৬ বছরেও শেষ হয়নি জমি অধিগ্রহণ, কবে শেষ হবে নাদুরিয়া সেতুর কাজ?
সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া ও পাবনাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার গড়াই নদীর ওপর নাদুরিয়া সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের জুনে। ২০২৩ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় বছরেও শেষ হয়নি সেতুটির নির্মাণকাজ। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজই এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে সমস্যা, নদীতে স্রোত এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণ সময় পেরিয়েও সেতুটির কাজ শেষ হয়নি।
এদিকে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া ও পাবনাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রাজবাড়ীর সঙ্গে ঝিনাইদহ ও মাগুরার দূরত্ব প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার কমে আসবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেতুর কাজ ঝুলে থাকায় দুই পাড়ের মানুষকে দুর্ভোগ নিয়ে নদী পারাপার করতে হচ্ছে।
প্রকল্পের শুরু ২০২০ সালে
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাজবাড়ী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পাংশা হেডকোয়ার্টার থেকে মাগুরা জেলার লাঙ্গলবাঁধ জিসি সড়ক পর্যন্ত গড়াই নদীর ওপর ৬৫০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সেতুটির নির্মাণকাজ পায় এম.এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড-মীর হাবিবুল আলম (জেভি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ টাকা। ২০২০ সালের ৩ জুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজ শেষ করার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৬ মাস।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো সময় শেষ হওয়ার কথা। তবে প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে এলজিইডি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
এখনো শেষ হয়নি জমি অধিগ্রহণ
সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য মোট ৬ দশমিক ৩৬৫ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়েছে। এর মধ্যে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ৩ দশমিক ৬৬৫ একর, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ২ দশমিক ৫২ একর এবং মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার ০ দশমিক ১৮ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি দেখভাল করছে সংশ্লিষ্ট জেলার রাজস্ব বিভাগ। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রক্রিয়াটি এখনো শেষ হয়নি। ফলে সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণেও বাধার সৃষ্টি হয়েছে।
নদী পারাপারে দুর্ভোগ
সরেজমিনে দেখা যায়, পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল ইউনিয়নের নাদুরিয়া ঘাটের এক পাশে রাজবাড়ী, অন্য পাশে মাগুরা জেলার লাঙ্গলবাঁধ হাট। এই দুই প্রান্তকে যুক্ত করতেই গড়াই নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে সেতুটি। নাদুরিয়া বাজার থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দক্ষিণে সেতুর প্রথম খুঁটি।
সেতুর রাজবাড়ী অংশে তখন কোনো নির্মাণসামগ্রী দেখা যায়নি। সেতুর ওপর কয়েকজন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা গেছে। মূল নদীর ওপর একটি পিলার ছাড়া বাকি পিলারগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। ১৩টি স্প্যানের মধ্যে মূল নদীতে রয়েছে ছয়টি স্প্যান। এর মধ্যে চারটি স্প্যান বসানোর কাজ এখনো বাকি।
অন্যদিকে সেতুর ঝিনাইদহ অংশে সংযোগ সড়কের কাজ চলছে। নদীতে বর্তমানে প্রচণ্ড স্রোত থাকায় নাদুরিয়া ঘাট দিয়ে ট্রলারে করে মানুষ, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও বিভিন্ন পণ্যবাহী ভ্যান পারাপার হচ্ছে।
‘মাঝে মাঝে কাজ শুরু হয়, আবার থেমে যায়’
নাদুরিয়া ঘাট দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লাঙ্গলবাঁধ যাচ্ছিলেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই সেতুর কাজ হচ্ছে। কিন্তু শেষ হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে সরকারের বিভিন্ন লোকজন এসে তদারকি করেন। তখন মনে হয় কাজ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আবার কাজ থেমে যায়।’
জমির টাকা না পাওয়ার অভিযোগ
আকতার মন্ডল নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমাদের তিন ভাইয়ের মোট ৩৮ শতাংশ জমির মধ্যে ৩৭ শতাংশই এই ব্রিজের জন্য নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত আমরা কোনো টাকা পাইনি। আমাদের শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। রাজবাড়ী গিয়ে আমরা সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। এখন এখানকার জমির মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। সরকার যেন আমাদের ন্যায্য দাম দেয়।’
গার্ডার ভেঙে বন্ধ ছিল কাজ
সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রতাপ গুণ বলেন, ‘আমি নয় মাস ধরে এই দায়িত্বে আছি। এর আগে নির্মাণাধীন সেতুর একটি গার্ডার ভেঙে পড়েছিল। এরপর থেকে কাজ বন্ধ ছিল। নদীতে প্রচুর স্রোত থাকায় কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া সংযোগ সড়ক না থাকায় নির্মাণসামগ্রী আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে নতুন করে আবার কাজ শুরু হচ্ছে। ঝিনাইদহ অংশের সংযোগ সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। গার্ডার তৈরির মালামালও চলে এসেছে। দ্রুতই গার্ডার নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’
মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন
রাজবাড়ী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ হাসান বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ না হওয়ার কারণে সেতুর কাজ শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা যাচ্ছে না। তবে ঝিনাইদহ অংশের সংযোগ সড়কের কাজ চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজবাড়ীর অংশের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে।’
ছয় বছর ধরে নির্মাণকাজ চললেও কবে নাগাদ নাদুরিয়া সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। ফলে সেতুর অপেক্ষায় থাকা দুই পাড়ের মানুষের প্রশ্ন—আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
Shamiur Rahman
