ভেজাল কীটনাশক সরবরাহ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বর্জ্য সংগ্রহে অতিরিক্ত আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

মশা নিধনে কেরোসিন, ময়লা সংগ্রহে কোটি টাকার ‘বাণিজ্য’: ডিএসসিসিতে দুদকের অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৪৩ পিএম

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সহকারী পরিচালক মেহেদী মুসা জেবিন ও উপসহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমানের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি দল অভিযান পরিচালনা করছে

মশা নিধনে ভেজাল কীটনাশকের পরিবর্তে কেরোসিন ব্যবহারের অভিযোগ, বর্জ্য সংগ্রহে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজিসহ বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট ল্যাব কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে মশক নিধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হচ্ছে। একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সহকারী পরিচালক মেহেদী মুসা জেবিন ও উপসহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমানের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি দল ডিএসসিসিতে অভিযান পরিচালনা করছেন। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযান শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।

কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নতুন নামে কাজ?

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১১ ও ২০১৯ সালে ভেজাল কীটনাশক সরবরাহের অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ‘দি লিমিট অ্যাগ্রো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের মূলহোতা হিসেবে মিজানুর রহমানের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নাম ও কাঠামো পরিবর্তন করে ‘ফরোয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করে পরবর্তীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কীটনাশক সরবরাহের কাজ নেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে তিনটি কার্যাদেশের মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা মূল্যের কীটনাশক সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। দুদকের অভিযান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

পরীক্ষায় কীটনাশক, মাঠে কেরোসিন?

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সময় মানসম্মত কীটনাশক উপস্থাপন করা হলেও মাঠপর্যায়ে ফগিংয়ের সময় প্রকৃত কীটনাশকের পরিবর্তে কেবল কেরোসিন ছিটানো হচ্ছে। এতে একদিকে মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।

এছাড়া মশক নিবারণী দপ্তরের স্টোরকিপার ও হিসাব শাখার কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদক সংশ্লিষ্ট নথি, সরবরাহ ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।

নির্ধারিত ফি ১০০ টাকা, আদায় ২৫০ পর্যন্ত

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, বাসাবাড়ির প্রতি ফ্ল্যাট থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে—ধানমন্ডি, আজিমপুর, কাঁঠালবাগান, কায়েতটুলী ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দাদের কাছ থেকে ১২০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও বর্জ্য সংগ্রহের নামে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত আদায়ের অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে।

দরপত্রের কাজেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

বর্জ্য সংগ্রহের ঠিকাদারি নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়মিত দরপত্রে অংশ নিয়ে কোটি টাকা জামানত দিয়ে কাজ পাওয়া কিছু ব্যবসায়ীকে ভয়ভীতি দেখানো, মারধর এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবে বৈধ দরপত্র প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র বর্জ্য সংগ্রহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার অবৈধ ‘ময়লা-বাণিজ্য’ পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথি ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখবে দুদক

মশক নিধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—দুই খাতেই ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দুদকের এই অভিযানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কীটনাশক ক্রয় ও সরবরাহের কার্যাদেশ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রতিবেদন, মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের হিসাব, বিল-ভাউচার এবং বর্জ্য সংগ্রহের চুক্তি ও অর্থ আদায়ের তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তবে দুদকের তদন্ত বা অনুসন্ধানে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির জন্য দায়ী বলা যায় না। অভিযানে সংগৃহীত নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে দুদক কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত