জাল ও অসত্য নথিপত্র ব্যবহারের অভিযোগ

চবি'র ৭৫ কোটি টাকার কাজে ভয়ংকর জালিয়াতি

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬ ০১:১১ পিএম

অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে জি কে শামীমের বিচার শুরু, দরপত্রে অভিজ্ঞতা-টার্নওভার ‘জাল’ দেখানোর অভিযোগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৭৫ কোটি টাকার নির্মাণকাজ পেতে জাল ও অসত্য নথিপত্র ব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্তাধীন থাকা এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হলো।

রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মো. মিজানুর রহমানের আদালত জি কে শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. রেজাউল করিম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালতে অভিযোগ গঠনের সময় জি কে শামীম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বিচার প্রার্থনা করেন। তিনি বর্তমানে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।

যে কাজ ঘিরে এত অভিযোগ

মামলার নথি ও দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ একাডেমিক ভবন—দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণকাজের জন্য ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়।

দরপত্রে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড লিড ফার্ম এবং দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড পার্টনার ইনচার্জ হিসেবে যৌথভাবে অংশ নেয়।

দরপত্র মূল্যায়নের পর যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানটিকে ৭৫ কোটি ১ লাখ ২৯৫ টাকা মূল্যের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যসম্পাদন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৭০০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।

যোগ্যতা না থাকলেও ‘অভিজ্ঞতা’ দেখানোর অভিযোগ

দুদকের তদন্তে সবচেয়ে গুরুতর যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো—দরপত্রের শর্ত পূরণের মতো নিজস্ব যোগ্যতা না থাকলেও জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান আগের একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস জি কে বিল্ডার্স’-এর অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতা নতুন কোম্পানির নামে দেখিয়েছে বলে অভিযোগ।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারকে—অন্তত ১০ বছরের সাধারণ নির্মাণকাজের অভিজ্ঞতা; গত পাঁচ বছরের মধ্যে নির্ধারিত মূল্যের অন্তত একটি বহুতল ভবন নির্মাণকাজ সন্তোষজনকভাবে শেষ করার অভিজ্ঞতা; পাঁচ বছরের গড়ে নির্ধারিত পরিমাণ টার্নওভার; নির্দিষ্ট পরিমাণ লিকুইড অ্যাসেট থাকার যোগ্যতা অর্জন করতে হতো।

দুদকের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি নিজ যোগ্যতায় এসব শর্ত পূরণ না করলেও আগের প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও টার্নওভার নতুন প্রতিষ্ঠানের নামে দেখিয়ে দরপত্রে অংশ নেয়। 

নতুন কোম্পানি, পুরোনো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা

তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। দুদকের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে নিবন্ধিত হয়। অর্থাৎ দরপত্র আহ্বানের পরপরই নতুন কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয়।

অন্যদিকে, জি কে বিল্ডার্স ছিল আগে থেকেই পরিচালিত একটি একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। দুদকের তদন্তে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—নতুন কোম্পানির নিজস্ব যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আগের প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা দরপত্রে ব্যবহার করা হলো।

তদন্ত সংস্থার অভিযোগ, এভাবে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আইনগত অবস্থান ও যোগ্যতা গোপন করে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়েছে।

কোম্পানির নাম ও শেয়ার নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ

দুদকের মামলায় শুধু অভিজ্ঞতা বা টার্নওভার নয়, কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত নথিতেও জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, কোম্পানির প্রকৃত নিবন্ধিত নামের সঙ্গে একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করে নিবন্ধন দেখানো এবং নিবন্ধিত শেয়ারের চেয়ে বেশি শেয়ার দেখিয়ে দরপত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দুদক সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) পাঠায়। সেখান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নথিতে অসঙ্গতি ও জালিয়াতির বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে।

মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়

এই দরপত্রকে ঘিরে তখন থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৬ সালে দরপত্রে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দরপত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

তবে এসব ঘটনার সঙ্গে জি কে শামীমের সরাসরি সম্পৃক্ততা বা অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো আদালতের রায় নেই। তাই এসব বিষয়কে ওই সময়ের অভিযোগ ও প্রেক্ষাপট হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

কাজ শেষ করার সময় নিয়েও প্রশ্ন

নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়েও অতীতে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি এবং তখন কাজের অগ্রগতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে পরবর্তী সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

২০২০ সালের মামলার সময় আরেক প্রতিবেদনে নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে এগুলো পুরোনো সময়ের তথ্য। বর্তমানে ভবনটির কাজের সর্বশেষ অগ্রগতি বা প্রকল্পটির চূড়ান্ত ব্যয় কত হয়েছে—এই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এই বিষয়ে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই প্রয়োজন।

দুই আসামি থেকে এখন এক

এই মামলায় শুরুতে জি কে শামীমের সঙ্গে দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করিম চৌধুরীকেও আসামি করা হয়েছিল।

২০২০ সালের ২২ নভেম্বর দুদক মামলাটি দায়ের করে। পরে তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৭ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্তে ফজলুল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে জালিয়াতির প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়। ফলে মামলায় এখন একমাত্র আসামি জি কে শামীম।

চার বছর পর মামলা, পাঁচ বছর পর অভিযোগপত্র

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০১৬ সালে। অভিযোগের ভিত্তিতে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২০ সালের নভেম্বরে দুদক মামলা করে।

এরপর তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৭ মে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে, ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটি বিচারপর্বে প্রবেশ করলো।অর্থাৎ দরপত্র আহ্বানের প্রায় ১০ বছর পর মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো।

দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ

দুদকের অভিযোগপত্রে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ধারার মধ্যে প্রতারণা, মূল্যবান নিরাপত্তা বা গুরুত্বপূর্ণ নথি জাল করা, জাল নথিকে আসল হিসেবে ব্যবহার এবং অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মতো অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে অভিযোগ গঠন মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে আলোচনায় শামীম

জি কে শামীম ২০১৯ সালের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতনে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে র‍্যাব বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, এফডিআর, অস্ত্র ও মদ উদ্ধার করার কথা জানায়।

পরে তাঁকে ও তাঁর সাত দেহরক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং এর মধ্যে দুটি মামলায় তাঁর সাজা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নজর সাক্ষ্য-প্রমাণে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ কোটি টাকার নির্মাণকাজ কীভাবে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেল, দরপত্রের যোগ্যতা যাচাইয়ে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল এবং জাল নথি ব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আদালতের সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে আসার অপেক্ষায়।

আগামী ২০ সেপ্টেম্বর বাদী ও মামলার প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতের নথিতে আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জি কে শামীম তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত জাল নথি ও প্রতারণার অভিযোগ প্রসঙ্গে আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত