প্যাঁচার সংসদ, চাবুকের হুইপ আর ছায়া-আলমারির মন্ত্রিসভা!

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:২৮ এএম

গণতন্ত্রের ভাষা সত্যিই বিচিত্র—এখানে প্যাঁচা আছে, চাবুক আছে, আলমারি আছে, ছায়াও আছে; শুধু নেই এসব জিনিসের আক্ষরিক ব্যবহার!

‘সংসদ’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গম্ভীর এক দৃশ্য—মাননীয় সংসদ সদস্যরা আসনে বসে আছেন, সামনে কাগজপত্র, মাইক্রোফোন, স্পিকার; চলছে আইন প্রণয়ন, বাজেট আলোচনা আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। সব মিলিয়ে বেশ গম্ভীর ব্যাপার।

কিন্তু ইংরেজি সংসদীয় পরিভাষাগুলোর আক্ষরিক অর্থের দিকে একটু তাকালেই সেই গাম্ভীর্য কোথায় যেন মিলিয়ে যায়! তখন মনে হতে পারে—এটা কোনো সংসদ নয়; বরং প্যাঁচাদের সমাবেশ, চাবুকের দোকান, ছোট আলমারির ঘর এবং তার পাশেই একটি ‘ছায়া-আলমারি’!

Parliament—সংসদ নাকি প্যাঁচাদের সমাবেশ?

প্রথমেই আসা যাক Parliament শব্দে। এর মূল সম্পর্ক আলোচনা, কথাবার্তা ও মতবিনিময়ের সঙ্গে। অর্থাৎ এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ বসে কথা বলে, বিতর্ক করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে ইংরেজিতে “a parliament of owls” কথাটিও প্রচলিত—যার অর্থ প্যাঁচাদের একটি দল।

ব্যস! এখানেই রম্য লেখকের কল্পনার পাখা মেলে ধরার সুযোগ।

ভাবুন তো, সংসদ ভবনে ঢুকতেই দেখা গেল—মাননীয় সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি কয়েক সারি প্যাঁচাও বসে আছে! কেউ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। একজন প্যাঁচা হয়তো পাশের আরেক প্যাঁচাকে বলছে—

“হুঁ… আজকের আলোচনা কি রাত পর্যন্ত চলবে?”

তখন আর সংসদকে সংসদ মনে হবে না; মনে হবে প্যাঁচাদের জাতীয় সম্মেলন!

Speaker—বক্তা নাকি সংসদের ট্রাফিক পুলিশ?

এবার আসি Speaker-এর কথায়। অভিধান বলছে, speaker মানে বক্তা—যিনি কথা বলেন।

কিন্তু সংসদের Speaker-এর কাজ শুধু বক্তৃতা দেওয়া নয়। কে কখন কথা বলবেন, কতক্ষণ বলবেন, সংসদীয় শৃঙ্খলা কীভাবে বজায় থাকবে—এসব বিষয়েও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে।

তাই তাঁকে শুধু ‘বক্তা’ বললে কিছুটা অবিচারই হয়। বরং তাঁকে সংসদের ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

“আপনি থামুন, উনি বলবেন।”

“আপনি বসুন, আপনার সময় শেষ।”

“ওদিকে নয়, এদিকে বক্তব্য দিন।”

তফাত শুধু একটাই—ট্রাফিক পুলিশ বাঁশি বাজান, আর Speaker বলেন—

“Order! Order!”

Whip—নাম শুনলেই চাবুকের ভয়!

সংসদীয় পরিভাষার সবচেয়ে রসালো শব্দগুলোর একটি হলো Whip।

বাংলায় whip মানে চাবুক।

শুনেই মনে হতে পারে, সংসদে দলীয় সিদ্ধান্ত না মানলে কোনো সংসদ সদস্যের পেছনে বুঝি চাবুক হাতে একজন দৌড়াবেন!

—“মাননীয় সদস্য, ভোট দিতে যাবেন না?”

—“না।”

—“তাহলে দাঁড়ান… চাবুকটা কোথায় গেল?”

সৌভাগ্যবশত বাস্তবে এমন কিছু হয় না।

সংসদীয় রাজনীতিতে Whip হলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক। তিনি দলের সংসদ সদস্যদের সংসদীয় কার্যক্রম ও ভোটাভুটিতে দলীয় অবস্থান সম্পর্কে সমন্বয় করেন এবং প্রয়োজনীয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন।

তবে শব্দটির ইতিহাসও বেশ মজার।

পুরোনো দিনের শিকারি দলে “whipper-in” নামে একজন থাকতেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল শিকারি দলের কুকুরগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। কোনো কুকুর দলছুট হয়ে অন্যদিকে ছুটে গেলে তাকে আবার মূল দলের মধ্যে ফিরিয়ে আনাই ছিল তাঁর কাজ।

রাজনীতিতে এসে কুকুর গেল, সংসদ সদস্য এলেন!

আগে বলা হতো—

“কুকুরটা দলছুট হয়েছে, ফিরিয়ে আনো।”

এখন বলা হয়—

“সংসদ সদস্য দলীয় অবস্থানের বাইরে চলে যাচ্ছেন, Whip তাঁকে সামলান।”

পার্থক্য শুধু এই—আগের Whip-এর হাতে চাবুক থাকার সম্ভাবনা ছিল, আর আধুনিক Whip-এর হাতে থাকে দলীয় নির্দেশনা!

Cabinet—মন্ত্রিসভা না কি ছোট আলমারি?

এরপর আসা যাক Cabinet শব্দে। শব্দটির ঐতিহাসিক অর্থের সঙ্গে ছোট কক্ষ, ব্যক্তিগত কক্ষ বা ছোট আলমারির ধারণার সম্পর্ক রয়েছে।

এবার কল্পনা করুন—দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা বড় টেবিলের চারপাশে বসে নেই। বরং প্রত্যেকে একটি করে ছোট আলমারির তাকে বসে আছেন!

অর্থমন্ত্রী নিচের তাকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝের তাকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওপরের তাকে।

প্রধানমন্ত্রী দরজা খুলে বললেন—

“সবাই আছেন?”

ভেতর থেকে উত্তর—

“জি, সবাই আছি। শুধু কৃষিমন্ত্রী একটু ফাইলের পেছনে আটকে আছেন!”

অবশ্য বাস্তবের Cabinet-এর সঙ্গে আলমারির কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক অর্থে Cabinet হলো মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত সরকারের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিষদ।জ

কিন্তু শব্দের আক্ষরিক অর্থ তো আর রম্য লেখকের কল্পনাকে আটকে রাখতে পারে না!

Shadow Cabinet—এবার ছায়া-আলমারি!

সবচেয়ে মজার জায়গাটি বোধহয় Shadow Cabinet।

Shadow মানে ছায়া, আর Cabinet মানে কেবিনেট বা আলমারি।

অতএব আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—

“ছায়া-আলমারি!”

এমন নাম শুনে কেউ ভাবতেই পারেন—এটি নিশ্চয়ই এমন একটি আলমারি, যার ছায়া আছে কিন্তু আলমারি নেই!

বাস্তবে Shadow Cabinet হলো বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের একটি কাঠামো। সেখানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুরূপ দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন এবং বিকল্প নীতি ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

অর্থাৎ এটি আলমারি নয়, ছায়াও নয়—বরং সরকারের একটি রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি।

তবে রম্য লেখকের চোখে বিষয়টি একটু অন্য রকম।

সরকারের Cabinet যদি হয় আসল আলমারি, তাহলে বিরোধীদের Shadow Cabinet হলো তার ছায়া-আলমারি। আসল আলমারিতে কী রাখা হচ্ছে, ছায়া-আলমারি তা গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করছে!

নামগুলো যদি একটু অন্য রকম হতো!

ভাবুন তো, এসব পদের নাম যদি একটু আধুনিক বাংলায় রাখা হতো—

  • Speaker → সংসদ-পরিচালক

  • Whip → দলীয় সমন্বয়ক

  • Cabinet → মন্ত্রিসভা

  • Shadow Cabinet → বিকল্প মন্ত্রিসভা

তাহলে সংসদের পরিবেশ হয়তো আরও গম্ভীর থাকত।

কিন্তু তা হলে রম্য লেখকদেরই বা কী হতো?

চাবুক থাকত না, আলমারি থাকত না, ছায়া-আলমারিও থাকত না। প্যাঁচারাও হয়তো হতাশ হয়ে গাছের ডালে ফিরে যেত!

শব্দের ইতিহাসে রাজনীতির মজার অধ্যায়

আসলে সংসদীয় রাজনীতির এসব বিচিত্র শব্দ ইতিহাসেরই উপহার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অর্থ, দায়িত্ব ও ব্যবহার বদলেছে; কিন্তু নামগুলো রয়ে গেছে।

তাই আজকের দিনে কোনো সম্মানিত সংসদ সদস্য যখন শুনবেন—

“Whip আসছেন!”

তখন যেন ভয় পেয়ে চাবুক খুঁজতে না যান।

মন্ত্রিসভায় Cabinet শুনে যেন আলমারি খুঁজতে না বসেন।

Shadow Cabinet শুনে যেন দেয়ালে ছায়া খুঁজে সময় নষ্ট না করেন।

আর Parliament শুনে যেন প্যাঁচা খুঁজতে সংসদ ভবনের ছাদে উঠে না পড়েন!

কারণ রাজনীতির অভিধানে—

Parliament প্যাঁচাদের জন্য নয়,
Whip চাবুক মারার জন্য নয়,
Speaker শুধু বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নয়,
Cabinet কাপড় রাখার জন্য নয়,
আর Shadow Cabinet কোনো ভূতুড়ে আলমারিও নয়।

তবু শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ মনে রাখলে সংসদীয় রাজনীতির গাম্ভীর্যের মাঝেও যে একটু হাসির জায়গা তৈরি হয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

গণতন্ত্রের ভাষা সত্যিই বিচিত্র—এখানে প্যাঁচা আছে, চাবুক আছে, আলমারি আছে, ছায়াও আছে; শুধু নেই এসব জিনিসের আক্ষরিক ব্যবহার!

লেখক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত