দ্য ফিন্যান্স টুডের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমিনুল হাসিবের অবৈধ সম্পদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন

বেবিচকের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৩৫ পিএম

দ্য ফিন্যান্স টুডের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিতর্কিত বেবিচক প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে ঢাকা ও খুলনায় নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদের ছড়াছড়ি, খুলনার দৌলতপুরে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকাশনা ব্যবসা, প্লট, উত্তরাতে ফ্ল্যাট ও দেশের বাইরে অর্থপাচারের অভিযোগ-যা পরবর্তী ধারাবাহিক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিভিল এভিয়েশন) সরকারি প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মইদুর রহমান মো. মওদুদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশনার পর নড়েচড়ে বসেছে মন্ত্রণালয়।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর (২০২৬) অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী চার কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি একনেকের সভা শেষে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।

তবে এই বিষয়ে জানতে বেবিচকের সদস্য প্রশাসন এস এম লাবলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটি আলাচনা হচ্ছে। আর যে বিষয়গুলো তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান করবেন তাদের মূল্যায়ন আমাদের নিকট আসলে সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেবো।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) ড. মো. মনজুরুল ইসলামকে প্রধান করে গঠন করা তদন্ত কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির পরিচালক (উপসচিব) মোহাম্মদ সালাহ্ উদ্দিন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) নিশাত জাহান।

এই তদন্ত কমিটি তিন বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যায় সংশোধনের কারণ ও বৃদ্ধি তদন্ত করবেন এবং প্রকল্পের সিসিজিপির ক্রয় প্রক্রিয়ার বিষয়টি ডিপিপি সংশোধন পালনের শর্ত পালন সাপেক্ষ অনুমোদিত হলেও কেন তা দেরি তা অনুসন্ধান করে তাদের মতামত প্রদান করবেন। এছাড়াও প্রকৌশলী হাসিব ও মওদুদ কিভাবে পদোন্নতি পেলেন সেটিও আসবে তদন্তের আওতায়।

আরও পড়ুনঃ দুদকের মামলার আসামি - তবুও পদোন্নতি; নেপথ্যে রহস্যময় দায়মুক্তি!

উল্লেখ্য গত ১৩ আগষ্ট দেশের প্রথমসারির অনুসন্ধানী গনমাধ্যম 'দ্য ফিন্যান্স টুডে' বেবিচক প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবের নানা অনিয়ম দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সাম্প্রতিক অনাপত্তিপত্র ও পদোন্নতি নিয়ে আমিনুল হাসিবের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং খুদে বার্তারও জবাব দেননি। অন্যদিকে তাঁর পদোন্নতি নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের বিষয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর পক্ষের অবস্থান হিসেবে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছিলো।

একনেকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, থার্ড টার্মিনালের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি একনেকে উঠলে সেটি অনুমোদন হয়। একইসঙ্গে তিন বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো ও বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। উক্ত আলোচনায় উঠে আসে প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মওদুদের বিষয়টিও। এ সময় তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনও সদুত্তর না আসায় এক ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরবর্তীতে তিনটি বিমানবন্দর যথাক্রমে যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর উন্নয়ন প্রকল্পে প্রক্রিয়াগত অনিয়মের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দেন। এই তিন বিমানবন্দর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হাসিব।

জানা যায়, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চলতি বছর ১১ মার্চ মামলা বিচারাধীন থাকার পরও অভিযোগ থেকে সিএএবি, সিভিল সার্কেল প্রকল্প নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিবকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। অভিন্ন চিঠিতে দায়মুক্তি দেওয়া হয় ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মইদুর রহমান মো. মওদুদকেও।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বরাবর লেখা দুদক পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই কার্যালয়ের (দুদক) প্রাপ্ত তথ্যমতে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিম্নবর্ণিত মোট দুজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে কোনও মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন নেই। কর্মকর্তারা হলেন— ১. মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), সিভিল সার্কেল প্রকল্প, সিএএবি। ২. মইদুর রহমান মো. মওদুদ, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, সিএএবি।

এর পরপরই আমিনুল হাসিব নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্বাবাধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।’ পরবর্তীতে চিঠিতে ভুল তথ্য থাকার কথা স্বীকার করেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান। পরে একই তারিখ ও স্মারকে প্রতিস্থাপন করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। নতুন চিঠিতেও আগের স্মারক নম্বর ও ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখ রাখা হয়।

প্রতিস্থাপন চিঠিতে বলা হয়েছে, আমিনুল হাসিব দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এর ৮৫ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি করা মামলাটি তদন্তাধীন। মওদুদ একই কার্যালয়ের ৮৪ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ওই মামলাও ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি করা হয়। সেটির তদন্তও চলছে। প্রথম চিঠিতে সই করা পরিচালক মোহাম্মাদ নাজমুল হাসানই প্রতিস্থাপন চিঠিতে সই করেছেন।

জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একাধিক বিমানবন্দর প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুদক ৪টি মামলা করে। দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় আমিনুল ৯ নম্বর আসামী। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ২১২ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় মওদুদ ৯ নম্বর আসামী। দুটি মামলার তদন্তই দুদকের মানিলন্ডারিং শাখায় চলছে।

দুদক থেকে মামলা থাকার চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে বেবিচককে ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বেবিচক। সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বরও মন্ত্রণালয় থেকে গৃহীত ব্যবস্থা দ্রুত অবগত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই চিঠিরও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বেবিচক।

বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরও অজ্ঞাতকারণে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার জালিয়াতি করে পদোন্নতি নেওয়ার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা হলেও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আসলেও উর্ধ্বতনরা এই বিষয়ে নিশ্চুপ থেকেছেন। এমনকি চিঠি যে আসছে সেই বিষয়টিও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের নভেম্বরে কক্সবাজার প্রজেক্টে দুর্নীতির অভিযোগে আমিনুল হাসিবকে বরখাস্ত করে বেবিচক। পরে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও এমপি কর্ণেল (অব.) ফারুক খানের সুপারিশে ২০২১ সালে আবার তিনি চাকুরিতে নিয়মিত হন। এরপর তারই সুপারিশে আমিনুল হাসিবকে ২০২৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বা সুপারেন্টেন্ড হিসেবে চলতি দায়িত্ব প্রদানের সুপারিশ করেন। বেবিচক তাকে চলতি দায়িত্বও প্রদান করে। দীর্ঘ ৪ বছর তিনি চলতি দায়িত্বেই ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই দুদক থেকে ‘মামলা নাই’-মর্মে চিঠি পাওয়ার পরপরই তাকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দুদক থেকে মামলা না থাকা সংক্রান্ত এনওসি ও পদোন্নতি নিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করেছেন তিনি। আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি গত বছরের ২১ থেকে ২৮ ডিসেম্বর তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন। সফরের বিষয়ে তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদেশ সফরের সময় তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে পরে কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দেশে ফেরেন। সেই সময়ে এই বিষয় নিয়ে বেবিচকে তোলপাড় হলেও অজ্ঞাত কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে গঠিত তদন্ত কমিটির বিষয়ে আমিনুল হাসিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি জানিনা।’ আর পদোন্নতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওটা ছিল দুদকের ভুল।’

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত