আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই ঘিরে উদ্বেগ
নোয়াখালীতে ১২ দিনে বিএনপি নেতাসহ আটজন গুলিবিদ্ধ, জনমনে আতঙ্ক
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ঘটনার পর অভিযান কিংবা মামলা নয়, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে। বিশেষ করে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগের দাবি উঠছে
নোয়াখালীতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুলির ঘটনা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইকে কেন্দ্র করে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে বিএনপি নেতাসহ অন্তত আটজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সর্বশেষ ১৭ আগস্ট রাতে বেগমগঞ্জে গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল আরোহীদের ওপর গুলির ঘটনায় দুজন গুলিবিদ্ধ এবং আরও তিনজন ছররা গুলিতে আহত হন।
ঘটনাগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত ও অভিযান চালানোর কথা জানালেও থামছে না অপরাধীদের তৎপরতা। ফলে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়েও তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা।
বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি
গত ৬ আগস্ট রাত পৌনে ১২টার দিকে বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী বাজারের হকার্স মার্কেটে জেলা বিএনপির সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হাজি আবুল কাশেমকে (৬০) লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও হকার্স মার্কেটের ফার্মেসি ব্যবসায়ী ইয়াছিন সেন্টু (৪৫)।
আহত দুজনকে উদ্ধার করে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে আবুল কাশেমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
বেগমগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হাবীবুর রহমান জানান, দুর্বৃত্তদের গুলিতে একজন আহত হয়েছেন এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) আ ন ম ইমরান খান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপি নেতা কাশেমকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলি তাঁর সহযোগীর বুকে লাগে।
ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় সিএনজিচালককে গুলি
এর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ১২ আগস্ট রাতে আবারও গুলির ঘটনা ঘটে বেগমগঞ্জের আলাইয়াপুর এলাকায়। চন্দ্রগঞ্জ বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে আলাইয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে সিএনজিচালক রাব্বি হোসেন রাকিবকে (২২) থামিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
এ সময় রাকিব বাধা দিলে এবং চিৎকার করলে দুর্বৃত্তরা তাঁর পায়ে গুলি করে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গায়েহলুদে যাওয়ার পথে গুলি
সর্বশেষ ১৭ আগস্ট রাতে আলাইয়াপুর ইউনিয়নের মৌশাকপুর গ্রামে একটি গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে ভিডিও ধারণের জন্য যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল আরোহীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হন। ছররা গুলিতে আহত হন আরও তিনজন।
আহতদের নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। অন্যরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বেগমগঞ্জ থানার ওসি মো. শামসুজ্জামান জানান, এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেবে।
অপরাধ দমনে কঠোর হওয়ার আশ্বাস
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন (নাসির) বলেন, বেগমগঞ্জে সাম্প্রতিক গুলির ঘটনাগুলো পুলিশ তদন্ত করছে। অপরাধী যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধের বিষয়েও পুলিশ নজর রাখছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ঘটনার পর অভিযান কিংবা মামলা নয়, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে। বিশেষ করে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগের দাবি উঠছে।
সামাজিক অবক্ষয়ও দায়ী
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল কাইয়ুম মাসুদের মতে, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সমাজমাধ্যমে গুজব, পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি এবং যথাযথ আইন প্রয়োগের অভাবে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী ও পথচারী—কেউই সংঘবদ্ধ অপরাধীদের হামলার বাইরে থাকছেন না। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং একই সঙ্গে অপরাধের নেপথ্যের কারণ ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একের পর এক গুলির ঘটনায় নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Shamiur Rahman
