নয় বছর পরও ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা নেই, সংকটের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে

রোহিঙ্গা সংকট: প্রত্যাবাসনের পথ বন্ধ, দায় কি শুধু সময়ের?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৮ এএম

নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাও প্রত্যাবাসিত হয়নি। ফেরার কোনো বিশ্বাসযোগ্য সময়সূচিও নেই--তালিকা হয়েছে, যাচাই হয়েছে, বৈঠক হয়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে—কিন্তু ঘরে ফেরার পথ এখনো খোলেনি

২৫ আগস্ট আবারও ফিরে এসেছে। ২০১৭ সালের এই দিন থেকেই মিয়ানমারের রাখাইনে ভয়াবহ নিপীড়নের মুখে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার ঢল শুরু হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যে সাত লাখের বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল কক্সবাজারে। সেই থেকে পেরিয়ে গেছে নয় বছর। বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকটের দশম বছরে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়?

নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাও প্রত্যাবাসিত হয়নি। ফেরার কোনো বিশ্বাসযোগ্য সময়সূচিও নেই--তালিকা হয়েছে, যাচাই হয়েছে, বৈঠক হয়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে—কিন্তু ঘরে ফেরার পথ এখনো খোলেনি। ২৫ আগস্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোও একই বাস্তবতার কথা বলছে। প্রশ্নটি তাই এখন শুধু রোহিঙ্গাদের নয়। উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় মানুষও জানতে চান—এই সংকটের শেষ কোথায়?

রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া ছিল মানবিকতার পরিচয়। কিন্তু একটি অস্থায়ী আশ্রয় যখন বছরের পর বছর স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন তার প্রভাব শুধু আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উখিয়া-টেকনাফের জনজীবন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় সেই চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাটিও স্বাভাবিক—রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু সেই ‘ফিরে যাওয়া’ কথাটিই এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন!

তালিকা এগোয়, মানুষ ফেরে না

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাইয়ের কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ আগস্টের বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা দিয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সংখ্যাগুলো শুনলে অগ্রগতির ছবি মনে হতে পারে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—যাদের তথ্য যাচাই শেষ হয়েছে, তাদের একজনও কি নিরাপদে, টেকসইভাবে নিজের ঘরে ফিরতে পেরেছেন? উত্তরটি এখনো না।

এখানেই কাগজের অগ্রগতি আর বাস্তবের অগ্রগতির পার্থক্য। যাচাই করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু প্রত্যাবাসিত মানুষের সংখ্যা শূন্য। মিয়ানমার বলছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে যাচাই করা ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়া হবে। কিন্তু কবে সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই।

অর্থাৎ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু প্রত্যাবাসন নিজেই শুরু হয়নি। এটি নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব নয়। নয় বছর ধরে চলা একটি আন্তর্জাতিক সংকটের ক্ষেত্রে এটি এখন রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রশ্নও বটে।

যুদ্ধই এখন সবচেয়ে বড় বাধা

২০১৭ সালের পর রাখাইনের পরিস্থিতি যে জায়গায় ছিল, এখন আর সেখানে নেই। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা বদলে গেছে। ফলে প্রত্যাবাসন নিয়ে আগের হিসাব-নিকাশও আর যথেষ্ট নয়।

মিয়ানমার বলছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে প্রত্যাবাসন এগোবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—স্থিতিশীলতা ফিরবে কবে? কে সেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে? আর প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাই বা কে দেবে? যুদ্ধের মধ্যে মানুষকে ফেরত পাঠানো যায় না। শুধু সীমান্ত পার করিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয় না।

নাগরিকত্বের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই

রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে নাগরিকত্বের প্রশ্ন। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছে। নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার নিশ্চিত না হলে তারা আবারও বৈষম্য ও অনিরাপত্তার মধ্যে পড়বেন না—তার নিশ্চয়তা কোথায়? নিরাপদ প্রত্যাবাসন মানে শুধু সংঘাতের গুলি থেকে বেঁচে থাকা নয়। নিরাপদ মানে নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিজের ভূমিতে ফেরার অধিকার, বাড়িঘর ও সম্পত্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়েও পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। ফলে প্রত্যাবাসনের সঙ্গে নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই শুধু ‘কতজনকে ফেরত নেওয়া হবে’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হতে হবে—কী শর্তে তারা ফিরবেন এবং ফিরে গিয়ে কী অধিকার পাবেন?

নতুন আগমন, পুরোনো সংকট

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুরোনো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হয়নি; এর মধ্যেই রাখাইনের সংঘাত নতুন করে বাস্তুচ্যুতি তৈরি করেছে। ২০২৩-পরবর্তী লড়াইয়ের কারণে আরও মানুষ বাংলাদেশে এসেছে। ফলে ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশ এমন একটি সংকট বহন করছে, যার সমাধান হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে তার পরিধি বেড়েছে।

এই বাস্তবতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাপও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উখিয়া-টেকনাফের মানুষ বছরের পর বছর মানবিকতার জায়গা থেকে এই সংকটের বোঝা বহন করছেন। কিন্তু তাঁদের অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় সেবা, শ্রমবাজার ও নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে—সেই প্রশ্নও জাতীয় নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

অর্থ আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তে স্থানীয় কণ্ঠ কতটা?

রোহিঙ্গা মানবিক সাড়ার আরেকটি বড় দুর্বলতা অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো। চলতি বছরে কোস্ট ফাউন্ডেশনের স্থানীয়করণ বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, রোহিঙ্গা সমন্বয় কাঠামোয় জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব ৫৪ শতাংশ; আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় এনজিও—প্রতিটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ১৫ শতাংশ করে। আটটি প্রধান সেক্টরের নেতৃত্বই জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হাতে; স্থানীয় কোনো এনজিওর সেক্টর লিড বা কো-লিডারশিপ নেই। অর্থের ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য দেখা যায়।

চলতি বছরের এক গবেষণায় যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে ৮৭.৯৬ শতাংশ তহবিল, আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছে ৭.৭৮ শতাংশ এবং জাতীয় এনজিওগুলোর কাছে ৪.২৬ শতাংশ রয়েছে; স্থানীয় এনজিওগুলোর সরাসরি অংশ শূন্য। ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ক্যাম্পে অনুমোদিত ৬৩টি প্রকল্পের মধ্যে স্থানীয় এনজিওর প্রকল্প ছিল মাত্র তিনটি। মোট অর্থায়নের মাত্র ২.৫ শতাংশ গেছে স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে। এখানে প্রশ্নটি খুব সরল—যারা সংকটের সবচেয়ে কাছাকাছি, সিদ্ধান্ত ও অর্থের কাঠামোতে তাদের জায়গা এত ছোট কেন?

কোস্ট ফাউন্ডেশনের গবেষণা স্থানীয় এনজিওর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, সেক্টর পর্যায়ে কো-লিডারশিপ চালু করা এবং স্থানীয় সংস্থার জন্য সরাসরি তহবিলের অংশ অন্তত ২৫ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। এটি শুধু স্থানীয় এনজিওর দাবি নয়। এটি মানবিক সাড়াকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন।

২৫ আগস্ট শুধু স্মরণের দিন নয়

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট যে মানুষগুলো বাংলাদেশে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন সন্তান বড় করেছেন এই দেশের মাটিতে। কারও সন্তান বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ দেখেনি। তবু তাঁদের বড় একটি অংশের স্বপ্ন এখনো নিজের দেশে ফিরে যাওয়া। উখিয়ার কুতুপালংয়ে ২০১৭ সালে পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে আশ্রয় নেওয়া মোহাম্মদ আরিফুল্লাহর কথাই তার প্রমাণ। প্রাণ বাঁচাতে আট দিন হেঁটে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। এত বছর পরও তাঁর আকাঙ্ক্ষা—নিজের দেশে ফিরে যাওয়া। এই আকাঙ্ক্ষাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ২৫ আগস্ট তাই শুধু অতীতের নির্যাতন স্মরণ করার দিন হতে পারে না। এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিনও হওয়া উচিত।

বাংলাদেশকে একদিকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট করে বলতে হবে—এই সংকটের ভার অনির্দিষ্টকাল একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ ও যৌথ প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ। সেখানে শুধু তালিকা যাচাইয়ের লক্ষ্য থাকবে না; থাকবে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা। আর সেই রোডম্যাপে রোহিঙ্গাদের মতামত যেমন থাকতে হবে, তেমনি থাকতে হবে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় মানুষের কথাও।

সবচেয়ে জরুরি কথা

রোহিঙ্গাদের শুধু ফেরত পাঠানো নয়, তাঁদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার নিশ্চিত করে ঘরে ফেরানোই হতে হবে সমাধানের লক্ষ্য। কারণ নয় বছরে একজনও প্রত্যাবাসিত হয়নি। তালিকা যাচাই এগিয়েছে, কিন্তু মানুষের ঘরে ফেরার পথ এগোয়নি। অন্যথায় প্রত্যাবাসনের আলোচনা চলবে, তালিকা যাচাই চলবে, বৈঠক হবে, নতুন প্রতিশ্রুতি আসবে—কিন্তু ঘরে ফেরা হবে না।

২৫ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই হয়তো এটাই—সময় নিজে কোনো সংকটের সমাধান করে না। সমাধানের জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরাপত্তা, অধিকার এবং বাস্তব পদক্ষেপ।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী ।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত