বিতর্ক, বাস্তবতা ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ
রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন ও এর বহুমাত্রিক প্রভাব
এই নিয়োগ দেশের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ প্রথমবারের মতো কোনো সরাসরি কর ক্যাডার কর্মকর্তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিসিএস ১৫তম ব্যাচের (কর) কর্মকর্তা আহসান হাবীবকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে যেমন প্রশংসা হয়েছে, তেমনি প্রশাসনিক রীতি, জ্যেষ্ঠতা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠেছে।
গত ২৯ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি বিদায়ী চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের স্থলাভিষিক্ত হন। এনবিআরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি কর ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলেন।
কেন আলোচনায় এই নিয়োগ
এনবিআরের বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব পদাধিকারবলে এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতীতে এই ধারাই অনুসরণ করা হয়েছে। তবে এবার একজন কর্মরত এনবিআর সদস্যকে সরাসরি ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং একই সঙ্গে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসনিক মহলে এটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যদিও সরকার বলছে, বিদ্যমান আইন অনুসারেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তবুও প্রশাসনিক রীতি থেকে সরে আসার কারণেই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।
সরকারের অবস্থান
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এম. এ. বারীর ভাষ্য অনুযায়ী, আহসান হাবীব একজন মেধাবী, সৎ ও পেশাগতভাবে দক্ষ কর্মকর্তা। তিনি দীর্ঘদিন পদোন্নতিতে বঞ্চিত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ডিএস পুলে (উপ-সচিব) অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করলেও রাজনৈতিক কারণে সেটি বিবেচনায় আনা হয়নি। এনবিআরের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অভিজ্ঞ কর কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়াই সরকারের উদ্দেশ্য।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের মতো কারিগরি প্রতিষ্ঠানে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করবে।
বিতর্কের মূল কারণ
এই নিয়োগকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় তিনটি। প্রথমত, প্রশাসনিক রীতির ব্যতিক্রম; দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতার প্রশ্ন এবং তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অতীত ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও আলোচনা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
রীতিবিরুদ্ধ নিয়োগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “এখানে আইন ও প্রশাসনিক রীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারি চাকরির প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত সচিব বা সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এবং বিশেষ প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে সরকার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু এনবিআরের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণ, এই নিয়োগ চিরাচরিত রীতির বাইরে করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কোনো আইন সরাসরি বলে না যে, কর ক্যাডারের কর্মকর্তা কখনও সচিব হতে পারবেন না। হতে পারবেন, তবে তাকে অবশ্যই উপ-সচিব বা ডিএস পুলে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। অতীতে এমন নজির রয়েছে।”
জনপ্রশাসনের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা বলছেন, যাকে নতুন করে এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাকে যদি আগে সচিব পদমর্যাদায় উন্নীত করা হতো অথবা রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতায় সচিবের মর্যাদা দিয়ে পরে দায়িত্বভার দেওয়া হতো, তাহলে কোনো প্রশ্ন দেখা দিত না কিংবা বিতর্কের জন্ম তৈরি হতো না।
এক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, এনবিআর একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান; তাই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাকেই এর নেতৃত্বে আনা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে আহসান হাবিবের নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট সমালোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু জ্যেষ্ঠতার সংকট। এর কারন, আহসান হাবীব ১৫তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা। এনবিআরের ভেতরেই তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ অনেক কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এই শীর্ষ পদে বসানোয় অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে, প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ভিন্ন মত রয়েছে। তাঁরা বলছেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্রেফ সমালোচনা থাকলেই তাঁকে অপরাধী বা অযোগ্য বলা যায় না। নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন, প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেশাগত যোগ্যতাই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া জরুরি।
অতীত অনুষঙ্গ ও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অতীত কর্মকাণ্ড, বিতর্কহীনতা এবং জনগ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাঁদের ভাষ্যমতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় প্রভাব ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের হাত থেকে মুক্ত করা এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এমন পরিস্থিতিতে বিতর্কিত অতীত রয়েছে—এরকম কাউকে দায়িত্ব দেওয়া আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছেন।
নেটিজেনদের বড় একটি অংশ দাবি করেছেন যে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দূর করতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল জনআস্থা ধরে রাখা সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন।
সমালোচকদের একাংশের দাবি, আহসান হাবীব বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সময় নানামুখী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সময়ে তাঁর মতো কর্মকর্তার নিযুক্তি সরকারের সংস্কার ও নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন তারা।
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মেধার মূল্যায়ন
তবে বিতর্ক থাকলেও এই নিয়োগের পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।
ব্যতিক্রমী ট্র্যাক রেকর্ড
আহসান হাবিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৫তম বিসিএস (কর) ক্যাডারের জাতীয় মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
এছাড়া বিসিএস (কর) একাডেমির বিভাগীয় প্রশিক্ষণে প্রথম স্থান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার প্রশিক্ষণে এ-প্লাস এবং বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) ফাউন্ডেশন কোর্সেও এ-প্লাস অর্জন করেন।
বর্নিল কর্মজীবন
আহসান হাবিব কর্মজীবনে কর নিরীক্ষা, ট্রান্সফার প্রাইসিং, কর মূল্যায়ন, তদন্ত, গোয়েন্দা কার্যক্রম, কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর, ই-ফাইলিং ও ই-পেমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ইউরোপে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে সরকারি সফর ও পেশাগত কার্যক্রমে অংশ নেন।
এছাড়াও আহসান হাবিব দুর্নীতি দমন কমিশন, বিসিএস (কর) একাডেমি, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রিসোর্স পারসন হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন
আহসাব হাবিবের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাহস ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এনবিআরকে বড় ধরনের চক্রান্ত ও বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেন। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআর ভেঙে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করে। তখন এই ইস্যুতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সংঘবদ্ধ একটি চক্র দাবি আদায়ের নামে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভুল বুঝিয়ে ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নামে। সেসময় তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই আন্দোলন সামাল দেন।
সিআইসি-তে দুর্দান্ত ভূমিকা
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কর অঞ্চল-১৫-এর কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে আহসান হাবিব সর্বপ্রথম এস আলমের অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি অনুসন্ধান শুরু করেন। পরে, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
সিআইসির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি, শীর্ষ আমলা ও ১২টি বড় কর্পোরেট গ্রুপের কর ফাঁকি এবং অর্থ পাচার রোধে কয়েক শ কোটি টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করে ব্যাপক প্রশংসিত হন।
এছাড়াও, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম ‘উল্কাগেমস’ থেকে বকেয়া বিপুল পরিমাণ কর আদায়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি, তিনি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার করা ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত করেন।
নিজস্ব ক্যাডারের ক্ষমতায়ন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, এনবিআর-এর শীর্ষ কর্মকর্তা আহসান হাবিব সবার কাছে একজন সৎ, সাহসী ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসাবে পরিচিত। বর্তমানে তিনি বিসিএস (ট্যাক্সেশন) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।
এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে এনবিআর প্রশাসনে আনন্দের বন্যা বইছে। কারণ, প্রথমবার আয়কর ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে সরকার এনবিআর চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে; যা ছিল দুই ক্যাডারের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি।
দীর্ঘদিনের এই দাবি মেনে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন এনবিআরের নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় সংস্থাটির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে স্বস্তি এসেছে।
উল্লেখ্য, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব বোর্ড সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পলিসি উইং (রাজস্ব নীতি) পৃথক করার সুপারিশ করেছিলো। তাদের পেশকৃত সুপারিশমালায় ‘রাজস্ব কমিশন’ নামে স্বাধীন একটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয় যেটি রাজস্ব নীতি প্রণয়নের কাজ করবে। এর প্রধান হবেন আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এই কমিশন অর্থমন্ত্রীর অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদারে এনবিআরকে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসাবে পুনর্গঠন এবং এর শীর্ষ নির্বাহী পদে আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগে সুপারিশ করেছিলো পরামর্শক কমিটি।
আহসান হাবীবের নিয়োগের দ্বিমুখী প্রভাব
| নেতিবাচক/বিতর্কিত দিক | ইতিবাচক/সমর্থনযোগ্য দিক |
|
• জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও অসন্তোষ • অতীত রাজনৈতিক সংশ্লেষের প্রশ্ন • অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ডে প্রভ |
• ব্যাচ টপার ও পেশাগত মেধার মূল্যায়ন • নিজস্ব ক্যাডার থেকে প্রথম নিয়োগ • সিআইসি প্রধান হিসেবে সফল অভিযান |
রাজস্ব আদায়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব
নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭) শুরু হয়েছে এবং সদ্য পাস হওয়া বাজেটে সরকারকে প্রায় ৬.০৪ ট্রিলিয়ন (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি) টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ৪০% বেশি।
রাজস্ব বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এবং চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্যমাত্রা। শীর্ষ পদের এই বিতর্ক যদি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র কোন্দল বা মানসিক দূরত্ব তৈরি করে, তবে মাঠপর্যায়ে কর আদায়ে স্থবিরতা আসতে পারে। এতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও নতুন চেয়ারম্যানের অবস্থান
নিয়োগ পাওয়ার পরদিনই (৩০ জুন) আহসান হাবীব এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তিনি একটি করদাতা-বান্ধব এবং স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে এই নিয়োগ নিয়ে এখনো কোনো সংশোধনী বা নতুন ব্যাখ্যা আসেনি, যার অর্থ সরকার তাঁর পূর্বের কাজের দক্ষতার ওপরই ভরসা রাখছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে সরকার সবাইকে একটি বার্তা দিয়েছে। সেটি হচ্ছে, সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের মূল্যায়ন। এই তিনটি গুন যার মধ্যে থাকবে সরকার তাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করবে।
সার্বিক মূল্যায়ন
আহসান হাবীবের নিয়োগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি একদিকে বিশেষায়িত দক্ষতার স্বীকৃতি এবং নিজস্ব ক্যাডারের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রতীক। অন্যদিকে প্রশাসনিক রীতি, জ্যেষ্ঠতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
উল্লেখ্য, আহসান হাবীবের নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ক ও অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কিংবা সরকারের কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এই নীরবতার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা আরও ডালপালা মেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি এই নিয়োগের পটভূমি ও যৌক্তিকতা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এবং নতুন নেতৃত্ব দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে সক্ষম হয়, তাহলে বর্তমান বিতর্ক ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে পারে।
সবশেষে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবীবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— এনবিআরে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রেখে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা। নতুন নেতৃত্ব সেই চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Shamiur Rahman
