উন্নয়ন হোক প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানে
'সন্তোষপুরে ইকোপার্ক হোক মানুষকে সঙ্গে নিয়েই
স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, পর্যটক গাইড, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, স্থানীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে ইকোপার্ক থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধার বড় একটি অংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছেই থাকবে
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ১ নম্বর নাওগাঁ ইউনিয়নের সন্তোষপুরে সংরক্ষিত বনভূমিকে সরকারি ভাবে ‘সন্তোষপুর ইকোপার্ক’ ঘোষণা করায় এলাকাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সোহাগ 'সন্তোষপুর ইকোপার্ক ঘোষণা সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন পাওয়ার বিষয়টি গনমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্দীপনা ও আশাবাদ। ইকোপার্ক ঘোষণাকে ঘিরে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ফুলবাড়ীয়া উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ৫৬৫ দশমিক ৪৫ একর বা ২২৮ দশমিক ৯২ হেক্টর ভূমি নিয়ে ‘সন্তোষপুর ইকোপার্ক’ ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে
ফুলবাড়িয়ার সন্তান হিসেবে সন্তোষপুর বনাঞ্চলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেবল একটি বনভূমির সঙ্গে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রকৃতি, স্মৃতি, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই সন্তোষপুরে একটি পরিকল্পিত ইকোপার্ক গড়ে উঠুক—এটি আমি চাই। একই সঙ্গে এই বনাঞ্চলকে ঘিরে যেসব পরিবার বছরের পর বছর ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে, উন্নয়নের নামে তাঁদের বঞ্চিত করা হোক—এটিও চাই না। আমার কাছে বিষয়টি বন বনাম মানুষ নয়; বরং বন ও মানুষকে একসঙ্গে রক্ষা করার প্রশ্ন।
কৃষিবান্ধব ইকোপার্ক
সন্তোষপুরে কৃষিকেও ইকোপার্কের শত্রু হিসেবে দেখা যাবে না। বরং পরিবেশবান্ধব কৃষিকে ইকোপার্কের একটি অংশ করা যেতে পারে। আনারস, হলুদ, কলা ও লেবু চাষের মতো বিদ্যমান কৃষিকে পরিকল্পিতভাবে টিকিয়ে রেখে কৃষকদের জৈব ও কম-রাসায়নিক চাষাবাদে উৎসাহিত করা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষিপণ্যকে ইকোপার্কের ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটকেরাই হয়ে উঠতে পারেন এসব পণ্যের নতুন বাজার। এতে কৃষক বন হারাবেন না; বরং বন রক্ষার মধ্য দিয়েই তাঁর আয় বাড়তে পারে।

সন্তোষপুর বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে একটি শক্তিশালী স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। বন বিভাগের সামাজিক ও কৃষি বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় দেড় হাজার পরিবার সরাসরি যুক্ত। আনারস, হলুদ, কলা ও লেবু চাষকে ঘিরে বনাঞ্চলটির আশপাশে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
অর্থাৎ সন্তোষপুর শুধু একটি বনাঞ্চল নয়; এটি একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভূদৃশ্য। এখানে বন আছে, কৃষি আছে, মানুষ আছে এবং তাদের পারস্পরিক নির্ভরতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এখন সেখানে ইকোপার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলতে পারে। পরিকল্পিত পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার বাড়াতে পারে এবং সন্তোষপুরকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই উন্নয়নের সুফল কারা পাবেন এবং এর মূল্য কে দেবেন? ইকোপার্কের সীমানাপ্রাচীর, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, সড়ক, দর্শনার্থী কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে যদি কৃষিজমি সংকুচিত হয়, সামাজিক বনায়নের অংশীদারেরা তাঁদের জমি বা বন ব্যবহারের সুযোগ হারান কিংবা স্থানীয় মানুষের চলাচল ও জীবিকার ওপর বিধিনিষেধ তৈরি হয়, তাহলে প্রকল্পটি মানুষের কাছে উন্নয়নের পরিবর্তে বঞ্চনার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। এমনটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সংরক্ষণের ধারণা বদলাচ্ছে। শুধু গাছ লাগানো বা দেয়াল তুলে একটি এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করাই সংরক্ষণ নয়। প্রকৃত সংরক্ষণ হলো—প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের প্রয়োজনকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসা। এখানেই সন্তোষপুর বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। সন্তোষপুরে ইকোপার্কের পরিকল্পনা করার আগে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও সামাজিক সমীক্ষা করা জরুরি। কোথায় প্রাকৃতিক বন, কোথায় সামাজিক বনায়ন, কোথায় কৃষি, কোথায় জলাধার, কোথায় বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ এবং কোথায় পর্যটন অবকাঠামো করা নিরাপদ—এসব বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
কম কংক্রিট, বেশি সবুজ
প্রকল্পের নকশা আগে তৈরি করে পরে মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে সেটিকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা না করে, মানুষ ও প্রকৃতির বাস্তবতা থেকেই প্রকল্পের নকশা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। নিরাপত্তা যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু পুরো এলাকাকে অপ্রয়োজনীয় কংক্রিটের দেয়ালে ঘিরে ফেলা কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব ইকোপার্কের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একই কথা প্রযোজ্য পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, রাস্তা, রেস্তোরাঁ, দোকান কিংবা অন্যান্য স্থাপনার ক্ষেত্রেও। ইকোপার্কের সাফল্য কত টন কংক্রিট ব্যবহার হলো তা দিয়ে নয়; কতটা বন রক্ষা পেল, কতটা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হলো এবং স্থানীয় মানুষের কতটা জীবন-জীবিকা উন্নত হলো—তা দিয়ে বিচার করা উচিত।
উন্নয়নের নামে যেন বঞ্চনা না হয়
সামাজিক বনায়নের সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও প্রকল্পের বাইরে রাখা উচিত নয়। তাঁদের কেবল ‘উপকারভোগী’ হিসেবে না দেখে ইকোপার্কের অংশীদার ও রক্ষক হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, গাইডিং, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, স্থানীয় পণ্য বিক্রি এবং পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তাহলে ইকোপার্কের অর্থনৈতিক সুবিধা বাইরে চলে যাবে না; স্থানীয় মানুষের কাছেই তার বড় অংশ ফিরে আসবে।
এক্ষেত্রে জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকির দেশীয় প্রজাতিনির্ভর ঘন বনায়নের ধারণা থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তবে সন্তোষপুরে কোনো বিদেশি মডেল হুবহু প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। বরং এখানকার নিজস্ব বন, মাটি, জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জ্ঞানকে ভিত্তি করেই সন্তোষপুরের নিজস্ব পরিবেশবান্ধব মডেল তৈরি করা উচিত।
সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক বনায়নের নামে এমন কোনো গাছ লাগানো উচিত নয়, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বা কৃষির জন্য ক্ষতিকর। দেশীয় ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা এমন ইকোপার্ক চাই না, যেখানে বন দেখানোর জন্য আগে বন কেটে রাস্তা বানাতে হবে। এমন পর্যটনও চাই না, যেখানে প্রকৃতি দেখতে গিয়ে প্রকৃতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে হবে। আমরা চাই কম কংক্রিট, বেশি সবুজ; কম দখল, বেশি সংরক্ষণ; কম বাণিজ্যিকীকরণ, বেশি স্থানীয় অংশীদারিত্ব।
নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা
অতীতে ফুলবাড়ীয়াকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। বিগত সরকারের আমলে ফুলবাড়ীয়ায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইপিজেড স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি পর্যবেক্ষণ টিম সরেজমিনে তা পরিদর্শনও করে যান। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি কুচক্রী মহলের হীন চক্রান্তের কারণে ইপিজেডটি ফুলবাড়ীয়া থেকে জামালপুর জেলায় স্থানান্তরিত হয়। ফলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পিছিয়ে পড়ে ফুলবাড়ীয়াবাসী।
অতীতে ইপিজেড হারানোর সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবার সন্তোষপুর ইকোপার্ক ঘিরে আবারও একই ধরনের ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন স্থানীয়রা। নির্ধারিত ইকোপার্কের বনভূমির জমি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এই স্বার্থান্বেষী মহলটি নিজেদের হীন স্বার্ত্থ আদায়ে সাধারণ ও অসহায় মানুষদের ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নামিয়ে মানববন্ধনের মাধ্যমে উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এদের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ইকোপার্ক বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে।
স্থানীয় বাস্তবতায় তৈরি হোক নিজস্ব মডেল
সন্তোষপুরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাই স্থানীয় কৃষক, সামাজিক বনায়নের অংশীদার, বন বিভাগ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের মতামত শোনা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সফলতার অন্যতম শর্ত।
ফুলবাড়িয়ার সন্তান হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুবই পরিষ্কার। আমি সন্তোষপুরে ইকোপার্ক চাই। কিন্তু সেই ইকোপার্ক যেন সন্তোষপুরের মানুষের জীবিকার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি না হয়। আমি বন রক্ষা চাই, কিন্তু সেই বন রক্ষার নামে মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হোক—তা চাই না। সন্তোষপুরের সামনে একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে এখানে এমন একটি মডেল তৈরি করতে পারি, যেখানে বন থাকবে, কৃষক থাকবে, জীববৈচিত্র্য থাকবে, পর্যটন থাকবে এবং স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়বে।
তাই সন্তোষপুরের জন্য সিদ্ধান্তটি ‘ইকোপার্ক হবে কি হবে না’—এই সরল দ্বন্দ্বে আটকে না রেখে ‘কীভাবে এমন ইকোপার্ক করা যায়, যেখানে বন ও মানুষ দুজনেই জয়ী হবে’—এই প্রশ্নকে সামনে রেখে নিতে হবে। সন্তোষপুরে ইকোপার্ক হোক। কিন্তু মানুষকে বাদ দিয়ে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে।
উন্নয়ন হোক—কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়।
সংরক্ষণ হোক—কিন্তু জীবিকার বিনিময়ে নয়।
সন্তোষপুর হোক এমন এক দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রকৃতি রক্ষা ও মানুষের জীবন-জীবিকা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একই ভবিষ্যতের দুই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক এবং উন্নয়নকর্মী
Shamiur Rahman
