চার বছরেও দাবি মেলেনি, আইডিআরএতে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি নমিনি
৪৪ লাখের বদলে ৪৪ হাজার টাকায় নিষ্পত্তির চেষ্টা, মেটলাইফের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ
রোববার (২৬ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, বাবার মৃত্যুর পর আইনানুগভাবে বীমা দাবি করলেও দীর্ঘ চার বছরেও তিনি প্রাপ্য অর্থ পাননি। বরং নানা কৌশলে তাকে কম টাকায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চাপ দেওয়া হয়েছে।
প্রায় চার বছর ধরে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ না করে নানা অজুহাতে হয়রানি এবং মাত্র ৪৪ হাজার টাকায় ৪৪ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তির চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে বহুজাতিক জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগ করেছেন বগুড়ার সান্তাহারের বাসিন্দা মরহুম জালাল হোসেনের মেয়ে ও মনোনীত উত্তরাধিকারী (নমিনি) মোছা. চুমকি আক্তার।
রোববার (২৬ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, বাবার মৃত্যুর পর আইনানুগভাবে বীমা দাবি করলেও দীর্ঘ চার বছরেও তিনি প্রাপ্য অর্থ পাননি। বরং নানা কৌশলে তাকে কম টাকায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চাপ দেওয়া হয়েছে।
‘৪৪ লাখের বদলে ৪৪ হাজার টাকার কাগজ তৈরি’
সংবাদ সম্মেলনে চুমকি আক্তার জানান, তার বাবা জালাল হোসেন মেটলাইফে একটি জীবন বীমা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। ২০২২ সালে তিনি মাসিক প্রায় ২২ হাজার টাকা করে দুটি কিস্তি পরিশোধের পর মারা যান। এরপর নমিনি হিসেবে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিয়ে বীমা দাবি করেন তিনি।
কিন্তু কিছুদিন পর মেটলাইফের পক্ষ থেকে একটি চিঠিতে জানানো হয়, পলিসি গ্রহণের সময় ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তাই বীমা দাবি পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
চুমকি আক্তারের ভাষ্য, একই সময়ে তার বাবার গার্ডিয়ান এবং সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে করা অন্য দুটি বীমা বা সঞ্চয় সুবিধার অর্থ কোনো জটিলতা ছাড়াই পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ শুধু মেটলাইফই দাবি পরিশোধে একের পর এক জটিলতা তৈরি করছে।
'মামলা না করতে' পরামর্শ
চুমকি আক্তার অভিযোগ করেন, আইনি নোটিশ পাঠানোর পর তাকে মেটলাইফের মতিঝিল কার্যালয়ে ডাকা হয়। সেখানে ‘আলি’ নামে এক কর্মকর্তা মামলা না করার পরামর্শ দিয়ে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেন। পরে নতুন ব্যাংক হিসাব নম্বরও সংগ্রহ করা হয়।
এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ৪৪ লাখ টাকার মূল বীমা দাবির পরিবর্তে মাত্র ৪৪ হাজার টাকা পরিশোধের কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানতে পারেন, ওই ৪৪ হাজার টাকাই তার হিসাবে জমা দেওয়া হবে।
চুমকি আক্তার বলেন, "আমি কখনো ৪৪ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য সম্মতি দিইনি। এটি ছিল শুধু জমা দেওয়া প্রিমিয়ামের অর্থ। অথচ কৌশলে কম টাকায় পুরো বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে।"
মূল কাগজপত্রও ফেরত পাননি
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানাতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার মূল কাগজপত্র ফেরত দেননি। বরং আইনজীবীর মাধ্যমে যা করার করতে বলা হয়। পরবর্তীতে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে ব্লক করে দেওয়া হয়।
তার দাবি, বিষয়টি নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি মেটলাইফ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আলির বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং একজন গ্রাহককে তার ন্যায্য বীমা দাবি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত এবং ৪৪ লাখ টাকার বীমা দাবি আদায়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
যা বলছে মেটলাইফ
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেটলাইফ বাংলাদেশের হেড অব কমিউনিকেশনস সাইফুর রহমান বলেন, "বীমা দাবি দ্রুত ও সহজে পরিশোধের বিষয়ে মেটলাইফ সবসময়ই তৎপর। জীবন বীমা খাতে ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ বীমা দাবি পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মেটলাইফ অন্যতম।"
তিনি বলেন, কোনো দাবির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তথ্য বা অনুসন্ধানের প্রয়োজন হলে তা গ্রাহককে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয় এবং আলোচ্য ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সাইফুর রহমান আরও বলেন, "উক্ত পলিসি থেকে গ্রাহক যে অর্থ পাওয়ার অধিকারী, সে বিষয়ে তাকে আগেই পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি বর্তমানে যে ৪৪ লাখ টাকার দাবি করছেন, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আমাদের কাছে থাকা সব তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে আমরা প্রস্তুত।"
বীমা দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ
একদিকে নমিনির অভিযোগ—প্রাপ্য বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ না করে নানা কৌশলে হয়রানি ও কম টাকায় নিষ্পত্তির চেষ্টা। অন্যদিকে মেটলাইফের দাবি—গ্রাহকের দাবিকৃত অর্থের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং নিয়ম মেনেই দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে পুরো ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী। একই সঙ্গে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় বীমা খাতে অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
Shamiur Rahman
