এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ ⊕ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও রপ্তানি ঝুঁকিতে বাড়ছে চাপ
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ধীরগতির আশঙ্কা
সব মিলিয়ে, আগে থেকেই নানা কাঠামোগত দুর্বলতায় থাকা অর্থনীতি এখন আরও জটিল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি হয়ে উঠেছে।
দেশের অর্থনীতি একসঙ্গে একাধিক চাপের মুখে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি দুর্বল। পাশাপাশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে অতিরিক্ত চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—কোন সংকটকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, নাকি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই এখন একসঙ্গে নীতিনির্ধারণের চাপে রয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে। টানা তিন বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতাও কমে গেছে।
একই সময়ে আর্থিক খাতেও চাপ বেড়েছে। কয়েকটি ব্যাংককে কার্যক্রম সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতিকে চাঙা করতে চাইলেও ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত।
বৈদেশিক খাতে প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও রপ্তানি খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে এবং প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি খাতেও নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রবণতা থাকলে টাকার অবমূল্যায়নের চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একইসঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়লে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।
এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ‘বি’ ঋণমান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
২৭ জুলাই (সোমবার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক খাতের বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর বাড়তি চাপ প্রবৃদ্ধিকে সীমিত রাখতে পারে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারায় অর্থনীতি অতিরিক্ত চাপের মুখে রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি বলেছে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, তৈরি পোশাক খাতের আংশিক পুনরুদ্ধার এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন দেশের বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রবাসী আয়ও প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি এখনও রয়েছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কর প্রশাসনে সংস্কার উদ্যোগ চললেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
ব্যাংক খাত নিয়ে প্রতিবেদনে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ, যা পুনঃমূলধনীকরণ ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের দৃশ্যমান ইতিবাচক ফল এখনো পাওয়া যায়নি।
এসঅ্যান্ডপি আরও বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা দেশের মূল্যস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, ফলে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এতে অভ্যন্তরীণ চাহিদাভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রপ্তানি খাত নিয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। গত ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে। যেহেতু দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর, তাই এই সিদ্ধান্ত রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য গতি ফেরার সম্ভাবনা কম। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সমমানের দেশগুলোর তুলনায় আরও দুর্বল হলে কিংবা বৈদেশিক খাতের পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানও কমানো হতে পারে।
‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ পূর্বাভাসের অর্থ কী?
ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ হওয়া মানে তাৎক্ষণিকভাবে দেশের ঋণমান কমে যায়নি। বরং এটি একটি সতর্কসংকেত, যা ইঙ্গিত করে যে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়লে ভবিষ্যতে ঋণমান অবনমনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পূর্বাভাসের ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যেতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা ও রপ্তানি অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও মন্থর করতে পারে। চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়বে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ার সম্ভাবনা কম।
সব মিলিয়ে, আগে থেকেই নানা কাঠামোগত দুর্বলতায় থাকা অর্থনীতি এখন আরও জটিল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি হয়ে উঠেছে।
Shamiur Rahman
