নেপথ্যে ২৫ কোটির চুক্তিতে নিয়োগ-বদলি বানিজ্যের আলামত গায়েব

যুব উন্নয়নে ২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইল ‘নিখোঁজ’

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৪ এএম

সাবেক উপদেষ্টাসহ চার কর্মকর্তার নথি তলব করেছে দুদক | নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ

ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকার প্রকল্প ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইল খুঁজে না পাওয়া, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগের পাশাপাশি তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি সরিয়ে ফেলারও অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমসহ চার কর্মকর্তার নথিপত্র তলব করেছে দুদক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত নথিও চাওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো দুদকের চিঠি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। চাহিদাকৃত নথিপত্র আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

চার কর্মকর্তার নথি তলব

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের সই করা চিঠিতে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি-সংক্রান্ত তদন্তের নথি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূলে বদলির বিষয়ে সত্যায়িত ছায়ালিপিও চেয়েছে দুদক।

এছাড়া সারাদেশের ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া, তা বাতিল এবং নতুন পদে পদায়নসংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে। ঢাকা, বগুড়া, বরিশাল, পাবনা, ধামরাই, নরসিংদী ও ময়মনসিংহে কর্মরত কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথিও চাওয়া হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় থাকা চার কর্মকর্তা হলেন—সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগ অনুসন্ধানে উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি দল কাজ করছে।

২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইল কোথায়?

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হয়। প্রকল্পটির আর্থিক পরিমাণ ছিল ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকা।

প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগে ২০২৩ সালে ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা করা হয়। মামলায় ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক (ডিডি) ফারজানা পারভিন, শেরপুরের ডিডি নুরুজ্জামান চৌধুরীসহ সাত কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। মামলার নম্বর ০১/২০২৩।

মামলাটি তদন্তের জন্য দুদক ময়মনসিংহ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের অবসান হয়নি।

মামলার বাদী মো. খায়রুল আলম রফিকের দাবি, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফাইল এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তবে ফাইল গায়েব, নথিপত্র সরিয়ে ফেলা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুদকের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা হয়নি।

নথি সরিয়ে ফেলার অভিযোগ

এদিকে তদন্ত ও নথিপত্রকে কেন্দ্র করে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তদন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে ফেলার পেছনে প্রভাবশালী একটি মহল সক্রিয় ছিল।

একটি সূত্রের দাবি, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রভাব ও নির্দেশনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় কাজ করেছে।

অভিযোগে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, ময়মনসিংহের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিন, নুরুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সরিয়ে ফেলা বা গায়েব করার জন্য সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গে ২৫ কোটি টাকার একটি চুক্তি হয়েছিল। একটি গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে এমন দাবি করা হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের নথি বা স্বাধীন প্রমাণের তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

নিয়োগ-পদোন্নতিতে কোটি টাকার অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় থাকা অভিযোগে শুধু প্রকল্পের নথি নয়, কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিকে ঘিরেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে ৭৬ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

এছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার কথা বলে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা দুদকের তদন্তেই নির্ধারিত হবে।

অভিযোগ অস্বীকার আসিফ মাহমুদের

অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদায়ন কিংবা পদোন্নতিতে মন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না; সচিবের মাধ্যমেই এসব প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

তিনি আরও বলেন, পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মেধাতালিকা প্রস্তুতের দায়িত্ব সচিবের। এ ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

বাস্তবতা উদ্ঘাটনের স্বার্থে যেকোনো তথ্য-উপাত্ত বা নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানান।

দুদকের অনুসন্ধানে শ্যেন দৃষ্টি

২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথি কোথায়, সেগুলো কীভাবে নিখোঁজ হলো, নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলিতে সত্যিই কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন দুদকের অনুসন্ধানে খুঁজে বের করার অপেক্ষা।

বিশেষ করে চার কর্মকর্তার নথি তলব এবং বিপুলসংখ্যক প্রশাসনিক ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র চাওয়ার ঘটনায় অনুসন্ধানটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

তদন্তে চাওয়া নথিপত্র পর্যালোচনার পর অভিযোগগুলোর সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন, কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না এবং ২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলোর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কী তথ্য বেরিয়ে আসে—এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত