তিন যুগের বেশি একই জেলায় চাকরি, অবৈধ সম্পদ ও অনিয়মের নানা অভিযোগ

দুদকের তদন্তে বেগমগঞ্জের বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিন

শেহাব উদ্দিন আহমেদ টিপু প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৪ পিএম

গত ৮ আগস্ট বেগমগঞ্জ উপজেলার বেতুয়া বাজার এলাকার গোপালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম পিজন স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ নোয়াখালী দুদক কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা বন কর্মকর্তা এ এস এম সামছুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, দায়িত্বে অনিয়ম, সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ঘটনায় ব্যবস্থা না নেওয়া এবং উৎকোচ গ্রহণসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দুদক।

গত ৮ আগস্ট বেগমগঞ্জ উপজেলার বেতুয়া বাজার এলাকার গোপালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম পিজন স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ নোয়াখালী দুদক কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগে সামছুদ্দিনের দীর্ঘদিনের চাকরিজীবন, সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকালে কথিত অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগকারী দাবি করেছেন, সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ২০১৯ সালেও তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অনিয়মের অভিযোগে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এসব প্রতিবেদনের পর তৎকালীন নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ বন অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

তিন যুগের বেশি নোয়াখালীতে

অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামছুদ্দিন ১৯৯০ সাল থেকে নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় বন বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কখনো সোনাইমুড়ী, কখনো সেনবাগ, আবার কখনো বেগমগঞ্জ—এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে একই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন তিনি।

বর্তমানে তিনি বেগমগঞ্জ উপজেলা বন কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন। পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে সেনবাগ উপজেলা বন কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করছেন।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার দীর্ঘ সময় একই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত থাকার সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিগত আপত্তি ছিল কি না।

নোয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্লা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “বেগমগঞ্জ বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিন দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় এ জেলায় চাকরি করছেন। এটা সত্য। তবে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

বেতনের সঙ্গে সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

লিখিত অভিযোগে সামছুদ্দিনের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পদের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, একজন উপজেলা বন কর্মকর্তার মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৭ হাজার টাকার মধ্যে। এই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকার অভিযোগ তুলে সামছুদ্দিনের নিজ এলাকা কালিকাপুরে জমি কেনা ও ভবন নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, কালিকাপুর এলাকায় সামছুদ্দিন প্রায় ২২ শতাংশ জমি কিনেছেন। এছাড়া বগাদিয়া-কালিকাপুর বাজারসংলগ্ন সড়কের পাশে আরও প্রায় ৩০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, জমিতে যাওয়ার রাস্তা তৈরী করার জন্য সরকারি খাল দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। কালিকাপুরের পৈতৃক জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে দ্বিতল ভবন।

এছাড়া মাইজদী শহরের দীঘিরপাড় আবাসিক এলাকায় ‘আপন নিবাস’ নামে একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে সামছুদ্দিন বসবাস করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্ল্যাটটির আশপাশে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট কেনার অভিযোগও রয়েছে। তবে ওই জমিতে শ্বশুরের নামে ব্যানার ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।

এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য আছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ঘটনায় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ

সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ঘটনায় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসে সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ছনগাঁও এলাকায় সামাজিক বনায়নের প্রায় ২০টি গাছ কেটে ফেলা হয়। স্থানীয় সামাজিক বনায়ন কমিটির সভাপতি আবুল কাশেম বিষয়টি বনপ্রহরীদের জানান।

বন বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বিষয়টি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা এ এস এম সামছুদ্দিন আহমেদের নজরে আসে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, পরে অর্থের বিনিময়ে ঘটনাটি মীমাংসা করা হয়। তবে এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বনপ্রহরী লিপনের ভাষ্যমতে, গাছ কাটার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। সেখানে বেশ কয়েকটি গাছ কাটার আলামত পাওয়া যায়। পরদিন সামছুদ্দিন তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে যান এবং মামলা করার কথা বলেন। পরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি আর এগোয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

সেনবাগেও একই ধরনের অভিযোগ

২০২৩ সালের আগস্টে সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের হিজলী গ্রামের সামাজিক বনায়নের প্রায় ৫০টি গাছ কাটার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়েছে, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন ভূঁইয়ার নির্দেশে ইউপি সদস্য পলাশ এসব গাছ কাটেন।

খবর পেয়ে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কিন্তু গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা বা অন্য কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে গাছগুলো অভিযুক্তদের জিম্মায় দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, নিয়মবহির্ভূতভাবে সামাজিক বনায়নের গাছ বিক্রির অর্থ আত্মসাৎ এবং মামলা করার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব  বিস্তারের অভিযোগ

নোয়াখালী বন বিভাগের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সামছুদ্দিন নিজেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ওই কর্মচারীর দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন নোয়াখালী বন বিভাগে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পর সামছুদ্দিন রাজনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তন করেছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করে আগের মতোই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এবার দুদকের নজরে

অভিযোগকারী মমিনুল ইসলাম পিজনের দাবি, সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালে দুদকে অভিযোগ দাখিলের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বন বিভাগের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

তার প্রশ্ন, এত অভিযোগের পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা একই জেলায় তিন যুগের বেশি সময় চাকরি করতে পারলেন এবং তার সম্পদের উৎস কেন আগে খতিয়ে দেখা হয়নি।

নোয়াখালী দুদকের উপপরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, “বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগে অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগ অস্বীকার

তবে সামছুদ্দিন আহমেদ তার বিরুদ্ধে আíনা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেননি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কোনো অনিয়ম করেননি বলে দাবি করেন।

এদিকে দুদক অভিযোগটি তদন্তের কথা জানিয়েছে। ফলে সামছুদ্দিনের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত উৎস, সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ঘটনায় তার ভূমিকা এবং দীর্ঘদিন একই জেলায় চাকরির পেছনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।

তদন্তের ফলাফলের ওপরই এখন নির্ভর করছে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও পরবর্তী প্রশাসনিক কিংবা আইনগত ব্যবস্থা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত