কার্গো স্ক্যানার সংকটে অস্ত্র-মাদক চোরাচালান বৃদ্ধি, হাজার কোটি টাকা শুল্কফাঁকির শঙ্কা

১৬ স্ক্যানার অচল, ঝুঁকিতে রাজস্ব-সীমান্ত নিরাপত্তা

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬ ১১:৪৯ এএম

গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের বিভিন্ন সমুদ্র ও স্থলবন্দরে স্থাপিত মোট ২৯টি স্ক্যানারের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ১৩টি। বাকি ১৬টি দীর্ঘদিন ধরে অচল। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে ইলেকট্রনিক নজরদারি কার্যত ভেঙে পড়েছে।

দেশের সমুদ্র ও স্থলবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নীরব কিন্তু ভয়াবহ একটি সংকট তৈরি হয়েছে। আধুনিক কার্গো স্ক্যানিং ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ায় সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে পণ্যের ভুয়া ঘোষণা, আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং শুল্ক ফাঁকির মাধ্যমে রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের বিভিন্ন সমুদ্র ও স্থলবন্দরে স্থাপিত মোট ২৯টি স্ক্যানারের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ১৩টি। বাকি ১৬টি দীর্ঘদিন ধরে অচল। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে ইলেকট্রনিক নজরদারি কার্যত ভেঙে পড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সম্প্রতি জমা দেওয়া "Country's Sea and Land Port Installed Scanners (Out of Order)" শীর্ষক ওই প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

ম্যানুয়াল পরীক্ষায় ধীরগতির বন্দর

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ক্যানার অচল থাকায় কনটেইনার ও পণ্য পরীক্ষা করতে হচ্ছে হাতে-কলমে। এতে একদিকে যেমন পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে, অন্যদিকে গোপন কনট্রাব্যান্ড বা ভুয়া ঘোষণার মাধ্যমে আনা পণ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও কমলাপুর আইসিডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্ক্যানার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক তহবিল না থাকায় প্রতিবার চুক্তি নবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি মাসের পর মাস অচল পড়ে থাকে। তাদের মতে, এনবিআরের অধীনে একটি স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বা জরুরি বরাদ্দ থাকলে স্ক্যানার দ্রুত সচল রাখা সম্ভব হতো।

চাপ বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের সচল স্ক্যানারের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরে থাকলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দরে বর্তমানে আটটি স্ক্যানারের মধ্যে চারটি সচল রয়েছে।

একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আরও একটি স্ক্যানার চালুর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। একটি স্ক্যানার বিকল এবং আরেকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় চালু করা যাচ্ছে না। আগামী এক মাসের মধ্যে সেগুলো সচল করার চেষ্টা চলছে।

স্ক্যানিং সক্ষমতার ঘাটতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে কনটেইনার জট বাড়ছে এবং পণ্য খালাসে সময়ও বেশি লাগছে।

মোংলা, আইসিডি স্থলবন্দরেও একই চিত্র

মোংলা সমুদ্রবন্দরে দুটি আন্ডার-ভেহিকল স্ক্যানার রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দুটি ভেহিকল স্ক্যানার অচল অবস্থায় রয়েছে, ফলে বন্দরে প্রবেশ ও বহির্গামী যানবাহনের স্ক্যানিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে এই বন্দরে এখনো কোনো কনটেইনার স্ক্যানার স্থাপন করা হয়নি। অন্যদিকে কমলাপুর আইসিডিতে থাকা একমাত্র মোবাইল কনটেইনার স্ক্যানারটি ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে অচল থাকায় বর্তমানে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে কনটেইনার যাচাই করতে হচ্ছে, যা পণ্য খালাসে সময় বৃদ্ধি করছে এবং কাস্টমস কার্যক্রমকে ধীরগতির করছে, এতে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

পানগাঁও আইসিডিতে বর্তমানে কোনো সচল কনটেইনার স্ক্যানার নেই। ফলে প্রতিটি কনটেইনার ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করতে হচ্ছে। পানগাঁও আইসিডির স্থায়ী স্ক্যানারটি ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে অচল।

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে দীর্ঘদিন দুটি লাগেজ স্ক্যানার বিকল থাকলেও সম্প্রতি নিজস্ব অর্থায়নে সেগুলোর কিছু মেরামত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে ভোমরা, সোনামসজিদ, তামাবিল, আখাউড়া ও বুড়িমারী স্থলবন্দরে কার্যকর স্ক্যানিং ব্যবস্থার অভাবে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের ঝুঁকি বাড়ছে। এরফলে, এসব সীমান্তপথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

'লাগেজ পার্টি'র নতুন কৌশল

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ক্যানার না থাকায় 'লাগেজ পার্টি' ব্যবহার করে চোরাই পণ্য দেশে আনার প্রবণতা বাড়ছে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, ম্যানুয়াল পরীক্ষায় প্রতিটি চালান শতভাগ যাচাই করা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু আমদানিকারক ও চোরাচালানকারীরা।

পুরোনো যন্ত্র, নেই রক্ষণাবেক্ষণ

গোয়েন্দা সংস্থার মতে, চলমান এই সংকটের মূল কারণ হচ্ছে পুরোনো স্ক্যানার, মেয়াদোত্তীর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এবং খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ স্ক্যানারের কার্যক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। অনেকগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় অনেক স্ক্যানার বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও কমলাপুরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনবিআরের অধীনে স্ক্যানার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা জরুরি তহবিল না থাকায় যন্ত্র বিকল হলে দ্রুত মেরামত করা যায় না। বাজেট অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছু স্ক্যানার বন্দরের, আর কিছু স্ক্যানার কাস্টমসের। অচল স্ক্যানার সচল করতে অর্থ বরাদ্দ দিতে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, কাজ চলছে। তিনি বলেন, একটি স্ক্যানারের প্রতিমাসে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকা। যেগুলোর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে, মেয়াদ বাড়াতে এনবিআর কাজ করছে। তবে বন্দর চাইলে সবগুলো স্ক্যানার তারা অপারেট করতে পারে। সেক্ষেত্রে বন্দরকে আলাদা চার্জ দিতে হবে।

হারাচ্ছে রাজস্ব, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ইলেকট্রনিক স্ক্যানিং না থাকায় ম্যানুয়াল পরীক্ষার মাধ্যমে আন্ডার-ইনভয়েসিং, ভুয়া ঘোষণা কিংবা গোপনে আনা পণ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ শুল্ক কর হারাচ্ছে এবং বৈধ ব্যবসায়ীরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

এছাড়া অস্ত্র, বিস্ফোরক মাদক শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ বাবির মতে, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করতে কার্যকর কার্গো স্ক্যানিং অপরিহার্য। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশ বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বে স্ক্যানিং সেবা পরিচালনা করছে। বাংলাদেশও আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এমন একটি মডেল বিবেচনা করতে পারে।

সুপারিশমালা

গোয়েন্দা সংস্থা উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি সুপারিশ করেছে। এসব সুপারিশের উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপঃ

⇒ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র ও স্থলবন্দরে নতুন প্রজন্মের স্ক্যানার স্থাপন।

⇒ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাধ্যতামূলক দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি।

⇒ স্ক্যানার মেরামতের জন্য এনবিআরের অধীনে স্থায়ী জরুরি তহবিল গঠন।

⇒ নিয়মিত প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।

⇒ সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্ক্যানিং অবকাঠামো গড়ে তোলা।

উত্তরহীন প্রশ্ন

অনুসন্ধানে যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে তা নিম্নে তুলে ধরা হলো।

⇒ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ১৬টি স্ক্যানার বছরের পর বছর অচল থাকলেও দায়ী কারা?

⇒ রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সময়মতো নবায়ন হয়নি কেন?

⇒ অচল স্ক্যানারের কারণে কত রাজস্ব হারিয়েছে সরকার—এর কোনো নির্ভুল হিসাব কি রয়েছে?

⇒ স্ক্যানিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগে কী পরিমাণ অবৈধ পণ্য দেশে প্রবেশ করেছে?

⇒ জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?

প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে যখন অর্ধেকেরও বেশি কার্গো স্ক্যানার অচল, তখন শুধু রাজস্ব নয়, জাতীয় নিরাপত্তাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বড় পরিসরে গুনতে হতে পারে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত