মক্কা প্রতিরক্ষা জোট: বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়বে, নাকি কূটনৈতিক ঝুঁকি?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬ ০৯:১৪ পিএম

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে আলোচনা যতটা আবেগের, তার চেয়ে বেশি হওয়া দরকার কৌশলগত। প্রশ্নটি শুধু—বাংলাদেশ জোটে যাবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, গেলে বাংলাদেশ কী পাবে এবং বিনিময়ে কী দায় নেবে?

আগস্ট ২০২৬। পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক পাকিস্তান স্বাক্ষর করেছে "মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।" এই চুক্তির মূল কথাতিন দেশের কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ এটি নিছক সামরিক সহযোগিতা নয়; এর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি।

৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই কাঠামোর প্রথম কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি বৈঠক। অর্থাৎ জোটটি এখনও একেবারে নতুন; এর বাস্তব কার্যকারিতা ভবিষ্যৎ পরিসর এখনো তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হলেও বাংলাদেশের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

এখানেই মূল প্রশ্ন।  বাংলাদেশ এই পথে একেবারে নতুন নয় - মক্কা প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ২০১৫ সালে। ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সৌদি আরবের উদ্যোগে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় ইসলামিক সামরিক জোট (আইএমসিটিসি) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ছিল সেই সময়ের ৩৪টি দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের একটি। জোটটির উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদ সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলা করা। পরবর্তী সময়ে রিয়াদে এর একটি স্থায়ী কাঠামোও গড়ে ওঠে। অর্থাৎ সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো ইসলামিক সামরিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবারই প্রথম নয়।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ২০১৫ সালের উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা আর ২০২৬ সালের মক্কা চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু পারস্পরিক প্রতিরক্ষা। ২০১৫ সালের কাঠামোয় তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ, সামরিক সমন্বয় সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের ওপর জোর ছিল। ২০২৬ সালের চুক্তিতে একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রয়েছে।

পার্থক্যটি ছোট নয়। তাই ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি হওয়া উচিতআগের সহযোগিতামূলক কাঠামোর তুলনায় এবার বাংলাদেশের দায় কতটা বাড়বে, আর সেই বাড়তি দায়ের বিনিময়ে নিরাপত্তা লাভ কতটা হবে?

বাংলাদেশ কী পেতে পারে?

প্রথমত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন সুযোগ। তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা শিল্প, পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কৌশলগত সক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, সাইবার নিরাপত্তা সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন দরজা খুলতে পারে। চুক্তির কাঠামোয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সামরিক সমন্বয়, প্রযুক্তি উৎপাদন সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়তে পারে। সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার অর্থনৈতিক অংশীদার। নিরাপত্তা সম্পর্ক গভীর হলে তার প্রভাব বিনিয়োগ, জ্বালানি, শ্রমবাজার অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও পড়তে পারে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বৈচিত্র্য আসতে পারে। একাধিক দেশের সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকলে কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব। কিন্তু জোটে যোগ দেওয়া মানেই শুধু সুবিধা নেওয়া নয়; দায়ও নেওয়া। 

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ভারত

বাংলাদেশের জন্য মক্কা জোটের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক সম্ভবত এখানেই। ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী। দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরসবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এড়িয়ে চলার মতো নয়। অন্যদিকে মক্কা জোটের অন্যতম সদস্য পাকিস্তান ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।

তাই বাংলাদেশ যদি এমন একটি সামরিক কাঠামোয় যোগ দেয়, যেখানে পাকিস্তান সদস্য কিন্তু ভারত বাইরে, নয়াদিল্লি সেটিকে শুধু বাংলাদেশের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখবেএমন নিশ্চয়তা নেই।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মতো অংশীদারদের সঙ্গেও কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা তৈরি করতে পারে। তবে এটিও পরিষ্কারবাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত ভারতের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের ভূগোল কৌশলগত গুরুত্বও অস্বীকার করা যাবে না। কারণ ভূরাজনীতিতে প্রতিবেশীকে পাশ কাটানো যায় না। 

অন্যের যুদ্ধ কি বাংলাদেশের যুদ্ধ হবে?

এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সৌদি আরবের নিরাপত্তা বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। তুরস্কের নিরাপত্তা স্বার্থ তার আশপাশের একাধিক সংঘাত ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাস্তবতা আবার ভারত, আফগানিস্তান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে ঘিরে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার আলাদা—সীমান্ত স্থিতিশীলতা, বঙ্গোপসাগর, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, জলবায়ু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারেসৌদি আরবের যুদ্ধ কি বাংলাদেশের যুদ্ধ হবে? পাকিস্তানের যুদ্ধ কি বাংলাদেশের যুদ্ধ হবে? তুরস্কের কোনো আঞ্চলিক সংঘাত কি বাংলাদেশের সামরিক দায় হয়ে দাঁড়াবে? চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানেই। কারণ এর ঘোষিত নীতিই হলোএক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা  করা। অতএব, বাংলাদেশকে আগে জানতে হবেএই বাধ্যবাধকতা বাস্তবে কতদূর পর্যন্ত যাবে।

জোট নয়, নিরাপত্তা সহযোগিতা: বাংলাদেশের মধ্যপথ

বাংলাদেশের জন্য হয়তো সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হবে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা- বদলে সম্মিলিত নিরাপত্তা সহযোগিতা—অর্থাৎ কোনো পক্ষের হয়ে যৌথ যুদ্ধে যাওয়ার প্রতিশ্রুতির বদলে নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি নমনীয় কাঠামো। এর আওতায় বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শান্তিরক্ষা, প্রতিরক্ষা শিল্প মানবিক উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে পারে। 

কিন্তু কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশের যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েএই স্বাধীনতা থাকা জরুরি। সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সংঘাতের দায় স্বয়ংক্রিয় হবে না। বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাও থাকবে। এটাই হতে পারে বাংলাদেশের বাস্তবসম্মত মধ্যপথ।

সিদ্ধান্তের আগে পাঁচটি প্রশ্ন

বাংলাদেশের উচিত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত পাঁচটি মৌলিক প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর চাওয়া।

প্রথমত, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা কী?

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ কি প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী পাঠাতে বাধ্য হবে?

তৃতীয়ত, সদস্যদের সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশের সংঘাতে বাংলাদেশ কি নিরপেক্ষ থাকতে পারবে?

চতুর্থত, এই জোটে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়বে?

পঞ্চমত, চুক্তিটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধুবন্ধুত্ববামুসলিম বিশ্বের ঐক্যদিয়ে একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া ঠিক হবে না।

শেষ কথা

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মাত্র ২৪ দিনের পুরোনো। এর ভবিষ্যৎ এখনো তৈরি হচ্ছে। ৩১ আগস্টের ইস্তাম্বুল বৈঠক সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রাথমিক ধাপ। বাংলাদেশের জন্য এটি সুযোগ হতে পারে। আবার  ভুলভাবে পরিচালিত হলে এটি কূটনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের উচিত নয় কোনো বৃহৎ প্রতিবেশীকে খুশি করতে গিয়ে জোটে যোগ দেওয়া। আবার কোনো প্রতিবেশীকে চ্যালেঞ্জ জানাতেও জোটে যাওয়া উচিত নয়। কেন্দ্রে থাকতে হবে বাংলাদেশকে। সৌদি আরব বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে, তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইরান অন্য অংশীদারদের সঙ্গেও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ কোনো একটি সামরিক জোট নয়সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা।

মক্কা জোটে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত যাবে কি না, সেটি সময়ের সঙ্গে নির্ধারিত হবে। কিন্তু যাওয়ার আগে একটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরিবাংলাদেশ যেন নিরাপত্তার অংশীদার হয়, কারও ভূরাজনৈতিক খেলায় ঘুঁটি না হয়। কারণ বন্ধুত্ব বাড়ানো যায়, জোটও করা যায়; কিন্তু কৌশলগত স্বাধীনতা হারালে সেটি ফিরে পাওয়া অনেক কঠিন।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত