অটোরিকশা - ঢাকার রাস্তায় একটি চলন্ত মরণফাঁদ
সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য এই যানটি নিম্নআয়ের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হয়ে উঠলেও নীতি, নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি একে ক্রমেই পরিণত করছে চলন্ত মরণফাঁদে
নগরবাসীর জীবন সহজ করার কথা বলে যে যানটি একসময় রাজধানীর অলিগলিতে জায়গা করে নিয়েছিল, আজ সেটিই অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার শুধু ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করছে না, বাড়িয়ে তুলছে দুর্ঘটনা ও জননিরাপত্তার ঝুঁকিও।
সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য এই যানটি নিম্নআয়ের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হয়ে উঠলেও নীতি, নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি একে ক্রমেই পরিণত করছে চলন্ত মরণফাঁদে।
নীতির বাইরে নগর দখল
গত কয়েক বছরে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অনুমোদিত যানবাহনের তুলনায় বাস্তবে চলাচলকারী অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেশি—এমন অভিযোগ রয়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। অসংখ্য অটো গ্যারেজে রাতভর চার্জ দিয়ে সকালে কোনো ধরনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নেমে পড়ছে সড়কে।
অটোরিকশার জনপ্রিয়তার পেছনে অবশ্য বাস্তবতাও রয়েছে। স্বল্প ভাড়া, সহজলভ্যতা এবং বাসাবাড়ি থেকে বাজার, অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে যাওয়ার সুবিধার কারণে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের কাছে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। অনেক এলাকায় গণপরিবহনের বিকল্প না থাকায় ১০-২০ টাকার যাত্রায় মানুষ বাধ্য হয়েই অটোরিকশার ওপর নির্ভর করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি মহানগরের পরিবহনব্যবস্থা কি চাহিদা ও বাজারের স্বাভাবিক নিয়মে, কোনো সমন্বিত নীতি ও পরিকল্পনা ছাড়াই একটি যানকে এতটা বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে?
দুর্ঘটনার পেছনে তিন প্রধান কারণ
প্রতিদিনই রাজধানী ও এর আশপাশে অটোরিকশা দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব দুর্ঘটনার পেছনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করছে—অদক্ষ চালক, আইন না মানার প্রবণতা এবং নিম্নমানের যান্ত্রিক ব্যবস্থা।
প্রথমত, চালকদের বড় একটি অংশের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। অভিযোগ রয়েছে, অল্পবয়সী কিশোররাও অনেক ক্ষেত্রে ভারী ব্যাটারিচালিত যান নিয়ে ব্যস্ত সড়কে চলাচল করছে। তাদের অনেকেরই নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, নেই সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা। অথচ এসব যান দ্রুতগতিতে চলতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ হারালে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলা, ফুটপাত ব্যবহার, ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ ইউটার্ন কিংবা যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা—এসব আচরণ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে। এতে শুধু অটোর যাত্রী নয়, পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন।
তৃতীয়ত, যান্ত্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। স্থানীয়ভাবে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত অনেক অটোরিকশায় যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ, ব্রেকিং ব্যবস্থা, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, দুর্বল টায়ার, ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক কিংবা বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পথচারী
অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শুধু যাত্রী নন; পথচারীরাও ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে গড়ে উঠছে অটোরিকশার অস্থায়ী স্ট্যান্ড। ফলে পথচারীদের অনেক সময় ফুটপাত ছেড়ে মূল সড়কে হাঁটতে হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে, যানজটের মধ্যে অটোরিকশার এলোমেলো চলাচল অন্যান্য যানবাহনের গতিও ব্যাহত করছে। একটি অটোরিকশাকে পাশ কাটাতে গিয়ে বাস, প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেল চালক হঠাৎ দিক পরিবর্তন করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। জরুরি সেবা—বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স—যানজটে আটকে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
চার্জিং ব্যবস্থাও বড় ঝুঁকি
অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিত চার্জিংয়ের সমস্যাও। আবাসিক এলাকা, গ্যারেজ কিংবা দোকানের বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, অতিরিক্ত লোড, নিম্নমানের তার ও ব্যাটারি থেকে শর্টসার্কিট কিংবা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও একসঙ্গে অনেক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় পুরো ভবন ও আশপাশের বাসিন্দারাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু যানজট বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি এখন নগর নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার প্রশ্নও।
অভিযান হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয় না
অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হয়। কিছু যান জব্দ করা হয়, জরিমানাও করা হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
এর পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি মানবিক বাস্তবতাও। অটোরিকশা চালিয়ে হাজারো মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক পরিবার সরাসরি এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু মানুষের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—জীবিকার অধিকার কি অন্য মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার অনুমতি দিতে পারে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো একদিকে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নাগরিকের নিরাপদ চলাচলের অধিকার রক্ষা করা। একটি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্যটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সমাধান নিষেধাজ্ঞায় নয়, কার্যকর নিয়ন্ত্রণে
অটোরিকশা একদিনে বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ এই খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। প্রয়োজন একটি বৈজ্ঞানিক, বাস্তবসম্মত ও মানবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
প্রথমত, অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করতে হবে। প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভারে এর চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করে পাড়া-মহল্লার সংযোগ সড়কে নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালু করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রতিটি অটোরিকশার নিবন্ধন, নম্বরপ্লেট, ফিটনেস পরীক্ষা এবং চালকের প্রশিক্ষণ ও অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে অটোরিকশা চালানো সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। চালকের ন্যূনতম বয়স, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা পরীক্ষার বিষয়টি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
চতুর্থত, আবাসিক ভবন বা অনিরাপদ গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জিং বন্ধ করে নির্দিষ্ট নিরাপদ চার্জিং জোন তৈরি করা যেতে পারে। এসব কেন্দ্রে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত লোড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, অটোরিকশা চালকদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বৈধভাবে এই পেশায় থাকতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ, সহজ কিস্তিতে নিরাপদ ই-ভেহিকল কিংবা অন্যান্য অনুমোদিত পরিবহন ব্যবস্থায় স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
এখনই সিদ্ধান্তের সময়
ঢাকার মতো একটি জনবহুল মহানগরের রাস্তায় পরিবহনব্যবস্থা যদি আইন, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বাইরে চলে যায়, তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য।
আমরা গরিব মানুষের পেটে লাথি মারার পক্ষে নই। কিন্তু কয়েক লাখ মানুষের জীবিকার যুক্তিতে কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়াও কোনো সভ্য নগর ব্যবস্থার সমাধান হতে পারে না।
সরকার, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে বসে অটোরিকশার জন্য দ্রুত একটি কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
কারণ প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘অটোরিকশা চলবে কি চলবে না’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, অটোরিকশা চলবে—কিন্তু কতটা নিরাপদে, কোথায়, কী নিয়মে এবং কার জবাবদিহির মধ্যে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। নইলে ঢাকার প্রতিটি ব্যস্ত মোড়, প্রতিটি ফুটপাত এবং প্রতিটি সড়ক হয়ে উঠতে পারে আরও একটি দুর্ঘটনার অপেক্ষমাণ স্থান।
আর কত প্রাণ গেলে আমরা বুঝব—নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা শুধু যানজট নয়, এটি একটি জননিরাপত্তা সংকট?
Shamiur Rahman
