দুদকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
কিছুতেই থামছে না সাব রেজিস্ট্রার এস এম আবু মুসার ঘুষ বানিজ্য
একাধিক ভবন-ফ্ল্যাট, জমি, গরুর খামার, স্বর্ণালংকার ও এফডিআরের তথ্য দুদককে খতিয়ে দেখার দাবি
সাব-রেজিস্ট্রারদের দুর্নীতি ও অনিয়ম বাংলাদেশের ভূমি সেবা খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যা বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কার সত্ত্বেও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সহ বিভিন্ন সংস্থার একাধিক জরিপে এই খাতটিকে দেশের অন্যতম সর্বাধিক দুর্নীতিপ্রবণ সেবা খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজধানীর বাড্ডা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ব্যাপক অনিয়ম, কর ফাঁকি এবং অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রমাণ পেয়েছে।
শুধু ঢাকাই নয়, দেশের অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিস দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনও কাজই হয় না। জমির নিবন্ধন, নামজারি, জাল দলিলে জমি দখলসহ নানা ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। জমির দলিল আটকে রেখে ভুক্তভোগীদের চাপের মুখে ঘুষ দাবি সাব-রেজিস্ট্রার, উম্মেদার, পিওন ও নকলনবিশদের নিয়মিত আচরণে পরিণত হয়েছে। ঘুষ আদায়ের কৌশল হিসেবে সাব-রেজিস্ট্রারের রুটিনমাফিক কাজ নকলনবিশ, উম্মেদার ও পিওন দিয়েও করানো হচ্ছে। এই সুযোগে নকলনবিশ, উম্মেদার ও পিওন কোটি কোটি টাকার মলিক হচ্ছেন।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য গণশুনানির আয়োজন করেছে। শুনানিও চলছে। এতে ভুক্তভোগীরা তুলে ধরেছেন তাদের নানা সমস্যার কথা। বলেছেন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র। তারা বলেন, ‘আমরা আমজনতা। আমরা কোনো কাজের জন্য ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে হয়রানির শিকার হই। মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া কাজ হবে না বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন। আমরা তাদের কাছে জিম্মি।’ ভুক্তভোগী জনগণের দাবি, নামজারি, খারিজ, জমির শ্রেণী পরিবর্তনসহ নানা কাজে জনগণের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে দুর্নীতি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন ভূমি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারসহ কর্মচারীরা।
বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন ম্যানুয়াল-২০১৪ মানছেন না সাব-রেজিস্ট্রাররাও। তারা নিবন্ধন ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিজেদের কাজ নকলনবিশ, উম্মেদার ও পিওনদের দিয়ে করাচ্ছেন। দলিল চেক করার কাজ সাব-রেজিস্ট্রারদের করার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না তারা। দ্য ফিন্যান্স টুডের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে ও সরেজমিন এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম নিয়ে সিরিজ প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে আবু মূসার আমলনামা শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ১ম পর্ব প্রকাশ করা হলো।
সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় আলোচিত ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার নবীনগরের সাব রেজিস্ট্রার এসএম আবু মুসার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন বা অসত্যভাবে প্রদর্শন এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধান ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এসএম আবু মুসা ও তাঁর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, ভবন, গবাদিপশুর খামার, স্বর্ণালংকার, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এসব সম্পদের অর্জনমূল্য, সময়কাল ও অর্থের উৎস তাঁর ঘোষিত আয় ও বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে সম্পদের প্রকৃত চিত্র বের করতে তাঁর আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, আর্থিক বিনিয়োগ, জমির দলিল, নামজারি, খাজনা এবং ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নারায়ণপুরে একাধিক ভবনের অভিযোগ
অভিযোগপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবু মূসার পৈত্রিক বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ১৯১ নম্বর নারায়ণপুর মৌজায় থাকা ভবনগুলো। এতে দাবি করা হয়েছে, ওই এলাকায় এসএম আবু মুসার সম্পৃক্ততায় সদ্য নির্মিত একটি সাততলা ভবন রয়েছে। ভবনটি সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের বাড়িসংলগ্ন এলাকায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে একটি সাততলা ও একটি চারতলা ভবন থাকার তথ্যও অভিযোগে দেওয়া হয়েছে।
এসব ভবনের জমির মালিকানা, নির্মাণ ব্যয়, নির্মাণের সময়কাল এবং অর্থের উৎস কী—তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী। একই সঙ্গে আয়কর নথিতে ভবন ও সংশ্লিষ্ট জমির তথ্য যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।
ঢাকায় ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে ঢাকার তেজগাঁও/ওয়েস্ট তেজকুনিপাড়া এলাকার ইম্পেরিয়াল আমেনা, ১৯৪/এ ঠিকানায় বি-৪ নম্বর একটি ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্ল্যাটটির মালিকানা বা আর্থিক সম্পৃক্ততা এসএম আবু মুসার সঙ্গে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, ফ্ল্যাটটির মালিকানা অথবা এর অর্থায়নের সঙ্গে এসএম আবু মুসার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ কারণে ফ্ল্যাটটির দলিল, ক্রয়মূল্য, প্রকৃত বাজারমূল্য এবং অর্থ পরিশোধের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
২০ গরুর খামার, পাঁচ বিঘা জমি
অভিযোগ অনুযায়ী, এসএম আবু মুসার বাড়িতে গবাদিপশুর একটি খামার রয়েছে। সেখানে প্রায় ২০টি অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। খামারে একজন কর্মচারী কাজ করেন এবং তাঁর মাসিক বেতন প্রায় ২০ হাজার টাকা বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া পাটিকাবাড়ি মৌজায় প্রায় পাঁচ বিঘা জমি থাকার অভিযোগ রয়েছে। জমির মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
নিজ বাড়িতে তিনতলা ভবনের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে এসএম আবু মুসার নিজ বাড়িতে একটি বিলাসবহুল তিনতলা ভবন থাকার কথাও বলা হয়েছে। ভবনটির নির্মাণ ব্যয়, জমির মালিকানা, নির্মাণকাল এবং অর্থের উৎস তাঁর আয়কর নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।
মহিলা মাদ্রাসায় অর্থায়নের অভিযোগ
আবু মূসার গ্রামের বাড়িসংলগ্ন এলাকায় একটি মহিলা মাদ্রাসা রয়েছে এবং সেটি তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয়—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মাদ্রাসাটির জমির মালিকানা, ভবন নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয় এবং অর্থের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন। ব্যক্তিগত আয় থেকে এসব ব্যয় বহন করা হয়ে থাকলে তা ঘোষিত আয় ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
পাংশায় কয়েক কোটি টাকার জমি কেনার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, পাংশা কলেজ মোড়, নিমতলা ও মৈশালা এলাকায় এসএম আবু মুসা কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন।
এসব জমির দলিল, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য, নামজারি, খাজনা এবং জমি কেনার অর্থের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
স্বর্ণালংকারের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসএম আবু মুসার আয়কর নথিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণালংকার প্রদর্শন করা হয়েছে। এসব স্বর্ণালংকার কখন, কীভাবে এবং কোন অর্থে কেনা হয়েছে এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে এফডিআর-সঞ্চয়পত্র
এসএম আবু মুসার স্ত্রী ও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগকারী এসব আর্থিক সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস, জমার সময়কাল এবং এসব অর্থের সঙ্গে এসএম আবু মুসার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
যেসব নথি যাচাইয়ের দাবি
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে এসএম আবু মুসার গত কয়েক বছরের আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য বিনিয়োগের তথ্য পরীক্ষা করার অনুরোধ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নারায়ণপুর মৌজার জমির রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর মালিকানা ও নির্মাণ ব্যয়ের তথ্য, ঢাকার ফ্ল্যাটের দলিল, পাটিকাবাড়ি মৌজার জমির নথি এবং পাংশার বিভিন্ন এলাকায় কেনা জমির দলিল ও অর্থের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া প্রয়োজনে ব্যাংক, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস, সিটি করপোরেশন/পৌরসভা ও আয়কর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহের অনুরোধ করা হয়েছে।
অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
অভিযোগকারী দুদকের কাছে এসএম আবু মুসার জ্ঞাত ও বৈধ আয়ের সঙ্গে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের আবেদন জানিয়েছেন।
তদন্তে যদি অবৈধ সম্পদ অর্জন, জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ, সম্পদের তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মামলা, সম্পদ জব্দ বা ক্রোকসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে অভিযোগে উত্থাপিত এসব তথ্যের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তকারী সংস্থা কর্তৃক চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে দুদকের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের পরই অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
Shamiur Rahman
