'সম্পূর্ণ অর্থায়িত’ বৃত্তির প্রচার, অফার লেটারে নেই স্টাইপেন্ড-ভ্রমণ ব্যয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা

বৃত্তির নামে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতারণা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:৪৭ পিএম

যে বৃত্তি পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেই ‘পূর্ন বৃত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেটি আবেদনকারীদের হাতে এসে কেন সীমিত সুবিধার বৃত্তিতে পরিণত হচ্ছে?

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের স্থবির সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় সফর করেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য একটি শিক্ষা সহযোগিতা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়—যেটি পরিচিত হয় ‘নলেজ করিডর’ নামে।

কিন্তু কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপে আবেদন করা কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রচারে যে বৃত্তিকে পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, বাস্তবে পাওয়া অফার লেটারে তার প্রতিফলন নেই। বিশেষ করে মাস্টার্স পর্যায়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানো অফার লেটারে টিউশন ফি মওকুফ ও আবাসন সুবিধার কথা থাকলেও মাসিক স্টাইপেন্ড, খাবার, বিমান ভাড়া, যাতায়াত, ভিসা ও স্বাস্থ্যবীমার মতো ব্যয়ের বিষয়ে অর্থায়নের নিশ্চয়তা নেই।

এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ। তাদের প্রশ্ন—যে বৃত্তি পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেই ‘পূর্ন বৃত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেটি আবেদনকারীদের হাতে এসে কেন সীমিত সুবিধার বৃত্তিতে পরিণত হচ্ছে?

উল্লেখ্য, ‘নলেজ করিডর’ উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ছিল ব্যাচেলরস, মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। আর ‘পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি’ বলতে যে সুবিধাগুলোর কথা প্রচার করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল—টিউশন ফি, মাসিক মেইনটেন্যান্স অ্যালাউন্স, হোস্টেল খরচ, এককালীন সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স এবং রিটার্ন এয়ার টিকিট। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী যেন বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন—সেই ধরনের একটি পূর্ণ আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয়েছিল।

নলেজ করিডরের প্রথম ব্যাচে প্রায় ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে যান। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাও শুরু করেন। এরপর গত মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়।

অনেক শিক্ষার্থী তখনও আগের ঘোষণার ভিত্তিতেই ধরে নিয়েছিলেন—এটিও হবে সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অফার লেটার পাওয়ার পর।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অফার লেটারে দেখা যায়—তাদের দেওয়া হচ্ছে মূলত ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসন সুবিধা। কিন্তু নেই মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা। নেই খাবারের খরচ।

শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক ঝুঁকি

বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে টিউশন ফি মওকুফ হওয়া একটি বড় সুবিধা হলেও সেটিই মোট শিক্ষাব্যয়ের সবটা নয়।

একজন শিক্ষার্থীকে আবাসন, খাবার, স্থানীয় যাতায়াত, ভিসা, স্বাস্থ্যবীমা, বইপত্র, বিমান ভাড়া এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে গিয়ে পড়াশোনা করতে হলে এসব ব্যয় পরিবারকে বহন করতে হবে কি না, সেটি আগে থেকেই জানা অত্যন্ত জরুরি।

ফলে একজন শিক্ষার্থী যদি পূর্ণ বৃত্তি’ বৃত্তির ওপর নির্ভর করে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরে জানতে পারেন যে মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় বা বিমান ভাড়া তাকে নিজেকেই বহন করতে হবে, তাহলে তার আর্থিক পরিকল্পনা বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, শুরু থেকেই সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও অফিশিয়াল প্রচারে বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, যদি মাস্টার্স পর্যায়ে পূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ না থাকে, তাহলে আবেদন শুরুর সময়ই সেটি স্পষ্ট করা উচিত ছিল।

আরেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তিনি যে অফার লেটার পেয়েছেন, সেখানে টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বীমা ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা—এটি হয়তো শুধু তাঁর ক্ষেত্রে নয়; মাস্টার্সে আবেদন করা অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই একই ধরনের অফার দেওয়া হয়েছে।

এখানে সমস্যা শুধু টাকা-পয়সার নয়। বিষয়টা হলো—প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব সুবিধার মধ্যে পার্থক্য। একজন শিক্ষার্থী যখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করেন, তখন শুধু টিউশন ফি মওকুফ হলেই তাঁর সব খরচ মিটে যায় না। থাকা, খাবার, যাতায়াত, ভিসা, স্বাস্থ্যবীমা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় প্রকৃত শিক্ষাব্যয়।

তাই কোনো বৃত্তিকে ‘ফুললি ফান্ডেড’ বলা হলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন, এসব ব্যয়ের বড় অংশই বৃত্তির আওতায় থাকবে। কিন্তু অফার লেটারে যদি তার প্রতিফলন না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামনে তৈরি হয় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনার পুরো ব্যয় নিজেরা বহন করতে পারবেন না, তাদের জন্য এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আসলে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং বর্তমান অফার লেটারের সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির পার্থক্য কেন তৈরি হয়েছে—তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা।

এর আগে চলতি বছরের গত মে মাসে ওআইসি দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে কয়েকটি প্রোগ্রামে অধ্যয়নের সুযোগ নিয়ে একটি ঘোষণা দেয় পাকিস্তানের কমস্যাটস বিশ্ববিদ্যালয়। তখনকার ঘোষণা মতে, এ বৃত্তির আওতায় কোনো টিউশন ফি ছাড়াই স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করার সুযোগ পাবেন শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এ স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিসের ওপর মাস্টার্স অব সায়েন্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামে ২৫টি বৃত্তি দেবে পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়টি। ৩১ মে ছিল সেই আবেদনের শেষ সময়।

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা—স্বচ্ছতার দাবি

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দুই দেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।কিন্তু আন্তর্জাতিক শিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভুল তথ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৫০০টি বৃত্তিকে যখন পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন নিজেই ‘পূর্ন অর্থায়িত’ হিসেবে ঘোষণা করছে এবং সুবিধার তালিকায় স্টাইপেন্ড, হোস্টেল ও মেস চার্জ, সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স ও বিমান টিকিট উল্লেখ করছে, তখন নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া নথিতে যদি এসব সুবিধা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সেই পার্থক্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

তাই এটিকে সরাসরি ‘প্রতারণা’ হিসেবে চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা যাচাই করা জরুরি। তবে প্রকাশিত প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবে দেওয়া সুবিধার মধ্যে যদি সত্যিই অসঙ্গতি থাকে, তাহলে তা দ্রুত সংশোধন এবং শিক্ষার্থীদের কাছে লিখিতভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

কারণ এটি শুধু একটি বৃত্তির অর্থনৈতিক হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান শিক্ষা সহযোগিতার ওপর আস্থার প্রশ্ন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত