয়
এই ঘটনা কেবল একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয় নয়। এখানে তিনটি প্রতিষ্ঠানগত স্তরের জবাবদিহি সামনে এসেছে। প্রথমত: বেবিচক। একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরোনো বিভাগীয় অভিযোগ ও পরবর্তীতে দুদকের মামলা থাকার পর তাঁর পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই করা হয়েছে? দ্বিতীয়ত: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। পদোন্নতির জন্য দুদকের কাছে তথ্য চাওয়ার পর পাওয়া উত্তর যাচাই করার কোনো স্বাধীন ব্যবস্থা ছিল কি? তৃতীয়ত: দুদক। চলমান মামলার তথ্য কীভাবে ‘মামলা নেই’ সনদে বাদ গেল? এবং এই ভুলের জন্য কার দায় নির্ধারণ করা হয়েছে?
এদিকে, সাম্প্রতিক অনাপত্তিপত্র ও পদোন্নতি নিয়ে আমিনুল হাসিবের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং খুদে বার্তারও জবাব দেননি। অন্যদিকে তাঁর পদোন্নতি নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের বিষয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর পক্ষের অবস্থান হিসেবে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে।
যে নথিগুলো এখনই প্রকাশ্যে আনা উচিত
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য বের করতে বেবিচক, মন্ত্রণালয় ও দুদকের কাছে কয়েকটি নথি চাওয়া প্রয়োজন।১. ২০১৯ সালের মন্ত্রণালয় তদন্ত প্রতিবেদন।২. আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলার নথি।৩. বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আদেশ।৪. সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের আদেশ।৫. ২০২৫ সালের দুদক মামলার এজাহার।৬. কক্সবাজার প্রকল্প-সংক্রান্ত তদন্ত নথি।৭. ২০২৬ সালের পদোন্নতির পূর্ণাঙ্গ ফাইল।৮. মন্ত্রণালয় থেকে দুদকে পাঠানো অনাপত্তিপত্র-সংক্রান্ত চিঠি।৯. দুদকের প্রথম অনাপত্তিপত্র।১০. দুদকের সংশোধিত অনাপত্তিপত্র।১১. পদোন্নতির আইনগত মতামত।১২. তাঁর দায়িত্বকালে সম্পাদিত বড় প্রকল্পগুলোর দরপত্র ও কার্যাদেশ।এই নথিগুলো প্রকাশ্যে এলে ‘অভিযোগ বনাম বাস্তবতা’ অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
শেষ কথা: ‘মামলা নেই’ সনদই এখন সবচেয়ে বড় রহস্য
আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের অভিযোগ সত্যিই প্রমাণিত হয়েছিল কি না, তাঁর বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত ফল কী হয়েছিল, ২০২৫ সালের দুদক মামলার অভিযোগের পরিণতি কী হবে—এসবের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াতেই আসবে।
কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যে নথি ও প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তৈরি করেছে—দুদকের মামলার তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে ‘মামলা নেই’ মর্মে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হলো? আর সেই অনাপত্তিপত্রের পর যদি তিনি পদোন্নতি পেয়ে থাকেন, তাহলে—ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে?
২০১৯ সালে যার বিরুদ্ধে সরকারি তদন্তে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, ২০২৫ সালে যিনি বিমানবন্দর প্রকল্প-সংক্রান্ত দুদকের মামলায় আসামি হন, ২০২৬ সালে তার মামলার তথ্যই দুদকের অনাপত্তিপত্রে অনুপস্থিত থাকে এবং সেই সময়েই যিনি পদোন্নতি পান—এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে নিছক একজন কর্মকর্তার পদোন্নতির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এটি প্রশ্ন তুলছে সরকারি প্রকল্পে জবাবদিহি, বেবিচকের ক্রয়ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের পদায়ন-পদোন্নতির যাচাই এবং দুদকের নিজস্ব তথ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর ওপর। আর তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো কাউকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। জরুরি হলো—নথি খুলে দেখা, টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখা, দরপত্রের প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করা, ২০১৯ সালের তদন্ত থেকে ২০২৬ সালের পদোন্নতি পর্যন্ত পুরো প্রশাসনিক ফাইল পুনঃপর্যালোচনা করা এবং সর্বোপরি—দুদকের মামলার আসামির নামে ‘মামলা নেই’ সনদটি কীভাবে তৈরি হলো, কে তৈরি করল এবং সেই ভুলের সুবিধা কে পেল—তার জবাব প্রকাশ্যে আনা।
কারণ এখানে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে অভিযোগের নয়। প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্রীয় অর্থের পাহারাদার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছে।
Shamiur Rahman
