মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা ⊕ লোকসানি প্রতিষ্ঠানে আছে কি মধু?

বদলির দুই মাস পরও ওয়াসায় যোগ দেননি বিজেএমসির পরিচালক এরশাদ হোসেন খান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০২:২৩ পিএম

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এরশাদ হোসেন খানকে বিজেএমসির পরিচালক পদ থেকে বদলি করে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে প্রেষণে নিয়োগ দেয়। একই সঙ্গে তাঁর চাকরি স্থানীয় সরকার বিভাগে ন্যস্ত করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বদলির প্রজ্ঞাপন জারির দুই মাস পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি ঢাকা ওয়াসায় যোগ দেননি বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) বিপনন শাখার পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এরশাদ হোসেন খান। বরং তিনি এখনও আগের কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারি বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গত ১১ জুন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এরশাদ হোসেন খানকে বিজেএমসির পরিচালক পদ থেকে বদলি করে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে প্রেষণে নিয়োগ দেয়। একই সঙ্গে তাঁর চাকরি স্থানীয় সরকার বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। এর আগে, ২০২৫ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) বিপনন শাখার পরিচালক পদে যোগ দিয়েছিলেন এরশাদ হোসেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের উপসচিব নূর-এ-আলম স্বাক্ষরিত উক্ত প্রজ্ঞাপনের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ১৭ জুনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় ওই দিন অপরাহ্ণে তাঁকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বা ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার প্রায় দুই মাস পরও এরশাদ হোসেন খান বিজেএমসির পরিচালক পদে বহাল থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এই অবস্থায় সরকারি প্রজ্ঞাপনে দেওয়া বদলির আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত সময়ের পরও তিনি কীভাবে পূর্বের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই বিষয়ে কথা বলতে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) সদ্য বদলিকৃত পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এরশাদ হোসেন খানের মুঠোফোনে কল দেয়া হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কথা উল্লেখ করে এই বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সর্বশেষ এই প্রতিবেদন লেখার সময়েও এরশান হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, এরশাদ হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী এবং বিপনন শাখার উপ-ব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি এই প্রতিবেদককে বিজেএমসির পরিচালক এরশাদ হোসেনের সাথেই কথা বলার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: আকনুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকেও পাওয়া যায়নি।

এরশাদ হোসেন খানের বদলির আদেশ ঘিরে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এমন রহস্যজনক ভূমিকায় সন্দেহ দানা বাধলে তৎপর হয় দেশের আলোচিত অনুসন্ধানী গনমাধ্যম 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'। পর্দার অন্তরালের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে মাঠে নামে এফটি টীম।

পরবর্তীতে, একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিজেএমসির অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং প্রভাব খাটিয়ে কথিত কমিশন বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিপনন শাখার পরিচালক এরশাদ হোসেনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিজেএমসির পরিচালক (পরিকল্পনা) মাসুম পাটোয়ারী, পরিচালক (বিপণন) এরশাদ হোসেন খান, উপব্যবস্থাপক (বিপণন) ও পিএস টু পরিচালক (বিপণন) জয়নাল আবেদীন এবং অফিস সহায়ক মনির হোসেন ইজারা প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সূত্রমতে, ইজারা-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথিত কমিশন নিয়ে কিছুদিন আগে একটি আলোচনা হয়ে । অফিস সহায়ক মনির হোসেন ও উপব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীনের মাধ্যমে কমিশন-সংক্রান্ত যোগাযোগ করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বিজেএমসির দুটি প্রতিষ্ঠান আরএফএলের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব ইজারায় প্রতিষ্ঠান বাছাই, দরপত্র মূল্যায়ন, অনুমোদন এবং ইজারা মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এসব বৈঠকের মাধ্যমে বিজেএমসির মূল্যবান প্রতিষ্ঠান ইজারা দেওয়ার প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

তথ্য বলছে, এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসির নথিপত্র পর্যালোচনা করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

এদিকে, ইজারা বরাদ্দে অনিয়ম, কমিশন বানিজ্যের পাশাপাশি ষড়যন্ত্রমূলক গোপন বৈঠকের ন্যায় আপত্তিকর ইস্যুতে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় বিজেএমসির পরিচালক (বিপণন) এরশাদ হোসেন খানের বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে বিজেএমসিতে। অনেকেই একে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবেও মনে করছেন। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

এই অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—১৭ জুনের পর তাঁর দায়িত্ব পালনের অনুমোদন কে দিয়েছে এবং ঢাকা ওয়াসায় তাঁর যোগদান বিলম্বিত হওয়ার কারণ কী?জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন?

যদি তাকে বহাল রাখার বিষয়ে কোনো পরবর্তী আদেশ, স্থগিতাদেশ বা প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, সেটি প্রকাশ করা হয়েছে কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আর এমন কোনো বৈধ আদেশ না থাকলে তিনি কোন প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে বিজিএমসিতে দায়িত্ব পালন করছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
 
অন্যদিকে, বিজেএমসির সাম্প্রতিক ও চলমান ইজারা কার্যক্রম নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে? উন্মুক্ত দরপত্রে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল? ইজারা মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নির্ধারিত মূল্য বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না? ইজারা মূল্যায়ন ও চূড়ান্ত অনুমোদন কমিটিতে কারা ছিলেন? ইজারা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা কমিশন আদান-প্রদান হয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে বিজিএমসির ইজারা-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বদলির প্রজ্ঞাপনের পরও এরশাদ হোসেন খানের বিজেএমসিতে দায়িত্ব পালন এবং একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান ইজারা দেওয়ার তৎপরতার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করা দরকার।
 
বিশেষ করে পরিচালক (পরিকল্পনা) মাসুম পাটোয়ারী, পরিচালক (বিপণন) এরশাদ হোসেন খান, উপব্যবস্থাপক (বিপণন) ও পিএস-টু জয়নাল আবেদীন এবং অফিস সহায়ক মনির হোসেনের ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
 
এজন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১১ জুন ২০২৬-এর বদলি প্রজ্ঞাপন, বিজেএমসির ইজারা-সংক্রান্ত নথি, মূল দরপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চুক্তিপত্র, অনুমোদনের ধাপ, সংশ্লিষ্ট বৈঠকের নথি এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
 
রাষ্ট্রীয় সম্পদ ইজারার ক্ষেত্রে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি উঠেছে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত