স্থল ও বিমানবন্দরে অচলাবস্থা, লোকসানের আশংকা ব্যবসায়ীদের

টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত শত কোটি টাকার পণ্য

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬ ০১:৪৮ পিএম

গুদাম সংকট, জলাবদ্ধতা, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে হাজার হাজার টন আমদানিকৃত পণ্য খোলা আকাশের নিচে বা পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। এতে শিল্পের কাঁচামাল, মূল্যবান যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক ও অন্যান্য সংবেদনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে

একটানা ও বিরামহীন বৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি আমদানি প্রবেশদ্বার—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানীরর অপেক্ষায় থাকা শত কোটি টাকার পন্য নষ্ট হওয়ার আশংকায় আছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় চরম চাপের মুখে পড়েছে এসব বন্দর। গুদাম সংকট, জলাবদ্ধতা, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে হাজার হাজার টন আমদানিকৃত পণ্য খোলা আকাশের নিচে বা পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। এতে শিল্পের কাঁচামাল, মূল্যবান যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক ও অন্যান্য সংবেদনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ও শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে ক্ষতিগ্রস্ত শত কোটি টাকার আমদানি পণ্য

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে পর্যাপ্ত গুদাম সুবিধার অভাব এবং গত বছরের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত স্থায়ী কার্গো টার্মিনাল এখনও পুরোপুরি চালু না হওয়ায় শত শত টন আমদানিকৃত পণ্য খোলা জায়গায় সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে এসব পণ্যের বড় একটি অংশ ভিজে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে অব্যবস্থাপনা, গুদাম সংকট এবং পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা একে অপরের ওপর দায় চাপালেও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন আমদানিকারকরা।

কার্গো ব্যবস্থাপনায় বিমান, কাস্টমস ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট—এই তিন পক্ষের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশ থেকে কার্গো বিমান অবতরণের পর পণ্য নামানো ও টার্মিনালে স্থানান্তরের দায়িত্ব পালন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এরপর কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা পণ্য খালাস করেন। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের অভাবেই দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক মাস আগে কার্গো টার্মিনালের একটি শেডে আগুন লাগার পর দীর্ঘ নয় মাসেও সেটি পুরোপুরি সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ফলে গুদামের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ পণ্য বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় রাখা হচ্ছে। এতে বৃষ্টির পানিতে মূল্যবান আমদানিকৃত পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৪৫ থেকে ৫০টি ফ্লাইটে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টন কার্গো বিমানবন্দরে আসে। নিয়মিত ফ্লাইটের পণ্যের নোটিশ অব অ্যারাইভাল দিতে ২৪ ঘণ্টা লাগলেও চার্টার কার্গোর ক্ষেত্রে সময় লাগে তিন থেকে চার দিন। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টন পণ্য নোটিশের অপেক্ষায় জমে থাকে। এরপর কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্টিং ও বিতরণেও আরও কয়েক দিন সময় লাগায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় জট তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রায় ৮০ শতাংশ চালান দ্রুত ছাড় হলেও বাকি ২০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে থাকে। এতে গুদামে পণ্যের চাপ বাড়তে থাকে এবং ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডব্লিউএমএস), বারকোড বা আরএফআইডিভিত্তিক ট্র্যাকিং, পর্যাপ্ত জনবল এবং ডিজিটাল কার্গো ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে এই জট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দাবি, তারা ২৪ ঘণ্টাই পণ্য ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট উপস্থিত না থাকলে একতরফাভাবে পণ্য হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পণ্য সংরক্ষণের কারণে নির্দিষ্ট কার্গো শনাক্ত করতেও অতিরিক্ত সময় লাগছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা প্রায় ২০ লাখ টন পণ্য

টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জেটিতে পণ্য ওঠানো-নামানো এবং ডেলিভারির গতি কমে যাওয়ায় ইয়ার্ড ও শেডে বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকা পড়ে।

একই সময়ে বহির্নোঙরে ৬০টির বেশি মাদার ভেসেল কয়েক দিন ধরে অলস অবস্থায় ছিল। এসব জাহাজে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ২০ লাখ টন পণ্য।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৃষ্টির পানি ঢুকে কনটেইনারের ভেতরের তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, শিল্পের কাঁচামাল ও প্যাকেজিং সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ 'অ্যাক্ট অব গড' উল্লেখ করে ক্ষতিপূরণের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।

এ পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি যৌথভাবে সরকারের কাছে চিঠি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি সহায়তা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

যদিও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কোনো বেসরকারি অফডক এখন পর্যন্ত কনটেইনারের পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে বৃষ্টি কমে আসার পর বহির্নোঙরে পণ্য খালাস এবং জেটিতে হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বৃষ্টির কারণে বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। এতে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক উভয়েই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে এই বন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা ও শিল্পখাতেও তার প্রভাব পড়ে।

বেনাপোল বন্দরে জলাবদ্ধতায় ভাসছে কোটি টাকার পণ্য

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলেও টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের একাধিক শেডে হাঁটুসমান পানি জমে কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই শেড ও ইয়ার্ডে পানি জমে যায়। বারবার অভিযোগ জানানো হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বেনাপোল কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে শতাধিক আমদানিকারক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অধিকাংশ পণ্যের বীমা না থাকায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত।

ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমানের অভিযোগ, প্রতিবছর বন্দরের ভাড়া বাড়লেও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক আনু বলেন, বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়কারী এই বন্দরে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।

তবে বেনাপোল স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক কাজি রতন জানিয়েছেন, পাওয়ার পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণের কাজ চলছে এবং দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রধান বন্দর ও বিমানবন্দরে বিদ্যমান সংকট কেবল বৈরী আবহাওয়ার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ঘাটতি, গুদাম সংকট, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতারও প্রতিফলন।

তাদের মতে, আধুনিক গুদাম ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, দ্রুত কাস্টমস নিষ্পত্তি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা এবং সমন্বিত কার্গো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শুধু পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি কমবে না, দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে। অন্যথায় বর্ষাকাল এলেই একই ধরনের সংকট পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত