সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতা ধরতেই সীমাবদ্ধ অভিযান!!!
মাদকের কাছে কি সত্যিই আইন দুর্বল?
প্রয়োজন তিনটি বিষয়ের সমন্বয়—কঠোর আইন, কার্যকর তদন্ত এবং মানবিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। তবেই মাদকবিরোধী অভিযান শুধু গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান নয়, মাদকের বাজার সংকুচিত করার বাস্তব সাফল্যে পরিণত হবে
বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে দীর্ঘদিন ধরে। রাজধানীর অলিগলি থেকে সীমান্তবর্তী এলাকা—রাস্তায়, পার্কে, স্টেশনে কিংবা আবাসিক এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গ্রেপ্তার হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ, হচ্ছে মামলা, জব্দ হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক। কিন্তু এত অভিযান, এত গ্রেপ্তার ও মামলা সত্ত্বেও মাদকের বাজার কেন বন্ধ হচ্ছে না? প্রশ্নটি তাই শুধু আইনের কঠোরতা নিয়ে নয়; বরং আইন প্রয়োগের ধরন, তদন্তের সক্ষমতা, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং বড় কারবারিদের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙার সক্ষমতা নিয়েও।
অভিযোগ রয়েছে, মাদকবিরোধী অভিযানের বড় অংশজুড়ে রয়েছে সেবী ও খুচরা বিক্রেতা। অথচ মাদকের অর্থের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, সীমান্তপথ, গুদাম, অর্থপাচার এবং বড় কারবারিদের সম্পদের দিকে নজর তুলনামূলকভাবে কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সেবীকে গ্রেপ্তার করে একটি মামলা করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু একটি মাদকচক্রের মূল হোতাকে ধরতে হলে তার যোগাযোগ, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের উৎস ও সম্পদের তথ্য বের করতে হয়। এতে সময় ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—মাদকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইন কি দুর্বল, নাকি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে বড় দুর্বলতা?
আইন কিন্তু যথেষ্ট কঠোর
বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এ মাদক অপরাধের জন্য বেশ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। অপরাধের ধরন, মাদকের শ্রেণি ও পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, আইন অনুযায়ী ইয়াবা, হেরোইন বা কোকেন সেবন করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। ৫ গ্রাম পর্যন্ত বহনের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর জেলের বিধান আছে। আর ২৫ গ্রামের বেশি ইয়াবা বা ৫ গ্রামের বেশি হেরোইন পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত যেতে পারে। তবে আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মাদকাসক্ত ব্যক্তি এবং অন্য ধরনের মাদক অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
আইনের ৩৬(৪) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকসেবন ছাড়া অন্য কোনো মাদক অপরাধ প্রমাণিত না হলে আদালত তাকে মাদকাসক্ত বিবেচনা করে চিকিৎসার জন্য মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাতে পারেন। চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানালে তার বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ আইনের দর্শন পুরোপুরি শাস্তিনির্ভর নয়। একজন আসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনার সুযোগ আইনেই রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সুযোগ কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
গ্রেপ্তার বাড়লেও বাজার কমছে কি?
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে মামলা, আসামি এবং উদ্ধার করা মাদকের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য অধিদপ্তর আলাদা বার্ষিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও বিপুলসংখ্যক অভিযান চালিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুধু বিজিবির হিসাবে মাদক ও অন্যান্য চোরাচালানসংক্রান্ত ১৩ হাজারের বেশি মামলা এবং ৯৭৩ জন গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে।
এগুলো দেখায়, আইন প্রয়োগে কার্যক্রমের ঘাটতি নেই। ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কার্যক্রমের ফলাফল ও লক্ষ্য নির্ধারণে। কারণ মাদক একটি সরবরাহব্যবস্থা। একজন সেবীকে গ্রেপ্তার করলে বাজারের একজন ক্রেতা কমে, কিন্তু সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে তার জায়গায় নতুন ক্রেতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সেবী ধরা সহজ কিন্তু নেটওয়ার্ক ধরা কঠিন
মাদকবিরোধী অভিযানের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। একজন সেবীর কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হলে আলামত পাওয়া যায়, গ্রেপ্তার করা যায় এবং মামলা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু একজন বড় কারবারিকে ধরতে হলে অনুসন্ধান করতে হয়—মাদক কোথা থেকে আসছে; সীমান্ত পার হচ্ছে কীভাবে; অর্থায়ন ও পরিবহন কারা করছে; কোথায় মজুত হচ্ছে; মুনাফা কারা নিচ্ছে; কোন ব্যাংকিং চ্যানেলে আর্থিক লেনদেন হচ্ছে ও বিদেশে অর্থপাচার হচ্ছে; কারা সম্পদ কিনছে এবং পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে আর কারা যুক্ত আছে? এই ধরনের তদন্তে সময়, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের দ্রুত ফল দেখানোর চাপ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সহজে শনাক্তযোগ্য ছোট অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, আইন নিজে দুর্বল নয়। দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে তদন্ত, সাক্ষ্য এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে। বড় মামলাগুলোতে প্রভাবশালীদের চাপও কাজ করে।প্রয়োগে ভারসাম্য আনতে হবে। ছোট সেবীর পাশাপাশি কারবারির অর্থের উৎস, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে বড় নেটওয়ার্ক ধরতে হবে।
বড় কারবারি ধরলেও মামলা টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ
মাদক মামলার অন্যতম দুর্বল জায়গা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া। বড় চালানের মামলায় শুধু মাদক উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়। উদ্ধারকৃত আলামত কার কাছ থেকে, কোথা থেকে এবং কীভাবে উদ্ধার হয়েছে—তার ধারাবাহিকতা আদালতে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সাক্ষ্য, ফরেনসিক পরীক্ষা, জব্দ তালিকা, আলামতের সংরক্ষণ ও তদন্তের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি ধাপে দুর্বলতা থাকলে মামলাটি দীর্ঘায়িত হতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত শেষ করতে দীর্ঘ সময়, আদালতে মামলার জট এবং জামিনের আইনি প্রক্রিয়া।
ফলে একটি ছোটখাটো মাদক মামলা যেখানে তুলনামূলকভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির পথে এগোয়, বড় নেটওয়ার্কের মামলা সেখানে বছরের পর বছর চলতে পারে। এখানেই আইনের কঠোরতার সঙ্গে প্রয়োগের বাস্তবতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেবী কি অপরাধী, নাকি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন ব্যক্তি?
মাদকনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এটি। মাদক গ্রহণ নিঃসন্দেহে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহার করে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া ব্যক্তিকে কেবল কারাগারে পাঠালে সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ কারাগার থেকে বেরিয়ে সে যদি আবার একই পরিবেশে ফিরে যায়, কর্মসংস্থান না পায়, পরিবার তাকে গ্রহণ না করে এবং চিকিৎসা বা কাউন্সিলিং না পায়—তাহলে পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকি থেকেই যায়। অর্থাৎ শাস্তি হয়তো অপরাধের প্রতিক্রিয়া সামলায়; কিন্তু আসক্তির কারণ সামলায় না।
চিকিৎসায় অগ্রগতি সত্বেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বড়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। দেশে সরকারি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ব্যবস্থা আগের তুলনায় বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২৪ বেডে উন্নীত করা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতেও বেড বাড়ানো হয়েছে।
২০২৪ সালের তথ্যভিত্তিক একটি বার্ষিক প্রতিবেদনের সারাংশ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে ১২৪টি এবং রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ২৫টি করে বেড রয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত বেসরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রও কার্যক্রম চালাচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি চিকিৎসা অবকাঠামো মাত্র কয়েকটি কেন্দ্র বা ৫০টি বেডে সীমাবদ্ধ—এমন তথ্য এখন আর সঠিক নয়।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় সক্ষমতা নিয়ে। কারণ মাদকাসক্তির বিস্তার, চিকিৎসার চাহিদা এবং দেশের জনসংখ্যার তুলনায় এই সক্ষমতা এখনও পর্যাপ্ত কি না, সেটি আলাদা করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বেসরকারি চিকিৎসা ব্যয়ও বড় বাধা
সরকারি ব্যবস্থার বাইরে অধিকাংশ পরিবারকে বেসরকারি পুনর্বাসনকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে চিকিৎসার ধরন, কেন্দ্রের মান ও অবস্থান অনুযায়ী খরচে বড় পার্থক্য রয়েছে।
নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসার বদলে দ্রুত আইনি সমাধানের পথ বেছে নেয়।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অভিযান চালানো নয়; সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করাও।
পর্তুগালের অভিজ্ঞতা কী বলে?
মাদকনীতিতে পর্তুগাল প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে আসে। দেশটি ২০০০ সালে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সীমিত পরিমাণ মাদক রাখা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক শাস্তির পরিবর্তে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করে; ২০০১ সালে তা কার্যকর হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে মাদক বৈধ করে দেওয়া হয়েছিল। বরং ব্যবহারকারীকে কারাগারের বদলে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তার কাঠামোর আওতায় নেওয়া হয়।
পর্তুগালের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেলেও এটিকে সরলভাবে ‘মাদকমুক্তির সাফল্য’ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। দেশটির নীতিতে সময়ের সঙ্গে নানা পরিবর্তন ও সীমাবদ্ধতাও এসেছে। তাই বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হতে পারে—ব্যবহারকারীকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনা, কিন্তু মাদক উৎপাদন, পাচার ও বাণিজ্যিক সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
থাইল্যান্ডের মডেল থেকেও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে
থাইল্যান্ডও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসা ও কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থায় ৩৩ হাজারের বেশি মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা পেয়েছেন বলে আসিয়ান ড্রাগ মনিটরিং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও কমিউনিটি-ভিত্তিক চিকিৎসা, কাউন্সিলিং এবং পরিবারকে যুক্ত করার ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে। কারণ আসক্তি শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
শুধু সেবী ধরলে বাজারের মূল জায়গায় আঘাত লাগে না
মাদক ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো টাকা।একজন বড় কারবারি বছরে কোটি কোটি টাকার মাদক লেনদেন করলেও তার বিরুদ্ধে শুধু মাদক উদ্ধারের মামলা করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয় না। এজন্য প্রয়োজন অর্থের উৎস শনাক্ত করা → ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান → সন্দেহজনক লেনদেন বিশ্লেষণ → সম্পদের উৎস যাচাই → অবৈধ সম্পদ জব্দ → অর্থপাচারের তদন্ত → সহযোগীদের শনাক্ত করা।
২০১৮ সালের আইনেও সম্পদ বাজেয়াপ্তের ধারণা রয়েছে এবং মাদক অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্পদ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—এই আর্থিক তদন্ত কতটা নিয়মিত ও কার্যকরভাবে করা হচ্ছে?
সাফল্যের মাপকাঠি বদলাতে হবে
মাদকবিরোধী অভিযানকে যদি শুধু ‘কতজন গ্রেপ্তার’ দিয়ে মাপা হয়, তাহলে প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করা সম্ভব নয়। মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্য মাপা যেতে পারে আরও কয়েকটি সূচকে—কতজন বড় কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে; কতটি বড় সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙেছে; কত টাকা ও সম্পদ জব্দ হয়েছে; কতটি সীমান্তপথ বন্ধ করা হয়েছে; কতজন সেবী চিকিৎসা পেয়েছে; চিকিৎসার পর কতজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে; পুনরায় মাদক গ্রহণের হার কত; বড় মামলার কত শতাংশ দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে এবং মাদকের বাজারে দাম ও সহজলভ্যতার কী পরিবর্তন হয়েছে।
এসব সূচক প্রকাশ করা হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপরও জবাবদিহিতা বাড়বে।
তাহলে আইন কি দুর্বল?
আইনকে কাগজে দুর্বল বলা কঠিন। ২০১৮ সালের আইনে মাদক অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি রয়েছে। বড় পরিমাণের নির্দিষ্ট কিছু মাদকের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে। একই সঙ্গে আসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসায় পাঠানোর আইনি সুযোগও রয়েছে।
তবে সমস্যা অন্য কয়েকটি স্তরে হচ্ছে। তা হলো তদন্তের সক্ষমতা, বড় নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ, আর্থিক তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, চিকিৎসা সুবিধার প্রাপ্যতা এবং পুনর্বাসনের ঘাটতি।
ফলে কঠোর আইন থাকলেও যদি তার প্রয়োগের বড় অংশ গিয়ে পড়ে ছোট সেবী বা খুচরা বিক্রেতার ওপর, তাহলে মাদকের মূল বাজারে কাঙ্ক্ষিত আঘাত নাও আসতে পারে।
করণীয়
১. সেবী ও কারবারিকে আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমবার বা শুধু সেবনের ঘটনায় আটক ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ আরও কার্যকর করতে হবে।
২. বড় কারবারির অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে আঘাত করতে হবে। শুধু মাদক উদ্ধার নয়—ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, অর্থপাচার ও ব্যবসায়িক লেনদেন তদন্ত করতে হবে।
৩. ‘কন্ট্রোল ডেলিভারি’ ও গোয়েন্দা তদন্ত বাড়াতে হবে। দেশের বিদ্যমান আইনেই এমন বিশেষ তদন্ত কৌশলের ধারণা রয়েছে, যার মাধ্যমে মাদকের উৎস থেকে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা সম্ভব।
৪. সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র আরও বাড়াতে হবে
বর্তমান সরকারি সক্ষমতার পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সুবিধা তৈরি করা প্রয়োজন।
৫. চিকিৎসার পর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে
চিকিৎসা শেষ করেই একজন আসক্তকে পুরোনো সামাজিক পরিবেশে ছেড়ে দিলে পুনরায় আসক্তির ঝুঁকি থাকে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন জরুরি।
৬. মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে
বিশেষ করে বড় মাদক নেটওয়ার্কের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে আইনের ভয় কমে যায়।
৭. মাসিক স্বচ্ছ পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে হবে
কতজন সেবী, কতজন খুচরা বিক্রেতা, কতজন বড় কারবারি, কতটি নেটওয়ার্ক, কত সম্পদ এবং কতজন চিকিৎসা পেয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।
মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি একইসঙ্গে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবার, অপরাধ ও সীমান্ত নিরাপত্তার সমস্যা। একজন সেবীকে গ্রেপ্তার করে হয়তো একটি মামলা বাড়ানো যায়। কিন্তু একটি মাদক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হলে তার সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সম্পদের ওপর আঘাত করতে হবে।
একইসঙ্গে আসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি অংশই মোকাবিলা করা হবে। তাকে চিকিৎসা, কাউন্সিলিং, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে। কারণ মাদক একটি বাজার। চাহিদা থাকলে সরবরাহের পথ ঠিকই খুঁজে নেবে নেপথ্যের কুশীলবরা।
তাই প্রশ্নটি আসলে ‘আইন কতটা কঠোর’—এখানে থেমে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আইন কাদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
যদি অভিযানের বড় সাফল্য হয় শুধু সেবী ও খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা বাড়ানো, কিন্তু মাদকের অর্থের উৎস ও বড় সরবরাহ নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে, তাহলে গ্রেপ্তার বাড়লেও মাদকের বাজার বন্ধ হবে না। প্রয়োজন তিনটি বিষয়ের সমন্বয়—কঠোর আইন, কার্যকর তদন্ত এবং মানবিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। তবেই মাদকবিরোধী অভিযান শুধু গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান নয়, মাদকের বাজার সংকুচিত করার বাস্তব সাফল্যে পরিণত হবে।
Shamiur Rahman
