সুনিশ্চিত নয় সাংবাদিকতা পেশা!
করোনা, বন্যা, দুর্যোগে মাঠের সাংবাদিকদের ভূমিকা মানুষ দেখেছে। তাই ঘৃণার পাশাপাশি শ্রদ্ধাও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "পেশা অনিশ্চিত, কিন্তু প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। যতদিন রাষ্ট্র ও সমাজ থাকবে, সত্যের দরকার থাকবে। আর সত্য বলার লোকের দরকারও থাকবে"
এক সময় সাংবাদিকতা ছিল "চতুর্থ স্তম্ভ"। রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ — সবাইকে জবাবদিহিতার সামনে দাঁড় করানোর দায়িত্ব ছিল এই পেশার। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে: যে পেশা অন্যকে নিরাপত্তা দেয়, সেই পেশাটিই কি নিজে নিরাপদ? একজন সাংবাদিক কি এখনো নিশ্চিন্তে কলম ধরতে পারেন?
বাংলাদেশে এখন ৪০০ এর বেশি অনলাইন পোর্টাল, ৩৪টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল, ১৬০০+ পত্রিকা নিবন্ধিত। কর্মসংস্থান বেড়েছে। কিন্তু বেতন কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ৯ম ওয়েজবোর্ড ২০১৮ সালে ঘোষণা হলেও ২০২৫ সালের হিসাব বলছে, ৬০% এর বেশি প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। একজন রিপোর্টারের শুরুর বেতন ১৫-২০ হাজার টাকা। ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় তা ১০ হাজারের নিচে। অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক, "স্ট্রিংগার", "কনট্রিবিউটর" এর সংখ্যা বেড়েছে। তাদের নেই কোনো ছুটি, নেই স্বাস্থ্য বীমা।
সাংবাদিক নির্যাতনের তথ্য উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংগঠনের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, সারাদেশে ১৪৮ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ জন নিহত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২১ ও ২৫ ধারায় ২০২৩-২০২৪ এ ৭০ জনের বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলাই দুর্নীতি, স্থানীয় প্রভাবশালী ও প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জেরে দায়েরকৃত।
কাগজের দাম, বিজ্ঞাপন কমে যাওয়া এবং ফেসবুক-গুগলের কাছে বিজ্ঞাপন চলে যাওয়ায় গত ৩ বছরে ১২টির বেশি দৈনিক পত্রিকা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়েছে কয়েকটি টিভির নিউজরুম। ফলে ছাঁটাই বেড়েছে। ২০২৪ সালে এককভাবে ৩টি বড় মিডিয়া হাউজে ৪০০+ সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন।
সাংবাদিকতা এখন আর শুধু পেশা নয়, এটি টিকে থাকার লড়াই। মালিকপক্ষের চাপ, বিজ্ঞাপনের চাপ, টিআরপি'র এর চাপ উপেক্ষা করা একজন সাংবাদিকের পক্ষে ভীষন কষ্টসাধ্য। একজন রিপোর্টারকে বলা হয় "৩টি ভিডিও, ২টি নিউজ, ৫টি ফেসবুক পোস্ট প্রতিদিন চাই"। মানের চেয়ে গতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে পেশার মর্যাদা কমে, মানুষের বিশ্বাসও কমে।
মাঠের রিপোর্টার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সংবাদ করতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতা, চাঁদাবাজদের হুমকি। আইনি সহায়তা দুর্বল। মামলা হলে নিজ খরচে লড়তে হয়। মিডিয়া হাউজ অনেক সময় পাশে দাঁড়ায় না। ফলে অনেকে "স্পর্শকাতর" বিষয় এড়িয়ে যায়। ইউটিউবার, ফেসবুক পেজ, ইনফ্লুয়েন্সার — সবাই এখন "সাংবাদিক"। তথ্য যাচাই ছাড়াই ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা। এর মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হচ্ছে প্রতিদিন। আবার একই সাথে তাদের শিখতে হচ্ছে ভিডিও এডিট, ডেটা জার্নালিজম, SEO। স্কিল না থাকলে চাকরি নেই। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের চাপে অনেক সংবাদ চাপা পড়ে। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আছে, কিন্তু তা অপ্রতুল।
২০২৪ সালে মাত্র ১২০০ সাংবাদিক এককালীন সহায়তা পেয়েছেন। নিরাপত্তা না থাকলেও পেশাটি "মরে" যায়নি। বরং রূপ বদলেছে। ডেটা জার্নালিজম, ফ্যাক্ট-চেকিং, ইনভেস্টিগেটিভ পোর্টালগুলোতে তরুণরা কাজ পাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং করে বিদেশি মিডিয়ার জন্য কাজ করার সুযোগ বেড়েছে। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বাজেট বেড়েছে। ৯ম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে শ্রম আদালতে মামলার সংখ্যা বেড়েছে।
করোনা, বন্যা, দুর্যোগে মাঠের সাংবাদিকদের ভূমিকা মানুষ দেখেছে। তাই ঘৃণার পাশাপাশি শ্রদ্ধাও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "পেশা অনিশ্চিত, কিন্তু প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। যতদিন রাষ্ট্র ও সমাজ থাকবে, সত্যের দরকার থাকবে। আর সত্য বলার লোকের দরকারও থাকবে।"
সাংবাদিকতাকে সুনিশ্চিত করতে ৫ দফা করণীয়:
প্রেস কাউন্সিল ও শ্রম মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে মনিটরিং করতে হবে। যে মিডিয়া বেতন দেবে না, তার বিজ্ঞাপন ও ডিক্লারেশন বাতিলের বিধান।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন দ্রুত পাস করতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে SLAPP মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল।
সাংবাদিকদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশন স্কিম চালু। চুক্তিভিত্তিকদেরও এর আওতায় আনা।
NBR, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, ডেটা — এই বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। তাহলে সাংবাদিকের বাজারমূল্য বাড়বে।
একটি মিডিয়া হাউজের আয়-ব্যয়, বিজ্ঞাপন-ঋণের তথ্য পাবলিক করা। যাতে সাংবাদিকরা জানতে পারে তার প্রতিষ্ঠান কতটা টেকসই। সাংবাদিকতা পেশা এখনো "সুনিশ্চিত" হয়নি। এটি এখনো অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও আপোষের নাম। বেতন অনিশ্চিত, নিরাপত্তা অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিন্তু একই সাথে এটি এখনো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পেশা।
কারণ একটি দুর্নীতির খবর, একটি নদী দখলের রিপোর্ট, একটি শিশুর গল্প — এগুলো ছাড়া গণতন্ত্র অন্ধ হয়ে যায়।
তাই প্রশ্ন "পেশা সুনিশ্চিত কিনা" তা নয়। প্রশ্ন হলো, "আমরা কি এই পেশাকে সুনিশ্চিত করতে চাই?"
যদি উত্তর "হ্যাঁ" হয়, তাহলে রাষ্ট্র, মালিক, পাঠক এবং সাংবাদিক — সবাইকে মিলে এই স্তম্ভটাকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে একদিন দেখা যাবে, খবর আছে, কিন্তু খবরদার নেই।
Shamiur Rahman
