কৃষি ব্যবস্থাপনার সংকট কোথায়?
কৃষকের হাতে সার নেই, গুদামে কেন?
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাহলে জাতীয় পর্যায়ে সার থাকার পরও মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিযোগ কেন এত তীব্র?
২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে এক সার ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকেরা সার নিয়ে গেছেন। গুদামে থাকা ৩৪২ বস্তার মধ্যে ২০২ বস্তা ইউরিয়া ও ২৩ বস্তা পটাশ নিয়ে যাওয়ার কথা জানা গেছে। পরে কিছু সার উদ্ধারও হয়েছে। গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ারও সুযোগ নেই। কিন্তু এই ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে এর গভীরতর কারণটি আড়ালে থেকে যাবে।
প্রশ্নটি হলো—কৃষক কেন এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছালেন যে সার পাওয়ার জন্য তাঁকে গুদামের দরজা ভাঙতে হলো? এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী দেশে সারের সংকট নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাহলে জাতীয় পর্যায়ে সার থাকার পরও মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিযোগ কেন এত তীব্র?
এখানেই আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতাটি ধরা পড়ে। গুদামে সার থাকা আর কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো এক কথা নয়। কৃষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তাঁর ইউনিয়ন বা বাজারের ডিলারের কাছে প্রয়োজনের সময়ে নির্ধারিত দামে সার পাওয়া। জাতীয় মজুতের হিসাব দিয়ে সেই বাস্তবতা বোঝা যায় না।
সম্প্রতি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে কৃষকেরা সারসংকট ও বেশি দামের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি দামে টিএসপি, ডিএপি ও ইউরিয়া বিক্রি হচ্ছিল। অর্থাৎ সমস্যা শুধু সরবরাহের নয়; বিতরণব্যবস্থা, বাজারনিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিরও। আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, সারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা। দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় বিপুল পরিমাণ সার আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। গ্যাসসংকটসহ বিভিন্ন কারণে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়কে প্রভাবিত করে।
এই পরিস্থিতিতে সার সরবরাহের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আরও জরুরি। কোন ডিলার কত সার পেলেন, কখন পেলেন, কত দামে বিক্রি করলেন এবং শেষ পর্যন্ত কতজন কৃষক তা পেলেন—এসব তথ্য যদি কৃষকের কাছেই অদৃশ্য থাকে, তাহলে মাঝপথে অনিয়মের সুযোগ থেকেই যায়। কিন্তু এখানে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে—কৃষির প্রতি রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা? কৃষককে আমরা বক্তৃতায় অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলি, কিন্তু বাজেট ও নীতিনির্ধারণে তাঁর অবস্থান কতটা অগ্রাধিকার পায়? ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বরাদ্দ ৪৬,৮২১ কোটি টাকা হলেও জাতীয় বাজেটের মোট আকারের তুলনায় কৃষির অংশ প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে কৃষি অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ উৎপাদন ব্যয় ও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কৃষি ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার-চাপ। আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক নথিতে সার ভর্তুকিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার কথা বলা হয়েছে—অর্থাৎ সবার জন্য একই ধরনের ভর্তুকির বদলে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষককে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণা সামনে এসেছে। আইএমএফ ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে অধিক কার্যকর ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থ ব্যবহারের যুক্তিও দিয়েছে।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভর্তুকি সংস্কার করা যেতে পারে, কিন্তু কৃষকের সুরক্ষা কমিয়ে নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক শৃঙ্খলা এবং কৃষকের বাস্তব জীবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ভর্তুকি কমানো যদি হয়, তাহলে তার বিকল্প হিসেবে কৃষককে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা, কৃষি উপকরণ ভাউচার, সহজ ঋণ, উন্নত সম্প্রসারণসেবা এবং ন্যায্যমূল্যের বাজার দিতে হবে। নইলে কাগজে ভর্তুকি কমবে, কিন্তু বাস্তবে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। আইএমএফ-এর ২০২৪ সালের বিশ্লেষণেও সার ভর্তুকি সংস্কারের সঙ্গে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা বা ভাউচারের মতো বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও একটি সরাসরি প্রশ্ন থাকা উচিত—ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কৃষককে নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ; ক্ষমতায় গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ, সার, কীটনাশক ও ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার রাজনৈতিক সাহস কতটা আছে? কৃষি যদি সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকার হয়, তাহলে তার প্রতিফলন শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে নয়, বাজেট, ভর্তুকি, বাজারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতায়ও থাকতে হবে।
কিন্তু কৃষকের সমস্যা শুধু সারেই সীমাবদ্ধ নয়। কীটনাশকের ক্ষেত্রেও তাঁকে নানা ঝুঁকি নিতে হয়। নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা অননুমোদিত কীটনাশক বাজারে থাকার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। কোথাও কৃষক প্রয়োজনীয় কীটনাশক পান না, কোথাও আবার নিম্নমানের পণ্য কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অথচ উৎপাদনের নিশ্চয়তা বাড়ে না। কৃষকের এই সংকটের আরেক প্রান্তে রয়েছে ফসলের বাজার। উৎপাদনের সময় তাঁকে সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম ও সেচের জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হয়; কিন্তু ফসল ওঠার পর অনেক ক্ষেত্রেই তিনি ন্যায্যমূল্য পান না। তখন কৃষকের প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক—উৎপাদনের সব ঝুঁকি যদি তাঁর, তাহলে লাভের বড় অংশ অন্যের হাতে যাবে কেন?
এখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আছে। কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল থাকলে কৃষক যে দাম পান এবং ভোক্তা যে দাম দেন—তার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। তাই শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য যথেষ্ট নয়; কৃষক যাতে উৎপাদনের ন্যায্য অর্থনৈতিক ফল পান, সেই বাজারব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে।
কৃষিকে টেকসই করতে হলে এখন কয়েকটি বিষয়ে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন :-
প্রথমত, সার বিতরণব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ, মজুত ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। কৃষক যেন জানতে পারেন তাঁর এলাকার ডিলার কত সার পেয়েছেন এবং সরকার নির্ধারিত দাম কত।
দ্বিতীয়ত, ডিলার পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে জরিমানা করলে হবে না। অনিয়মের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে বরাদ্দ, বিক্রি ও কৃষকের প্রাপ্তির মধ্যে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের মাননিয়ন্ত্রণ কঠোর করতে হবে। নকল বা ভেজাল কৃষি উপকরণকে সাধারণ ভোক্তা-প্রতারণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে কৃষকের আয়, খাদ্যের নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য জড়িত।
চতুর্থত, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি কৃষক–বাজার সংযোগ বাড়াতে হবে। সংরক্ষণ, পরিবহন ও স্থানীয় বাজারব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও তাঁর আয় বাড়বে না।
সবশেষে সবচেয়ে জরুরি হলো—কৃষককে শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে দেখা বন্ধ করা। তিনি কত দামে সার পেলেন, কত খরচে ফসল উৎপাদন করলেন, কত দামে বিক্রি করলেন এবং উৎপাদনের পর তাঁর হাতে কত টাকা থাকল—কৃষিনীতি মূল্যায়নের আসল সূচক হওয়া উচিত সেটিই। সার লুট কোনো সমাধান নয়। গুদাম ভাঙাও কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ নয়। কিন্তু কৃষকের ক্ষোভকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখেও সমস্যার সমাধান হবে না। সেই ক্ষোভের কারণ দূর করতে হবে। আজ কৃষক সারের জন্য হাহাকার করছেন। কাল যদি সেই কৃষক চাষ করতেই অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, তখন সংকট শুধু কৃষকের থাকবে না—সংকট হবে আমাদের সবার খাবারের টেবিলে। কারণ কৃষক যদি সময়মতো সার না পান, মানসম্মত কৃষি উপকরণ না পান এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে ক্ষতি শুধু একজন কৃষকের নয়—ক্ষতি দেশের খাদ্যব্যবস্থার। আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি, কৃষক দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এখন সময় এসেছে কথাটিকে নীতিতে পরিণত করার।
গুদামে সার আছে কি না, সেটিই শেষ কথা নয়; কৃষকের জমিতে সময়মতো সার পৌঁছাচ্ছে কি না—সেটিই রাষ্ট্রের কৃষিনীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার আসল পরীক্ষা।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী।
Shamiur Rahman
