রোহিঙ্গা সংকটে তহবিলের বড় বৈষম্য
রোহিঙ্গা তহবিলের ৮৮ শতাংশ জাতিসংঘের হাতে, স্থানীয় এনজিওতে ৪ শতাংশেরও কম
স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবি—সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে
রোহিঙ্গা সংকট নবম বছর পেরিয়ে দশম বছরে প্রবেশ করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে বসবাস করছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বছরের পর বছর মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
তবে রোহিঙ্গা মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমে তহবিল বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও এনজিওগুলোর দাবি, সংকট মোকাবিলায় যে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে, তার সিংহভাগই যাচ্ছে জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছে। বিপরীতে স্থানীয় সংস্থাগুলো পাচ্ছে অতি সামান্য অর্থ, অথচ মাঠপর্যায়ে সংকটের সরাসরি প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদেরই।
মঙ্গলবার কক্সবাজার প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে স্থানীয় সংগঠনগুলো তহবিল ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের আরও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
‘রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের তহবিল কোথায় যাচ্ছে?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ও কোস্ট ফাউন্ডেশন।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে প্রায় ৮৮ শতাংশ
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. শাহিনুর ইসলাম। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা বা Joint Response Plan (JRP) অনুযায়ী ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা দিতে প্রয়োজন ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ তহবিল রয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে, ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছে এবং মাত্র ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ জাতীয় এনজিওগুলোর কাছে।
আর স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য JRP-তে অ্যাপিলিং পার্টনার হিসেবে কোনো তহবিল বরাদ্দ নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই কাঠামোর কারণে সংকটের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের তহবিল থেকে কার্যত বঞ্চিত হচ্ছে।
ক্যাম্পের তহবিলেও স্থানীয়দের অংশ সামান্য
শুধু JRP নয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক তহবিলেও স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশ অত্যন্ত কম বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ক্যাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ আন্তর্জাতিক এনজিও, ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ জাতীয় এনজিও এবং মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ স্থানীয় এনজিও পায়।
অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা স্থানীয় সংস্থাগুলোর হাতে সরাসরি তহবিলের অংশ খুবই সীমিত।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান এবং মাঠপর্যায়ের যোগাযোগকে কাজে লাগানো গেলে মানবিক সহায়তা আরও কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিলেও একই চিত্র
সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বরাদ্দ করা ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিলের একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, ওই তহবিলের ৯২ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো। স্থানীয় এনজিওগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ সেখানে নেই বললেই চলে।
স্থানীয় সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মানবিক সহায়তার অর্থ মূল বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানোর আগে একাধিক স্তরের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে যায়। এতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্থাগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণও সীমিত হয়ে পড়ে।
তবে তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয় ও বিভিন্ন সংস্থার প্রশাসনিক খরচের তুলনা করতে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীও সংকটে
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত থাকলেও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী একইভাবে সহায়তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল কবির বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেলেও ক্যাম্পের আশপাশে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে সেই সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
তাঁর মতে, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ তৈরি হয়েছে। তাই মানবিক সহায়তার পরিকল্পনায় স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবেশ ও কৃষিজমির ওপর চাপ
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু মানবিক খাতে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবেশ, কৃষি, পানি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন।
উখিয়া অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল আলম পরিবেশ সুরক্ষা, ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উৎপন্ন বর্জ্যের কারণে স্থানীয় কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি না থাকায় হতাশা
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো অনিশ্চিত। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলে বক্তারা জানান।
কক্সবাজার সিভিল রাইটস ফোরামের সভাপতি মো. নাছির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংকট কক্সবাজারের শিক্ষা খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সিসিএনএফের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি টেকসই সমাধান ছাড়া রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
স্থানীয় এনজিওকে সরাসরি তহবিল দেওয়ার দাবি
স্থানীয় এনজিওগুলোর প্রতিনিধিরা মানবিক সহায়তা ব্যবস্থায় তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
রোকেয়া ফাউন্ডেশনের আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি মানবিক তহবিলের অন্তত ২৫ শতাংশ সরাসরি স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় এনজিও অগ্রযাত্রার নির্বাহী পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান JRP ও পুলড ফান্ড ব্যবস্থায় স্থানীয় সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার নেই অথবা অত্যন্ত সীমিত।
তিনি স্থানীয় সংস্থাগুলোকে JRP-এর অ্যাপিলিং পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান, যাতে তারা সরাসরি মানবিক তহবিলে প্রবেশাধিকার পায়।
সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী বলেন, স্থানীয় এনজিওগুলোকে তহবিল দেওয়া কোনো দয়া নয়; বরং সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
উখিয়া ইমাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাফর আলম বলেন, সংকট সমাধানে আসিয়ান, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বক্তারা মনে করেন, শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় অংশীদারদের বাদ দিয়ে টেকসই সমাধান সম্ভব?
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বহন করছে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী। অথচ তহবিল ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত।
তাদের মতে, স্থানীয় সংস্থাগুলোকে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের সহযোগী হিসেবে না দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তহবিল ব্যবস্থাপনার অংশীদার করতে হবে।
কারণ স্থানীয় এনজিও ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে কাজ করছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন, বাস্তবতা ও সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, বৈষম্যের প্রশ্নও তত জোরালো
২০১৭ সালে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা সংকট এখন দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিবার নতুন করে তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে—এই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে।
স্থানীয় সংগঠনগুলোর উপস্থাপিত তথ্য তহবিলের বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে এই তথ্যের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য দাতা সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এনজিও এবং স্থানীয় অংশীদারদের অর্থপ্রবাহের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তারপরও একটি বিষয় স্পষ্ট—রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, পরিবেশ, কৃষি, পানি ও স্থানীয় অর্থনীতি।
তাই স্থানীয় এনজিও ও নাগরিক সমাজের দাবি—তহবিলের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, স্থানীয় অংশীদারদের সরাসরি অর্থায়ন করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ নয় বছর ধরে চলা একটি সংকটকে আরও এক দশক ধরে টিকিয়ে রেখে শুধু তহবিল বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি মানবিক ও উন্নয়ন কাঠামো, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় সংগঠন—সব পক্ষই ন্যায্য অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হবে।
Shamiur Rahman
