জনবল দ্বিগুণ করে দুদককে শক্তিশালী করা হচ্ছে
শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, কমিশনের বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজিয়ে জনবল দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে নতুন কমিশন। একইসঙ্গে অনুসন্ধান থেকে মামলা পরিচালনা পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে
দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে বিদ্যমান জনবল দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিয়েছে নতুন কমিশন। অনুমোদিত ২ হাজার ১৪৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৬৫ জন। অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ পদই শূন্য। বিপুলসংখ্যক দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা সামলাতে গিয়ে সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তার ওপর বাড়ছে কাজের চাপ। বিশেষ করে দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বড় ধরনের শূন্যতা থাকায় কাঙ্ক্ষিত গতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই অবস্থায় শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, কমিশনের বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজিয়ে জনবল দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে নতুন কমিশন। একইসঙ্গে অনুসন্ধান থেকে মামলা পরিচালনা পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
দুদকের সরকারি জনবল কাঠামো অনুযায়ী কমিশনের প্রধান কার্যালয়, আটটি বিভাগীয় কার্যালয় এবং ৩৬টি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের জন্য মোট ২ হাজার ১৪৬টি পদ অনুমোদিত। এর মধ্যে ১ হাজার ১৯৮টি পদ প্রধান কার্যালয়ে, ১২০টি বিভাগীয় কার্যালয়ে এবং ৮২৮টি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের জন্য নির্ধারিত। বিদ্যমান কাঠামোর হিসাবে কর্মরত আছেন ৮৬৫ জন এবং শূন্য রয়েছে ১ হাজার ২৮১টি পদ। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় ৬০ শতাংশই শূন্য রয়েছে।
দুদকের জনবল কাঠামোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সহকারী পরিচালক পদে ২২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। উপসহকারী পরিচালক পদে ২৮৯, উপ-পরিচালকের ১১৫ এবং কোর্ট পরিদর্শকের ৩৩টি পদ শূন্য রয়েছে।
দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানটির জনবল কাঠামোর সঙ্গে কাজের পরিধির বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। দুদকের কাছে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বছরে দুদকে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়লেও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১ হাজার ৬৩টি অভিযোগের। একই সময়ে মামলা হয় ৫৪১টি এবং চার্জশিট দেওয়া হয় ৩৪৯টি।
দুদকের জনবল কাঠামোতে দেখা যায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ও তদন্ত পদগুলোতেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। জনবল কাঠামোয় উপ-পরিচালকের ১৯১টি পদের বিপরীতে কর্মরত
৭৬ জন এবং সহকারী পরিচালকের ৩৩১টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১০৬ জন। একইভাবে উপসহকারী পরিচালকের ৩৫৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৬৮ জন। অর্থাৎ শুধু এই তিন গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান-তদন্ত পদেই অনুমোদিত ৮৭৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫০ জন। অর্থাৎ অনুসন্ধান ও তদন্তে ক্ষমতা থাকা কর্মকর্তার ছয় শতাধিক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে অনুসন্ধান ও তদন্তের বড় অংশ সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে নিজস্ব প্রসিকিউশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা থাকলেও গত ২২ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও দুদকের জনবল সাংগঠনিক কাঠামোয় প্রসিকিউটরের ১০টি পদ থাকলেও কোনো পদে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অস্থায়ীভিত্তিক প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে বিচারিক ও উচ্চ আদালতে দুর্নীতির মামলাগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের মামলা পরিচালনা ও বিচারিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তদন্তের পাশাপাশি দক্ষ প্রসিকিউশন ব্যবস্থা না থাকলে দুর্নীতির মামলায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি দুদকে দলীয় বিবেচনায় অস্থায়ীভিত্তিক প্যানল আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। এতে করে দুদকের মামলায় রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গত ১৯ আগস্ট নতুন কমিশনের যোগদানের পরই বিদ্যমান জনবল কাঠামো বড় করার উদ্যোগ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রথম বৈঠকগুলোয় বর্তমান জনবল দ্বিগুণ করার বিষয়ে আলোচনা ও ঐকমত্যের কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। ওই বৈঠকে উপ-পরিচালক থেকে তার ওপরের সব কর্মকর্তা অংশ নেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
জনবল দ্বিগুণ করলেই দুদকের সক্ষমতা দ্বিগুণ হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ দুদকের কাজের বড় অংশই অত্যন্ত কারিগরি ও বিশেষায়িত মন্তব্য করে জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ শাহজাহান সাজু বলেন, দুদক যেহেতু অবৈধ সম্পদ, ব্যাংকিং জালিয়াতি, সরকারি ক্রয়, প্রকল্প দুর্নীতি, অর্থপাচার, কর ফাঁকি, কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম এবং ডিজিটাল লেনদেনের মতো বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে থাকে, সেহেতু এসংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তে আর্থিক বিশ্লেষক, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তার সমন্বিত দক্ষতার লোকজনের প্রয়োজন। জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
গত বছর থেকে দুদক বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৫-২৬ সালে সহকারী পরিচালক, উপসহকারী পরিচালক, কোর্ট পরিদর্শক, কনস্টেবল, অফিস সহায়কসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে কনস্টেবল ও অফিস সহায়ক পদে ১০১ জন নিয়োগের প্রক্রিয়া নেওয়া হয়। তবে এসব বিচ্ছিন্ন নিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিশাল শূন্যতা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এই বিষয়ে দুদকের এক দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নতুন কমিশন মনে করে, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবেই কাজ করতে চায়। আপাতত নিজস্ব জনবল বৃদ্ধি করতে বর্তমান জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান জনবল কাঠামোও নতুন করে তৈরি করা হবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায়ও জোর
নতুন কমিশনের পরিকল্পনায় জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি অনুসন্ধান থেকে প্রসিকিউশন পর্যন্ত কাজকে প্রযুক্তিনির্ভর করার বিষয়ও রয়েছে। দুদকের প্রশাসন অনুবিভাগের কার্যক্রমের তালিকায় ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা আইপিএমএস চালুর বিষয়টি রয়েছে। একইসঙ্গে ফরেনসিক ল্যাব, ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং বিভিন্ন নীতিমালা আধুনিকায়নের বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা গেলে একটি অভিযোগ কখন জমা পড়েছে, কীভাবে যাচাই হয়েছে, অনুসন্ধানের দায়িত্ব কার কাছে গেছে, তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং মামলার বর্তমান অবস্থা কী— এসব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
Shamiur Rahman
