রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ

কনিকার মৃত্যু: চিকিৎসায় অবহেলার বিচারই কি যথেষ্ট?

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৪৫ পিএম

কনিকার মৃত্যুর ন্যায়বিচার তাই শুধু দায়ীদের শাস্তিতে নয়; ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন এই মৃত্যু রাষ্ট্রকে সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করাবে, যেগুলো আমরা দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যাচ্ছি

একজন মায়ের মৃত্যু কখনোই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়। বিশেষ করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি কোনো রোগীর মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসাজনিত অবহেলার অভিযোগ ওঠে, তখন সেই মৃত্যু প্রশ্ন তোলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা, জবাবদিহি ও মানুষের আস্থার ওপর।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির কনিকা মন্ডলের মৃত্যু তেমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর তাঁর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল। পরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রায় দেড় মাস পর তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। তবে এর বিচার শুধু দায়ী চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও মানুষের আস্থার সংকটও খতিয়ে দেখা জরুরি।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের মাধ্যমে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বালিয়াকান্দির বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী কনিকা মন্ডল (৩৫)। অস্ত্রোপচারের পরদিন তাঁর পেট ফুলে যায় এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে ৩ জুলাই তাঁকে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭ জুলাই পরীক্ষায় তাঁর পেটে গজ থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে এবং সেদিনই অস্ত্রোপচার করে তা বের করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ আগস্ট রাত সোয়া ২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পরে তিনি কনিকার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন। একজন মন্ত্রীর এমন মানবিক উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং কেউ দায়ী হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এরপর?

শুধু দায় নির্ধারণ করলেই কি দায়িত্ব শেষ?

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। কারণ একজন রোগী চিকিৎসকের কাছে যান জীবন রক্ষার আশায়। সেই চিকিৎসায় যদি গুরুতর ভুল বা অবহেলার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু কনিকার মৃত্যুকে যদি শুধু একটি হাসপাতাল বা একজন চিকিৎসকের সম্ভাব্য অবহেলার ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে হয়তো বৃহত্তর সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যাবে।

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কনিকা কেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন না?

যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে, তার কাছাকাছি একটি ৫০০ শয্যার সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তাহলে একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গেলেন? এই প্রশ্ন কনিকার পরিবারকে দায়ী করার জন্য নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন।

একজন নাগরিক যখন সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াকে বেশি নিরাপদ, কার্যকর বা নির্ভরযোগ্য মনে করেন, তখন রাষ্ট্রের উচিত সেই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করা।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর আস্থা কোথায়?

দেশের স্বাস্থ্যখাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, ওষুধ সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়নে জনগণের করের অর্থ ব্যয় হয়।

তারপরও দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা থাকা কোনো সমস্যা নয়। বরং একটি বড় ও বৈচিত্র্যময় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতেরই প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন সাধারণ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর আস্থা না রেখে বাধ্য হয়ে কিংবা নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সরকারি হাসপাতালে কি পর্যাপ্ত চিকিৎসক পাওয়া যায়? প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে? ওষুধের সংকট রয়েছে কি না? রোগীর সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের আচরণ কেমন? অতিরিক্ত ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা, অব্যবস্থাপনা কিংবা দালালচক্রের প্রভাব কতটা? নাকি মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় না?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গবেষণা দরকার

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতটি হাসপাতাল নির্মাণ হয়েছে, কতজন চিকিৎসক নিয়োগ পেয়েছেন কিংবা কত কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে—এসব পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।

এর সঙ্গে দেখতে হবে, মানুষ কোথায় চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে এবং কেন যাচ্ছে।

সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কত শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, কেন নিচ্ছেন, সরকারি হাসপাতালে তাদের অভিজ্ঞতা কী, চিকিৎসা ব্যয়ের পার্থক্য কতটা এবং কোন কারণে তারা সরকারি হাসপাতাল এড়িয়ে যাচ্ছেন—এসব বিষয়ে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক নিয়মিত গবেষণা ও জরিপ হওয়া প্রয়োজন।

কারণ মানুষের আস্থা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি। অবকাঠামো থাকলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যকর হয় না; মানুষ যদি সেই ব্যবস্থার ওপর আস্থা না রাখেন, তাহলে বড় বড় হাসপাতাল ও আধুনিক যন্ত্রপাতিও কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারে না।

বেসরকারি চিকিৎসার ব্যয়ও বড় বাস্তবতা

দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অনেক সময় নিছক পছন্দের বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক ঝুঁকিরও বিষয়।

একজন রোগীকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে কোনো পরিবারকে জমি বিক্রি করতে হয়, ধার করতে হয়, গয়না বিক্রি করতে হয় কিংবা সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করতে হয়—এমন ঘটনা দেশে কম নয়।

এরপর যদি চিকিৎসায় গুরুতর ভুল বা অবহেলার অভিযোগ ওঠে এবং রোগীর মৃত্যু হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একটি প্রাণ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি পরিবার একই সঙ্গে হারায় তার প্রিয় মানুষ, আয় করার সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

কনিকার ক্ষেত্রেও তাঁর মৃত্যু একটি পরিবারকে যে গভীর মানসিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ফেলেছে, সেটি কেবল ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু মৃত্যুর পর পাশে দাঁড়ানো নয়

কনিকার বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেওয়া নিঃসন্দেহে মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বড়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা অবহেলার শিকার হবেন না।

প্রতিটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ জোরদার করা, চিকিৎসায় ভুলের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা, চিকিৎসকদের পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া—এসবের পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মানও বাড়াতে হবে।

কনিকার মৃত্যু একটি সুযোগও হতে পারে

কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত হোক। প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ্যে আসুক। চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তাঁর পরিবার ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা পায়—এটিও নিশ্চিত করা দরকার।

তবে এর পাশাপাশি আরেকটি বৃহত্তর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন—কেন একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিবর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়াকে বেশি নিরাপদ মনে করেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলে কনিকার মৃত্যুর বিচার শুধু একজন বা কয়েকজনের দায় নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তাঁর মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত ও সংস্কারের একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

একটি কল্যাণরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাগরিকের জীবন রক্ষা করার সক্ষমতা। সেখানে দরিদ্র কিংবা সাধারণ মানুষের জীবন কোনোভাবেই সস্তা হতে পারে না।

কনিকার মৃত্যুর ন্যায়বিচার তাই শুধু দায়ীদের শাস্তিতে নয়; ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন এই মৃত্যু রাষ্ট্রকে সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করাবে, যেগুলো আমরা দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যাচ্ছি।

মানুষ সরকারি হাসপাতাল রেখে বেসরকারি হাসপাতালে কেন যায়—এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে খুঁজতেই হবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত