রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনার শীর্ষে আইরিন খান!

শাহীন আব্দুল বারী প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৭ এএম

পারিবারিক পরিচয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা: জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত আইরিন খান একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশী। তবে রাষ্ট্রপতি হবার আগে তার বৃটেনের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে

সিলেটের আইরিন জুবাইদা খান বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনার শীর্ষে রয়েছেন। নির্বাচিত হলে তিনিই হবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করেছেন যে ক'জন মানুষ আইরিন খান তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

পারিবারিক পরিচয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা: জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত আইরিন খান একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশী। তবে রাষ্ট্রপতি হবার আগে তার বৃটেনের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে।

৭০ বছর বয়সী আইরিন খান একজন বিশ্বসেরা আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী। বর্তমানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। এর আগে তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবাধিকার সংস্থার ৭ম মহাসচিব ছিলেন। তিনি বাংলাদেশী আইনজীবী যিনি ২০২০ সালের আগস্টে মত প্রকাশ ও মতের স্বাধীনতার জন্য জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

২০১১ সালে তিনি রোমে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল' অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক নির্বাচিত হন, এটি একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা যা আইনের শাসন এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য কাজ করে। তিনি ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেইলি স্টারের পরামর্শক সম্পাদক ছিলেন।১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি জন্ম গ্রহণ করেন সিলেটের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে । আইরিন খান দেশী-বিদেশী নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন।

আইরিন অনুসারীদের মতে, আইরিন খান রাষ্ট্রপতি হলে দেশের উন্নয়নে ব্যাপক সাড়া পড়বে। তিনি সৎ ও যোগ্যতা সম্পন্ন একজন নারী। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। তিনি নির্লব এক মহিয়সী নারী। রাজনৈতিক ভাবে তার পরিচিতি কম থাকলেও তিনি বিশ্বের দরবারে বেশ আলোচিত। তার কর্মকাণ্ড নিখুঁত। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিঃসন্দেহে যোগ্য একজন প্রার্থী।

সরকার ও বিএনপির ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে একজন নারীকে বিবেচনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি, মানবাধিকার বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে আইরিন খানের নাম সামনে এসেছে। পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক মহলেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। অনেকের যুক্তি, রাজনৈতিক বিভাজনের এই সময়ে দলীয় রাজনীতির বাইরের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রপতি হলে দেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হতে পারে।

এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে যারা সরাসরি রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করছেন, তাদের বড় একটি অংশ মনে করেন, বিএনপির বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ কাউকেই রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে।

সরকার ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরে থেকে কাউকে আনার পরিবর্তে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা বেশি। যদিও এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি, তবু সম্ভাব্যদের তালিকা অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে।

এই তালিকায় শুরু থেকেই ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নামও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম। বিএনপির ভেতরের একটি অংশ তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে আগ্রহী বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী বলে মত দেন। তার ভাষায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সহিষ্ণুতা, ব্যক্তিগত সততা ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মির্জা ফখরুল অন্যদের তুলনায় এগিয়ে।

একইভাবে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহও তার ফেসবুক পোস্টে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সাথে সাথে, একটি নাম যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি মনোযোগের দাবি রাখে। রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক আর ঠিক একারণেই কে এই পদে আসীন হচ্ছেন তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন আসিফ সালেহ।

তিনি বলেন, এটিই একমাত্র পদ যা কোনো দলের নয়, বরং সমগ্র দেশের হওয়ার কথা। এর জন্য এমন একজন ব্যক্তি প্রয়োজন যার বিশ্বাসযোগ্যতা সরকার পরিবর্তনের পরেও টিকে থাকে। এরপর তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের তিনটি যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন। প্রথম কারণ হিসেবে তিনি মির্জা ফখরুলের সততার কথা উল্লেখ করেন।

আসিফ সালেহ লিখেছেন, চার দশকের জনজীবনে শিক্ষা ক্যাডারের একজন কলেজ প্রভাষক থেকে শুরু করে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান, তারপর প্রতিমন্ত্রী এবং তার দলের মহাসচিব হিসেবে পনেরো বছর পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত মুনাফ করার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ব্যাপকতার কথা বলেন আসিফ সালেহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা, শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকতা জীবন, জাতীয় ব্যক্তিত্ব হওয়ার আগে নির্বাচিত পৌরসভা চেয়ারম্যান, দুইবার প্রতিমন্ত্রী। তিনি রাষ্ট্রকে শুধু শীর্ষ পর্যায় থেকে নয়, একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকেও চেনেন।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আসিফ সালেহ বলেন, তিনি দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে সম্মানিত মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞাসা করুন বিএনপিতে কার সাথে তারা কথা বলতে পারেন, দেখবেন এক দশক ধরে উত্তর একই। একজন রাষ্ট্রপতিকে এমন একজন হতে হয় যাকে অপর পক্ষ ভয় পায় না। আমাদের খুব কম সিনিয়র রাজনীতিবিদই এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেন।

যদিও আসিফ নজরুল এবং আসিফ সালেহ'র মতামত ব্যক্তিগত, তবু তা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে জনপরিসরের আলোচনাকে আরও বেগবান করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। বিশেষ করে সরকার যদি দলীয় রাজনীতির বাইরের কোনো ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতি করে, তাহলে সেটি জাতীয় ঐকমত্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বার্তা দিতে পারে। অন্যদিকে দলীয় কোনো প্রবীণ নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সেটি হবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় আনুগত্যের স্বীকৃতি।

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত জল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। যেহেতু সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই কার্যত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকলেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে দলীয় রাজনৈতিক সমীকরণই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আইরিন খান কখনো সক্রিয় দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার পুরো কর্মজীবন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, জাতিসংঘ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিকেই ঘিরে। ফলে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সেটি হবে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের সুফল যেমন থাকতে পারে, তেমনি দলীয় রাজনীতির বাস্তবতায় কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে এখনো সময় রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাতে পারে। ফলে আজ যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের সবাই চূড়ান্ত বিবেচনায় থাকবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বর্তমানে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

সব মিলিয়ে আইরিন খানকে নিয়ে আলোচনা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আন্তর্জাতিক মর্যাদা, মানবাধিকার বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং একজন নারীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা—এই তিনটি কারণ তার নামকে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে। তবে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তাকে ঘিরে আলোচনা যতটা জনপরিসরে, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সম্ভাবনার পর্যায়ে।

অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরে দলীয় নেতাদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রবণতা শক্তিশালী বলেই বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে আইরিন খান রাষ্ট্রপতি হবেন কি না, তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা, জল্পনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অব্যাহত থাকবে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে সর্বোচ্চ যোগ্য ব্যক্তিকে বিবেচনা করবেন এবং চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিবেন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত