৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাসের অভিযোগ, প্রশ্নবিদ্ধ ঢাকা কাস্টমসের ভূমিকা

ঢাকা কাস্টমসের ডিসি আমিনুলের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ, তদন্তের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৬ পিএম

৩১তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা মো: আমিনুল ইসলাম কাস্টমস বিভাগে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, পণ্য খালাসে অনিয়ম, ভুয়া বন্ড সুবিধা, ঘুষ গ্রহণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি দাখিল করা অভিযোগপত্রে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্স থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই খালাস, চোরাচালানে সহযোগিতা, সম্পদের উৎসের অসামঞ্জস্য এবং অর্থপাচারসহ বিভিন্ন গুরুতর অনিয়মের উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, ও দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন জনৈক সোহেল রানা, রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা মো: টিটু রহমান এবং উত্তরার আরশাদ আলীসহ একাধিক ব্যক্তি। অভিযোগকারীদের দাবি, এই ঘটনায় কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে একটি এয়ারওয়ে বিলের বিপরীতে প্রায় ৫৬ কার্টন এবং আনুমানিক ১ হাজার ৯৬২ কেজি পণ্য নিয়মিত বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই কার্গো এলাকা থেকে বের হয়ে যায়। তাদের দাবি, এসব পণ্যের মধ্যে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, এলসিডি, ই-সিগারেট এবং সিগারেটের ব্যান্ডেরোল বা সরকারি রাজস্ব স্ট্যাম্প ছিল। অভিযোগে পণ্যগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, কয়েকটি বন্ধ বা অকার্যকর বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া নথির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়া শিশুখাদ্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য প্রভাব খাটিয়ে খালাসের অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগে মো: আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের দাবিও করা হয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, নগদ লেনদেন, সম্পদ ক্রয়, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন আইনানুগভাবে পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এছাড়া ‘গুনগুন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কাস্টমস সরকার মো. আবু হানিফ এবং হানিফ/শরীফ নামে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের যোগাযোগ ও যোগসাজশের অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে, ‘ক্লোজেট ক্লাউড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, আমদানি নথি, বিল অব এন্ট্রি, ঘোষিত পণ্যের মূল্য, পরিশোধিত শুল্ক এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মো. আমিনুল ইসলামের এক নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন (BIN) ও টিআইএন (TIN) নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাবিহা জাহানের সঙ্গে মো. আমিনুল ইসলাম বা তার পরিবারের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগপত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের সদ্য সাবেক সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে মো. আমিনুল ইসলাম বিভিন্ন অনিয়ম এবং অবৈধভাবে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

মো. আমিনুল ইসলামের আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, কর্মকর্তার আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ এবং বিদেশে থাকা সম্ভাব্য অর্থ বা সম্পদের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন কাস্টমস কার্যক্রম থেকে সংগৃহীত অবৈধ অর্থ মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানোর ঘটনা থাকতে পারে। এই বিষয়ে ব্যাংকিং চ্যানেল, বৈদেশিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, ৩১তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা মো: আমিনুল ইসলাম কাস্টমস বিভাগে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। 

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার বাসিন্দা মোঃ আব্দুল বাতেন ও আজিজা খানম দম্পতির সন্তান মো: আমিরুল ইসলামের আয়কর নথি নম্বর ৭৮৬১৬৩৫৭৫২৪৭১। তার আয়কর নথি জব্দ করে আয় বহির্ভূত সম্পদের খোঁজ করলেই দুর্নীতির নানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগকারীরা বিশেষভাবে বিমানবন্দর কার্গোতে কথিত ৩০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য খালাসের ঘটনার আলামত সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আবেদনে সিসিটিভি ফুটেজ, ওয়্যারহাউস ইনভেন্টরি, কার্গো মুভমেন্ট রেকর্ড, গেট পাস, ডেলিভারি রেকর্ড, এয়ারওয়ে বিল, বিল অব এন্ট্রি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টার এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা প্রশাসনিক নথি সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) এবং একজন রাজস্ব কর্মকর্তার ভূমিকাও তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হলে ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে পণ্য খালাসের পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

লিখিত আবেদনে অভিযোগগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত