৮০ দশক থেকে ২০২৬—হারানো উষ্ণতা আর পাওয়া গতির মাঝে বাংলাদেশ

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:০৭ এএম

আশির দশক আমাদের শিখিয়েছে—কম নিয়েও কীভাবে একসঙ্গে বাঁচতে হয়। ২০২৬ আমাদের শিখিয়েছে—বেশি সুযোগ নিয়ে কীভাবে সামনে এগোতে হয়

চার দশক খুব বেশি সময় নয়। একটি প্রজন্মের জীবনকালেই এই সময় পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। অথচ ১৯৮০-এর দশকের বাংলাদেশ আর ২০২৬-এর বাংলাদেশের মধ্যে যেন কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান।

একটি বাংলাদেশ ছিল ধীরগতির—অভাব ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ছিল; কিন্তু মানুষের হাতে ছিল সময়। আরেকটি বাংলাদেশ দ্রুতগতির—প্রযুক্তি আছে, যোগাযোগ আছে, সুযোগ আছে, উন্নয়ন আছে; কিন্তু সেই ব্যস্ততার ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে সময়, সম্পর্ক আর কিছুটা মানবিক উষ্ণতা।

আশির দশক ছিল বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। স্বাধীনতার ক্ষত তখনও পুরোপুরি শুকায়নি। ১৯৮২ সালে দেশে সামরিক শাসন শুরু হয়। গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত ছিল। অর্থনীতিও ছিল নানামুখী সংকটে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষ সংস্কৃতি, সাহিত্য, গান, নাটক ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছিল।

একটি টেলিভিশন, পুরো পাড়ার আনন্দ

আশির দশকে একটি টেলিভিশন ছিল শুধু একটি পরিবারের সম্পদ নয়—অনেক সময় পুরো পাড়ার বিনোদনের কেন্দ্র।

বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভিই ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। নির্দিষ্ট সময়ে জনপ্রিয় কোনো অনুষ্ঠান শুরু হলে অনেকটা ফাঁকা হয়ে যেত রাস্তাঘাট। শুক্রবারের অনুষ্ঠান কিংবা রাতের বাংলা সিনেমা দেখতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসত। কোথাও কোথাও প্রতিবেশীরাও এসে যোগ দিতেন।

আজকের মতো ‘যখন ইচ্ছা তখন দেখা’ ছিল না। ছিল অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষারও ছিল নিজস্ব আনন্দ। একটি প্রিয় অনুষ্ঠান দেখার জন্য পুরো সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো। প্রিয় গান শোনার জন্য ক্যাসেট কিনতে হতো। চিঠির উত্তর পেতে কয়েক দিন, কখনো আরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো।

আজকের প্রজন্মের কাছে এসব হয়তো ধীরগতি। কিন্তু সেই ধীরতার মধ্যেই ছিল সম্পর্কের গভীরতা।

ক্যাসেটে বিভোর একটি প্রজন্ম

আশির দশকের সংগীত ছিল পরিবর্তনের অন্যতম বড় বাহন। ক্যাসেট প্লেয়ার আর অডিও ক্যাসেট তখন তরুণদের হাতে নতুন এক জগত খুলে দিয়েছিল।

আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, মাইলসসহ ব্যান্ডসংগীতের শিল্পীরা তৈরি করেছিলেন নতুন সংগীতভাষা। প্রেম, বিরহ, প্রতিবাদ, স্বপ্ন—সবকিছুই উঠে আসত গানের কথায়।

একটি ক্যাসেট অনেক সময় একজনের একার ছিল না। কয়েকজন বন্ধু মিলে কিনত, একজনের বাসায় শুনত, অন্যজন কপি করত। পছন্দের গান বারবার শুনতে ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করতে হতো।

আজ গান হাতের মুঠোয়। একটি ক্লিকেই হাজারো গান। ব্যক্তিগত প্লে-লিস্টে প্রত্যেকের নিজস্ব পছন্দ।

সুবিধা বেড়েছে, বৈচিত্র্য বেড়েছে। কিন্তু একসঙ্গে বসে একই গান শোনার সেই সম্মিলিত আনন্দটি অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

সাহিত্য-নাটকে মধ্যবিত্তের জীবন

আশির দশকের সাহিত্য ও নাটকও ছিল সমাজের আয়না। হুমায়ূন আহমেদের লেখায় উঠে এসেছিল মধ্যবিত্ত মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম, হতাশা ও স্বপ্ন। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর মতো作品 পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়।

টেলিভিশন নাটকেও তৈরি হয় নতুন দর্শকশ্রেণি। আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা, তৌকির, বিপাশাসহ বহু শিল্পী তাঁদের অভিনয় দিয়ে দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান।

তখন বিনোদন ছিল সীমিত, কিন্তু সেই সীমিত বিনোদন নিয়েই মানুষের মধ্যে তৈরি হতো আলোচনা। একটি নাটক নিয়ে পরদিন পাড়ায় কথা হতো। একটি গান নিয়ে বন্ধুরা তর্ক করত। একটি সিনেমার গল্প নিয়ে চায়ের দোকানে আলোচনা চলত।

আজ কনটেন্টের অভাব নেই। বরং এত বেশি কনটেন্ট যে মানুষ অনেক সময় কোনটি দেখবে, সেটিই ঠিক করতে পারে না।

তখন মানুষ কাছে ছিল, এখন পৃথিবী কাছে

আশির দশকে মোবাইল ফোন ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রশ্নই ওঠে না। একটি চিঠি পৌঁছাতে কয়েক দিন লাগত। দূরের আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টেলিফোনের সুযোগ খুঁজতে হতো। ফলে মানুষ একে অন্যের কাছে যেত।

পাড়ার মোড়ে আড্ডা, চায়ের দোকানে তর্ক, ঈদের সময় বাড়ি বাড়ি যাওয়া, বিয়েতে পুরো মহল্লার অংশগ্রহণ—সামাজিক জীবন ছিল অনেক বেশি সম্মিলিত।

২০২৬ সালে পৃথিবী হাতের মুঠোয়। মেসেঞ্জার, ভাইবার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলের মাধ্যমে মুহূর্তেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।

কিন্তু অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো—পৃথিবী কাছে এলেও অনেক সময় পাশের মানুষটি দূরে চলে গেছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকেন, তা জানি না; অথচ হাজার মাইল দূরের কারও সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ রাখি।

২০২৬-এর বাংলাদেশ: গতি, প্রযুক্তি ও সুযোগ

চার দশকে বাংলাদেশ বদলে গেছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ডিজিটাল লেনদেন, স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এখন আমাদের জীবনের অংশ। তথ্য পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েক সেকেন্ডেই খবর পৌঁছে যায়।

আশির দশকে একটি খবর জানতে হয়তো পরদিনের সংবাদপত্রের অপেক্ষা করতে হতো। এখন খবর ঘটার মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এই পরিবর্তন আমাদের অনেক বেশি স্বাধীনতা দিয়েছে। তথ্যের বিকল্প উৎস তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন করার সুযোগ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষকে নিজের কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে।

তবে এর বিপরীত দিকও আছে। তথ্য বেড়েছে, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার সময় কমেছে। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘জানি’, কিন্তু সবসময় কি ততটা ‘বুঝি’?

দ্রুততার যুগে একটি শিরোনাম দেখেই মতামত তৈরি হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও অনেক সময় দীর্ঘ আলোচনার জায়গা দখল করে নেয়।

নারীর অগ্রযাত্রা—সময়ের বড় অর্জন

এই চার দশকের সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি হলো নারীর অগ্রযাত্রা। আশির দশকে অনেক পরিবারে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা সীমাবদ্ধ ছিল বিয়ে ও সংসারকে কেন্দ্র করে। আজ নারী উদ্যোক্তা, কর্পোরেট কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটরসহ নানা পেশায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।

নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ বেড়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীর ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত।

এটি শুধু নারীর অর্জন নয়; বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

নতুন প্রজন্মের পরিচয় এখন বৈশ্বিক

আজকের তরুণ একই সঙ্গে বৈশ্বিক ও স্থানীয়। সে কে-পপ শুনছে, ইংরেজিতে মিম বানাচ্ছে, বিদেশি সিনেমা দেখছে; আবার পহেলা বৈশাখে দেশীয় পোশাক পরছে, বাংলা গান শুনছে। তার পরিচয় একক নয়—বহুমাত্রিক।

এই বৈশ্বিক সংযোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গ্রামের একজন তরুণও এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোডিং শিখতে পারে, ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে, বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

আশির দশকে যে সুযোগ কল্পনাও করা কঠিন ছিল, আজ তা হাতের মুঠোয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কী হারালাম?

উন্নয়ন ও প্রযুক্তির এই যাত্রায় আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু হারিয়েছিও।

আমরা এই সময়টিতে হারিয়েছি অপেক্ষার আনন্দ। হারিয়েছি পাড়ার আড্ডা। হারিয়েছি একসঙ্গে নাটক দেখার অভ্যাস। হারিয়েছি পরিবারের সবাই মিলে গল্প করার সময়।

আর সবচেয়ে বড় কথা—হারানোর ঝুঁকিতে আছে আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতা। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যায় প্রবীণদের জীবনে।

আশির দশকে যৌথ পরিবার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি প্রচলিত। বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকতেন। পরিবারের ব্যস্ততা কম ছিল, একসঙ্গে থাকার সুযোগ বেশি ছিল।

২০২৬ সালে একক পরিবার বাড়ছে। কর্মজীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে। সন্তানরা চাকরি বা জীবিকার প্রয়োজনে দূরে থাকছেন। ফলে অনেক প্রবীণকে ‘শান্তির নিবাস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

এটিকে শুধু ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। এটি বদলে যাওয়া সমাজের একটি বাস্তব চিত্র। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেই হবে না। প্রয়োজন মানসিক সঙ্গ, গল্প, গান, বিনোদন এবং আন্তরিক সম্পর্কের পরিবেশ।

টেলিমেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া যায়। ভিডিও কলের মাধ্যমে দূরের স্বজনকে দেখা যায়। কিন্তু দাদুর পাশে বসে গল্প শোনা কিংবা নানির হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকার অনুভূতির বিকল্প কোনো প্রযুক্তি এখনো তৈরি হয়নি।

দরকার একটি সেতু

আশির দশকে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। আর ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। কারণ সেই সময়ের সঙ্গে ছিল দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ, রাজনৈতিক সংকট, সেন্সরশিপ এবং তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা।

আবার ২০২৬-এর প্রযুক্তি ও গতির জীবন থেকেও আমরা ফিরে যেতে পারি না। তাই আমাদের প্রয়োজন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সেতু।

যে সেতুতে থাকবে আশির দশকের মানবিকতা, ধৈর্য, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মিলিত আনন্দ—আর থাকবে ২০২৬-এর প্রযুক্তি, গতি, জ্ঞান ও সুযোগ।

এই সেতু তৈরির দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রবীণদের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

আমরা নাতির হাতে স্মার্টফোন তুলে দেব, আবার তাকে দাদুর পুরোনো ক্যাসেটের গানও শোনাব। অনলাইনে যোগাযোগ রাখব, আবার প্রয়োজনে পাশের বাড়ির দরজায় কড়া নেড়ে খোঁজও নেব। বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকব, কিন্তু নিজের শিকড়ের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখব।

কারণ উন্নয়ন শুধু জিডিপি বাড়ার নাম নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনকে সহজ করা, সুযোগ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মানুষের ভেতরের মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখা।

আশির দশক আমাদের শিখিয়েছে—কম নিয়েও কীভাবে একসঙ্গে বাঁচতে হয়। ২০২৬ আমাদের শিখিয়েছে—বেশি সুযোগ নিয়ে কীভাবে সামনে এগোতে হয়।

আগামীর বাংলাদেশকে এই দুই শিক্ষা একসঙ্গে ধারণ করতে হবে। আমাদের হাতে থাকবে প্রযুক্তি, চোখ থাকবে ভবিষ্যতের দিকে—কিন্তু হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকবে অতীতের সেই উষ্ণতা।

কারণ গতি আমাদের এগিয়ে নেবে, কিন্তু মানবিকতাই ঠিক করবে—আমরা শেষ পর্যন্ত কেমন বাংলাদেশ তৈরি করব।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত