১২১ টন পন্যের নামে খালি কনটেইনার জব্দ
ভ্যালমন্টের ৪ লাখ ৩৮ হাজার ডলারের ভুয়া রপ্তানি রুখে দিলো কাস্টমস গোয়েন্দা
ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি চালানে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি বা প্রায় ১২১ টন পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়। কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে এসব পণ্যের ঘোষিত মূল্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা)
কনটেইনারে বাস্তবে কোনো পণ্যই নেই, অথচ কাগজে-কলমে চার লাখ আটত্রিশ হাজার মার্কিন ডলারের রপ্তানি দেখানো হয়ে গেছে। ডিপোতে পণ্য প্রবেশের আগেই সম্পন্ন হয়ে গেছে কাস্টমসের সব আনুষ্ঠানিকতা। এমনই একটি চাঞ্চল্যকর অনিয়ম সম্প্রতি রুখে দিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানির তথ্য নথিভুক্ত থাকলেও সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে সরেজমিন গিয়ে সেই পণ্যের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআর জানায়, ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি চালানে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি বা প্রায় ১২১ টন পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়। কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে এসব পণ্যের ঘোষিত মূল্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা)।
গত তিন সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) রপ্তানি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে কনসাইনমেন্ট যাচাইয়ের সময় এই পাঁচটি চালান প্রথম কাস্টমস গোয়েন্দার নজরে আসে। প্রাথমিক পর্যালোচনাতেই রপ্তানির গন্তব্য দেশ, পণ্যের ধরন এবং ঘোষিত মোট ওজনের মধ্যে অস্বাভাবিক গরমিল লক্ষ করা যায়, যার ভিত্তিতে চালানগুলো আটক করে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই শুরু করা হয়।
উল্লেখ্য, দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান রপ্তানি বাজার মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এছাড়া জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু আলোচিত এই পাঁচটি চালানের ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইন—যা স্বাভাবিক রপ্তানি প্রবণতার সঙ্গে না মেলায় গোয়েন্দাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, বন্ডেড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি গত এক বছরে যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে, তার তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিমাণ স্বাভাবিক ইনপুট-আউটপুট অনুপাতের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
দাখিলকৃত রপ্তানি বিলের তথ্য অনুযায়ী পণ্যগুলো ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ডিপোতে গিয়ে পণ্য পরীক্ষার জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিলে ডিপো কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো পণ্যই দেখাতে পারেননি। উল্টো তারা জানান, রপ্তানির জন্য ঘোষিত পণ্য আদৌ ডিপোতে প্রবেশই করেনি।
পণ্য প্রবেশ না করা সত্ত্বেও কীভাবে চালানগুলোর কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, সেই বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কেউই। প্রায় একশ একুশ টন পণ্যের বিপরীতে প্রায় পাঁচ কোটি তেতাল্লিশ লাখ টাকার রপ্তানি দেখানো হলেও বাস্তবে সরেজমিন যাচাইয়ে সেই পণ্যের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পরিচালক আজিজুল হাসান বাজমিকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বিষয়টি উল্লেখ করে ই-মেইল পাঠানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত চট্টগ্রামের কাস্টমস হাউসের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রপ্তানি পণ্য প্রথমে নির্ধারিত ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে প্রবেশ করে। এরপর কাস্টমসের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও যাচাই-বাছাই শেষে রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
কিন্তু এই ঘটনায় পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করেই কীভাবে পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে গেল এবং এর নেপথ্যে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে চালান প্রস্তুত, বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল, ডিপোতে পণ্য প্রবেশ এবং কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার প্রতিটি ধাপও তদন্ত করা হচ্ছে।
এনবিআর জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড, সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য কাস্টমস আইনসহ অন্যান্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ভুয়া রপ্তানি চালানের মাধ্যমে অর্থ পাচার কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা সুবিধা অসৎ উপায়ে গ্রহণের আশঙ্কা থেকে যায়, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাতের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। এই কারণে এসব অনিয়ম চিহ্নিত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়ার তদারকি ব্যবস্থা আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
Shamiur Rahman
