৬০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধ

‘‘কারখানার চাকা থামছে, রোগীর চিকিৎসা যাবে কোথায়?"

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:২০ এএম

৬০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধের খবর শুধু শিল্পের সংকট নয়; এটি রোগী, হাসপাতাল ও বাংলাদেশের একটি সফল রপ্তানি খাতের জন্য অশনি সংকেত!

একজন মানুষ প্রেসক্রিপশন হাতে ওষুধের দোকানে গেলেন। দোকানি বললেন, ওষুধটি নেই। অন্য একটি ব্র্যান্ড আছে, তবে দাম বেশি ! এখনও হয়তো তিনি কোনোভাবে সেটি কিনে নেবেন। কিন্তু দামটা যদি তাঁর সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়? তখন তিনি হয়তো একটি ওষুধ বাদ দেবেন। পরে আরেকটি। চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থাকবে। রোগ জটিল হবে। শেষ পর্যন্ত যে খরচ বাঁচাতে তিনি ওষুধ কেনেননি, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা হয়তো হাসপাতালের বিছানায় গিয়ে খরচ করতে হবে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংকটকে তাই শুধু ওষুধের বাজারের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ওষুধের সরবরাহ কমে গেলে তার শেষ অভিঘাত পড়ে রোগীর শরীরে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি) জানিয়েছে, দেশের ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব ওষুধের দাম সমন্বয় না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন করে লোকসান হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। খবরটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই সংকট কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, বিষয়টি নিয়ে কি ভেবেছেন না এখানেও ঔষধ কার্ডের মাধ্যমে সমাধান করতে চান !

কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই, ওষুধ উৎপাদন হবে কীভাবে? ওষুধ তৈরি হয় কেবল কাঁচামাল দিয়ে নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কারখানাকে জেনারেটর, ইউপিএস কিংবা ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

জ্বালানি ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে সেই ব্যয় ওষুধের দামে সমন্বয় করার চাপ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এদিকে দেশের শিল্পখাত সামগ্রিকভাবেই গ্যাসের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানাচ্ছে। কিছু কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার খবরও এসেছে। ওষুধশিল্পের জন্য বিপদটি এখানে আরও বড়। কারণ অন্য কোনো পণ্য আজ কম উৎপাদিত হলে বাজারে কিছুদিন অপেক্ষা করা যায়। কিন্তু একজন রোগী তাঁর প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না। কারখানার উৎপাদন কমার হিসাব শেষ পর্যন্ত রোগীর চিকিৎসার হিসাব হয়ে যায়।

দাম বাড়লে সবচেয়ে আগে বাদ পড়বে সাধারণ মানুষ ? ওষুধের দাম বাড়লে সবাই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। যার আয় বেশি, তিনি হয়তো দাম বাড়লেও একই ওষুধ কিনবেন। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। ওষুধের খরচ বাড়লে তাদের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসাই পিছিয়ে যায়। আর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধ হলে সমস্যা আরও জটিল হয়। কারণ তখন শুধু দাম বাড়ে না—বিকল্পের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে রোগীদের তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে হচ্ছে—এমন তথ্যও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। আজ একটি সস্তা ওষুধ নেই, তাই রোগী একটু বেশি দামের আরেকটি ওষুধ কিনলেন। কাল যদি সেই বিকল্পটিও বেশি দামের হয়? তারপর? চিকিৎসা কি তখন কেবল সামর্থ্যবানদের জন্য হয়ে যাবে?

হাসপাতালগুলোর ভুমিকা কি হবে ? এই প্রশ্নটি আরও জোরালোভাবে করা দরকার। ওষুধের সংকট কখনো শুধু ফার্মেসির সংকট থাকে না। হাসপাতালও তার বাইরে নয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচার, নিবিড় পরিচর্যা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। বাজারে কোনো প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি তৈরি হলে হাসপাতালের ক্রয়ব্যয় বাড়বে। সরকারি হাসপাতালকে সীমিত বাজেটের মধ্যে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হতে পারে। বেসরকারি হাসপাতাল সেই বাড়তি খরচ রোগীর বিলের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। অর্থাৎ কারখানা থেকে শুরু হওয়া সংকট শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের দরজায় পৌঁছাবে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবে একজন রোগী। তার সামনে তখন প্রশ্ন হবে না—“কোন ব্র্যান্ড ভালো?”
প্রশ্ন হবে— “এই ওষুধটা কেনার টাকা আমার আছে কি?”

রোগী বনাম ওষুধ কোম্পানি মুখোমূখি হয়ে যাবে ? : এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ওষুধ কোম্পানি ব্যবসা করে। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বছরের পর বছর কোনো পণ্য তৈরি করে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু রোগীও সেই বাড়তি খরচের শেষ আশ্রয় হতে পারে না। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, ডলারের বিনিময় হার বদলেছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, কাঁচামাল ও জ্বালানির খরচ বেড়েছে অথচ ‘বাপির’ বক্তব্য অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বর্তমান মূল্য কাঠামোর ভিত্তি ১৯৯৪ সালের নীতিতে, এবং দীর্ঘ সময়ে এসব দামের সমন্বয় হয়েছে খুব সীমিতভাবে। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— তিন দশকের পুরোনো কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের ওষুধশিল্প চালানো কতটা বাস্তবসম্মত? কিন্তু এর উত্তরও “তাহলে দাম বাড়িয়ে দিন” হতে পারে না। কারণ দাম বাড়ানোর শেষ বিলটিও তো রোগীকেই দিতে হবে। রাষ্ট্রের কাজ এখানেই।

আমরা যে শিল্পটি তৈরি করেছি, সেটি শতভাগ ঝুঁকিতে পড়বে ? এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আমাদের শিল্পায়নের অন্যতম সফল গল্প। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা স্থানীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হয়। এই শিল্প এখন বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে; বিভিন্ন তথ্যসূত্রে ১৬০টির বেশি দেশের কথাও এসেছে। একসময় যে দেশ ওষুধের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেই বাংলাদেশ এখন অন্য দেশের বাজারে ওষুধ পাঠায়। এটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতার প্রমাণ। এখন যদি উৎপাদন ব্যয়ের চাপে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন বন্ধ হতে থাকে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হয়, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং উৎপাদকরা কম লাভের পণ্য থেকে সরে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ক্ষতি শুধু আজকের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উৎপাদন সক্ষমতা। তারপর বিনিয়োগ, তারপর কর্মসংস্থান, তারপর রপ্তানি। এবং একসময় বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধের জায়গা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একটি শিল্প গড়ে তুলতে কয়েক দশক লাগে। কিন্তু তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নষ্ট হতে বেশি সময় লাগে না।

সবচেয়ে অদ্ভুত বৈপরীত্য :আমরা একদিকে চাই বাংলাদেশের ওষুধ বিশ্বের আরও বেশি বাজারে যাক। চাই রপ্তানি বাড়ুক, চাই পোশাকের বাইরে নতুন রপ্তানি খাত তৈরি হোক, চাই দেশে উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প গড়ে উঠুক। অন্যদিকে সেই শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, বাস্তবসম্মত মূল্যনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই দুই নীতি পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। রপ্তানি বাড়াতে চাই, কিন্তু উৎপাদনের পরিবেশ নিশ্চিত করব না—এভাবে কোনো শিল্প এগোয় না।

এখন দরকার আতঙ্ক নয়, রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি : এখনই দেখতে হবে—কোন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধ, কেন বন্ধ, বাজারে কতদিনের মজুত আছে এবং কোন কোন ওষুধের বিকল্প বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের কাছে এই তথ্য থাকা উচিত এবং প্রয়োজন হলে তা জনসম্মুখেও প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। উৎপাদন খরচ, কাঁচামাল, জ্বালানি, বিনিময় হার—সবকিছুর পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে রোগীর ক্রয়ক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। যেসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বাজারের জন্য কম লাভজনক কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, সেগুলোর উৎপাদন ধরে রাখতে সরকারকে বিশেষ সহায়তা বা সরকারি ক্রয়ের মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হবে। আর একটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি—গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনকারী শিল্পকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ ওষুধশিল্পে জ্বালানি সরবরাহ কেবল শিল্পনীতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার অংশ।

আমরা কোন ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি? আজ বলা হচ্ছে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ। আজ রোগী বেশি দামের বিকল্প কিনছেন। আজ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু আগামীকাল কী হবে? যদি আরও উৎপাদন বন্ধ হয়? যদি আরও কোম্পানি কমদামি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ থেকে সরে যায়? যদি হাসপাতালের ওষুধের বাজেট দিয়ে আগের পরিমাণ ওষুধ কেনা না যায়? যদি রোগীর আয় না বাড়ে, কিন্তু চিকিৎসার খরচ বাড়তেই থাকে? তখন সমস্যাটি আর ওষুধশিল্পের থাকবে না। সেটি হয়ে যাবে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার সমস্যা। বাংলাদেশ যে ওষুধ নিজে তৈরি করতে পারে, সেটিই আ মাদের শক্তি। যে ওষুধ বিদেশেও বিক্রি করতে পারে, সেটিই আমাদের শিল্পের অর্জন। এই অর্জনকে বাঁচানো তাই শুধু কোম্পানির স্বার্থ নয়। আর রোগীর নাগালের মধ্যে ওষুধ রাখা শুধু রোগীর ব্যক্তিগত বিষয়ও নয়। দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। কারণ শেষ পর্যন্ত হিসাবটি খুব নির্মম।

গ্যাসের চাপ কমলে কারখানার উৎপাদন কমে, উৎপাদন কমলে বাজারে সরবরাহ কমে, সরবরাহ কমলে বিকল্প ওষুধের দাম বাড়ে,দাম বাড়লে রোগীর চিকিৎসা কমে। চিকিৎসা কমলে হাসপাতালের চাপ বাড়ে,আর শিল্প দুর্বল হলে হারায় রপ্তানি, বিনিয়োগ ও একটি জাতীয় সক্ষমতা। তাই ৬০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধের খবরকে আর কেবল একটি শিল্পসংবাদের মতো দেখলে চলবে না। এটি একটি সতর্কবার্তা- আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি এমন একটি ওষুধব্যবস্থা চাই, যেখানে কারখানা টিকে থাকবে কিন্তু রোগী কিনতে পারবেন না? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে শিল্পও টিকে থাকবে, রোগীর হাতেও ওষুধ থাকবে, হাসপাতালও সচল থাকবে এবং বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ বিশ্বের বাজারেও নিজের জায়গা ধরে রাখবে?

সিদ্ধান্তটি এখনই নেওয়া দরকার। কারণ কারখানার চাকা থামলে শুধু উৎপাদন থামে না—কোনো কোনো রোগীর চিকিৎসাও সেখানেই থেমে যেতে পারে।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত