৩১ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি ⊕ গ্যাস লাইটারকে দেখানো হয় ‘স্টিল চেইন’

চট্টগ্রামের সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা ও সিঅ্যান্ডএফ মালিকের কারাদণ্ড

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬ ০১:৪০ পিএম

বুধবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মো. মিজানুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হুমায়ুন কবিরকে সর্বোচ্চ তিন বছর এবং মির্জা মো. আহসানুজ্জামানকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ২০ লাখ পিস গ্যাস লাইটার ‘চেইন অব আয়রন অথবা স্টিল’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির মামলায় সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির ও কিংশিপ শিপিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মির্জা মো. আহসানুজ্জামানকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

বুধবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মো. মিজানুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হুমায়ুন কবিরকে সর্বোচ্চ তিন বছর এবং মির্জা মো. আহসানুজ্জামানকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে দুজনকেই ১৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৩৩ টাকা ৬৯ পয়সা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের আরও ছয় মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় দুই আসামিই আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কবির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রায় অনুযায়ী, হুমায়ুন কবিরকে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড, ১২০ (বি) ধারায় ছয় মাস এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মির্জা মো. আহসানুজ্জামানকে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় দুই বছর এবং ১২০(বি)/১০৯ ধারায় ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত সব সাজা একসঙ্গে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়ায় হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছর এবং আহসানুজ্জামানের ক্ষেত্রে দুই বছরের কারাদণ্ড কার্যকর হবে।

দুজনকেই ফাঁকি দেওয়া শুল্কের অর্ধেক হিসেবে ১৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৩৩ টাকা ৬৯ পয়সা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাদের আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে জানান তিনি।

মামলার নথি ও আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মেসার্স ইউনিভার্সাল এন্টারপ্রাইজের নামে ২০১০ সালের ১১ মার্চ বেসিক ব্যাংকের খুলনা শাখায় খোলা এলসির মাধ্যমে ২ হাজার কার্টনে ২০ লাখ পিস গ্যাস লাইটার আমদানি করা হয়।

কাস্টমসের আইজিএমেও (ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট) পণ্য হিসেবে গ্যাস লাইটারের উল্লেখ ছিল। কিন্তু পণ্য খালাসের সময় কিংশিপ শিপিং এজেন্সির মাধ্যমে দাখিল করা বিল অব এন্ট্রিতে গ্যাস লাইটারের পরিবর্তে ‘চেইন অব আইরন অথবা স্টিল’ উল্লেখ করা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এটি কোনো সাধারণ করণিক ভুল ছিল না। প্রকৃত পণ্য এবং বিল অব এন্ট্রিতে ঘোষিত পণ্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। ২০ লাখ পিস গ্যাস লাইটারকে আইরণ অথবা স্টিল চেইন দেখিয়ে পণ্যের পরিচয় ও এইচএস কোড পরিবর্তন করায় শুল্কের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যায়।

রায়ে বলা হয়, প্রকৃত পণ্যের ওপর পরিশোধযোগ্য শুল্ক-কর ছিল ৩২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯৪ টাকা ৪৮ পয়সা। কিন্তু পরিবর্তিত পণ্যের ঘোষণার ভিত্তিতে মাত্র ১ লাখ ৭ হাজার ৫২৭ টাকা ১০ পয়সা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। ওই অর্থ পরিশোধ করেই পণ্য খালাস করা হয়। এতে সরকারের ৩১ লাখ ২৭ হাজার ৪৬৭ টাকা ৩৮ পয়সা রাজস্ব আদায় হয়নি।

মামলার তদন্তে কাস্টম হাউসের সংরক্ষিত তথ্য জব্দ ও পর্যালোচনা করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই ২০১০ সালের ১০ জুন ওই চালানের শুল্ক ১ লাখ ৭ হাজার ৫২৭ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করে এসেসমেন্ট নোটিশ দেওয়া হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এটি কোনো সাধারণ করণিক ভুল ছিল না। প্রকৃত পণ্য এবং বিল অব এন্ট্রিতে ঘোষিত পণ্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। ২০ লাখ পিস গ্যাস লাইটারকে আইরণ অথবা স্টিল চেইন দেখিয়ে পণ্যের পরিচয় ও এইচএস কোড পরিবর্তন করায় শুল্কের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যায়।

রায়ে বলা হয়, প্রকৃত পণ্যের ওপর পরিশোধযোগ্য শুল্ক-কর ছিল ৩২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯৪ টাকা ৪৮ পয়সা। কিন্তু পরিবর্তিত পণ্যের ঘোষণার ভিত্তিতে মাত্র ১ লাখ ৭ হাজার ৫২৭ টাকা ১০ পয়সা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। ওই অর্থ পরিশোধ করেই পণ্য খালাস করা হয়। এতে সরকারের ৩১ লাখ ২৭ হাজার ৪৬৭ টাকা ৩৮ পয়সা রাজস্ব আদায় হয়নি।

মামলার তদন্তে কাস্টম হাউসের সংরক্ষিত তথ্য জব্দ ও পর্যালোচনা করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই ২০১০ সালের ১০ জুন ওই চালানের শুল্ক ১ লাখ ৭ হাজার ৫২৭ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করে এসেসমেন্ট নোটিশ দেওয়া হয়।

পরে ওই নির্ধারিত অর্থ সোনালী ব্যাংকের কাস্টম হাউজ শাখায় জমা দেন সিএন্ডএফ এজেন্ট মির্জা মো. আহসানুজ্জামান। এরপর পণ্যটি খালাস করা হয়।

আদালত বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে হুমায়ুন কবিরের আমদানিকৃত পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস এবং আইনানুগ শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল। গ্যাস লাইটারের মতো প্রকৃত পণ্য থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ ভিন্ন এইচএস কোডে অস্বাভাবিক কম শুল্ক নির্ধারণকে নিছক ভুল বা অসাবধানতা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই।’

রায়ে আরও বলা হয়, ‘হুমায়ুন কবিরের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড অন্য কেউ ব্যবহার করেছিলেন কিংবা তার অজ্ঞাতে শুল্কায়ন হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ বা সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। তিনি পলাতক থাকায় এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেননি।’

মামলার সাক্ষ্যে মো. সওকত হোসেন বলেন, ‘তিনি সরাসরি কিংশিপ শিপিং এজেন্সিকে নিয়োগ না করে সাইফুল ইসলামের কাছে আমদানির কাগজপত্র দিয়েছিলেন। তবে আদালত উল্লেখ করেন, একই সাক্ষ্যে তিনি স্বীকার করেছেন যে, তার আমদানি করা পণ্য কিংশিপ শিপিং এজেন্সির মাধ্যমে খালাস হয়েছিল।’

অন্যদিকে কাস্টমসের নথিতে কিংশিপ শিপিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মির্জা মো. আহসানুজ্জামানকেই সংশ্লিষ্ট চালানের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে পাওয়া যায়। তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়েছিল।

আদালতের মতে, সরাসরি নিয়োগ না পাওয়ার বক্তব্যটি কাস্টম হাউসে ওই এজেন্সির মাধ্যমে সম্পাদিত কার্যক্রমকে নাকচ করে না। প্রকৃত পণ্যের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন পণ্য ও এইচএস কোড উল্লেখ করে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের বিষয়টি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট করে।

রায়ে দুই আসামির ভূমিকা পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা হয়। একদিকে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে প্রকৃত পণ্যের বদলে ভিন্ন পণ্য ও এইচএস কোড উল্লেখ করে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা নিজের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ওই ঘোষণার ভিত্তিতে অস্বাভাবিকভাবে কম শুল্ক নির্ধারণ করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই পরস্পরনির্ভর কর্মকাণ্ডের ফলেই ৩১ লাখ ২৭ হাজার ৪৬৭ টাকা ৩৮ পয়সা সরকারি রাজস্ব অনাদায়ী রেখে পণ্য খালাস সম্ভব হয়। ষড়যন্ত্র সাধারণত প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যে প্রমাণিত না হলেও পারিপার্শ্বিক ও দলিলি সাক্ষ্যের সমন্বয়ে তা প্রমাণিত হতে পারে।

দুদকের পিপি কবির হোসেন বলেন, মামলায় দুদকের পক্ষে মোট নয়জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের সাক্ষ্যের সঙ্গে এলসি, কাস্টমসের শুল্কায়ন নথি, বিল অব এন্ট্রি, ব্যাংক রেকর্ড, জব্দ করা নথি এবং ASYCUDA++ তথ্য মিলিয়ে আদালত প্রসিকিউশনের বক্তব্যের সঙ্গে বস্তুগত কোনো বিরোধ পাননি।

তদন্তে সাইফুল ইসলাম ও ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর নামও আসে। তাদের ব্যাংক হিসাবে যথাক্রমে ২০ লাখ ও চার লাখ টাকা জমার তথ্য পাওয়া যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধেও চার্জশিট দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।

তবে বিচার পর্যায়ে আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মতো উপযুক্ত উপাদান না পাওয়ায় ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবরের আদেশে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।

অপরদিকে আমদানিকারক অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) তদন্তে দাবি করেন, তিনি তার ব্যবসায়ী বন্ধু সওকত হোসেনের জন্য পণ্যটি আমদানি করেছিলেন। পণ্য খালাস ও শুল্ক ফাঁকির কার্যক্রমে তার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। দুদকও সেই সুপারিশ অনুমোদন করে।

তদন্তে জানা গেছে, ফাঁকিকৃত শুল্ক কর বাবদ ৩১ লাখ ২৭ হাজার ৪৬৮ টাকা ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়। তবে আদালতের বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে ওই অর্থ পরিশোধ করা হলেও শুল্ক ফাঁকির সময় সংঘটিত অপরাধের দায় তাতে বিলীন হয়নি।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ৯ জুন বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। পরদিন ১০ জুন কম শুল্ক নির্ধারণ ও পরিশোধের পর পণ্য খালাস করা হয়। ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফাঁকিকৃত শুল্ক পরিশোধের জন্য দাবিনামা জারি করা হলেও তা পরিশোধ করা হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধানের পর ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল মামলা দায়েরের অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের ২৬ এপ্রিল মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হুমায়ুন কবির, মির্জা মো. আহসানুজ্জামান, সাইফুল ইসলাম ও ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে অনিন্দ্য ইসলামকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

২০২১ সালের ৪ অক্টোবর মামলাটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আসে। ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর হুমায়ুন কবির ও মির্জা মো. আহসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর দুদকের পক্ষে নয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার মামলাটির রায় ঘোষণা করেন আদালত।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত