লাম্পি স্কিন

রাজবাড়ীতে টিকার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬ ০১:৫৫ পিএম

লাম্পি স্কিন ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত গরুর শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, খাওয়ার পরিমাণ কমে যায় এবং দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। রোগের ধরন অনুযায়ী গরুর শরীরে ছোট বা বড় আকারের গুটি দেখা দিতে পারে

রাজবাড়ীতে গরুর মধ্যে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে রয়েছেন খামারি ও প্রান্তিক কৃষকেরা। আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা ব্যয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরু মারা যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।

জেলার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকারি উদ্যোগে মাত্র ৬ হাজার ৫০০ ডোজ এলএসডি টিকা সরবরাহ করা হলেও জেলায় টিকার চাহিদা প্রায় দেড় লাখ ডোজ।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট গরুর খামার রয়েছে ১৬ হাজার ১২১টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত গাভির খামার ৩৬৬টি এবং অনিবন্ধিত ৮ হাজার ৬০৯টি। নিবন্ধিত গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ৩৪টি এবং অনিবন্ধিত ৭ হাজার ১৪৩টি। জেলায় মোট গরুর সংখ্যা ১ লাখ ২১ হাজার ৯২টি।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালের দিকে বাংলাদেশে লাম্পি স্কিন রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। শুরুতে বড় খামারগুলোতে আক্রান্তের হার বেশি থাকলেও টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক কৃষক এখনও রোগটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন।

সরকারিভাবে সরবরাহ করা এলএসডি টিকার এক অ্যাম্পুলে পাঁচটি গরুকে টিকা দেওয়া যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টিকার এক অ্যাম্পুলে ১০টি গরুকে টিকা দিতে হয়। এসব টিকার এক অ্যাম্পুলের দাম ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। ফলে ব্যয়ের কারণে অনেক গরু পালনকারী টিকা দিতে আগ্রহ হারান বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড়লক্ষীপুর গ্রামের বিধবা শাহিনা বেগম গরু পালন করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর গোয়ালে দুটি দেশি জাতের গাভি ও একটি বাছুর ছিল। তিন মাস আগে লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত হয়ে এক বছর বয়সী বাছুরটি মারা যায়।

শাহিনা বেগম এই প্রতিবেদককে বলেন, “প্রায় তিন বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছেন। ছেলেদের সংসারে থাকি। নিজেরও কিছু টাকা-পয়সার দরকার হয়। তাই গরু পালন করি। তিন মাস আগে বাছুরটি লাম্পি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। ১৫ দিন চিকিৎসা দেওয়ার পর মারা যায়। এতে আমার প্রায় ৭০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আগে কোনো টিকা দেওয়া ছিল না। এখন বাকি দুইটি গরুকে টিকা দিয়েছি।”

স্থানীয়রা জানান, একই ইউনিয়নের গঙ্গাপ্রসাদপুর গ্রামের আরশাদ শেখ ও সালাম শেখের একটি করে গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের বৃত্তিডাঙ্গা গ্রামের কৃষক ওসমান মুন্সী কৃষিকাজের পাশাপাশি গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। তাঁর খামারে থাকা নয়টি গরুর মধ্যে তিনটি লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সুস্থ হলেও একটি গরুর শরীরে এখনও ঘা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে গরু পালন করছি। এর আগে আমার কোনো গরু গুটি রোগে আক্রান্ত হয়নি। এবার তিনটি গরু আক্রান্ত হয়েছে। দুটি সুস্থ হয়েছে, আর একটি এখনও অসুস্থ। ঘা শুকাতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। আশপাশের অনেক বাড়িতেও এই রোগ দেখা দিয়েছে। কয়েকটি গরু মারাও গেছে। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কাউকে ভ্যাকসিন দিতে বা টিকা দেওয়ার বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।”

পাংশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, লাম্পি স্কিন ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত গরুর শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, খাওয়ার পরিমাণ কমে যায় এবং দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। রোগের ধরন অনুযায়ী গরুর শরীরে ছোট বা বড় আকারের গুটি দেখা দিতে পারে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খামার পরিদর্শন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, “লাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সারা দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণত মশা, মাছি ও আঁঠালির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বর্ষার শুরুতে এর প্রকোপ বাড়ে। আক্রান্ত গরুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সুস্থ গরুকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে রোগটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে খামার পরিদর্শন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের টিকা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। মানুষকে সচেতন করতে যতসংখ্যক উঠান বৈঠক করা প্রয়োজন, তা আমরা করতে পারছি না। গরু পালনকারীরা নিয়মিত টিকা দিলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।”

খামারিদের অভিযোগ, টিকার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অত্যন্ত কম। ফলে জেলার বিপুলসংখ্যক গরুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন খামারি ও কৃষকেরা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত